অনলাইনে নামজারির আবেদন করার সময় যে ১০টি ভুল এড়িয়ে চলবেন
নিজস্ব প্রতিবেদক: জমি কেনার পর কিংবা উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পাওয়ার পর ভূমি রেকর্ডে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে নামজারির আবেদন করতে হয়। বর্তমানে অনলাইনে ই-নামজারি সেবার মাধ্যমে এ আবেদন করা যায়। তবে আবেদন করার সময় জমির তথ্য, দলিল বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে ভুল থাকলে আবেদন নিষ্পত্তিতে দেরি হতে পারে কিংবা অতিরিক্ত তথ্য চাওয়া হতে পারে। তাই আবেদন জমা দেওয়ার আগে কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি নির্দেশিকাতেও নির্ভুল তথ্য ও সঠিক কাগজপত্র দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারি ই-নামজারি নির্দেশিকা
১. দলিলের সঙ্গে জমির তথ্য মিলিয়ে না দেখা
নামজারির আবেদন করার আগে জমির দলিল, খতিয়ান ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথিতে থাকা তথ্য মিলিয়ে নিন। বিশেষ করে জমির দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর, মৌজার নাম এবং জমির পরিমাণে ভুল আছে কি না যাচাই করুন।
একটি সংখ্যার ভুলও জমি শনাক্তকরণে জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই অনুমান করে কোনো তথ্য পূরণ না করে মূল নথি দেখে লিখুন।
২. জমির পরিমাণ ভুল লেখা
আবেদনকারীরা অনেক সময় দলিলে উল্লেখ করা জমির পরিমাণ এবং যে পরিমাণ জমির নামজারি করতে চান, তা গুলিয়ে ফেলেন। আবার একই দাগে মোট জমির পরিমাণ ও নিজের প্রাপ্য অংশের পরিমাণও এক করে ফেলতে পারেন।
আবেদনের আগে হিসাব করে নিন, কোন দাগে কত জমি রয়েছে এবং আপনার আবেদনটি ঠিক কতটুকু জমির জন্য। একাধিক দাগ বা খতিয়ান থাকলে প্রতিটির তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করুন।
৩. জমির মালিকানা পাওয়ার সূত্র ভুল নির্বাচন
জমি কেনা, উত্তরাধিকার, দান বা অন্য কোনো বৈধ সূত্রে পাওয়া হতে পারে। আবেদন ফরমে মালিকানা অর্জনের যে সূত্র নির্বাচন করবেন, তা যেন আপনার প্রকৃত পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট নথির সঙ্গে মেলে।
উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পেলে ওয়ারিশ-সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং ক্রয়সূত্রে জমি পেলে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধিত দলিলসহ প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত রাখুন। জমির ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ভিন্ন হতে পারে।
৪. নাম ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য যাচাই না করা
আবেদনকারীর নাম, পিতা বা স্বামীর নাম, ঠিকানা এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য পূরণের সময় সতর্ক থাকুন। দলিল বা পুরোনো খতিয়ানে নামের বানানে পার্থক্য থাকলে সেটি উপেক্ষা করবেন না।
তবে নামের বানানে অমিল থাকলেই যে আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে, তা নয়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পরিচয়সংক্রান্ত প্রমাণক বিবেচনার বিষয় উল্লেখ রয়েছে। প্রয়োজন হলে উপযুক্ত সহায়ক নথি প্রস্তুত রাখুন।
৫. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র অসম্পূর্ণ বা অস্পষ্টভাবে আপলোড
অনলাইনে আবেদন করার সময় সংশ্লিষ্ট নথির পাঠযোগ্য কপি সংযুক্ত করুন। ঝাপসা ছবি, কাটা পৃষ্ঠা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেখা যায় না—এমন ফাইল জমা দিলে যাচাইয়ের সময় সমস্যা হতে পারে।
আবেদনের আগে যাচাই করুন—
-
প্রযোজ্য দলিলের কপি সম্পূর্ণ ও পাঠযোগ্য কি না।
-
সংশ্লিষ্ট খতিয়ানের তথ্য ঠিক আছে কি না।
-
উত্তরাধিকার সূত্রে জমি হলে প্রয়োজনীয় ওয়ারিশ-সংক্রান্ত নথি রয়েছে কি না।
-
কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী অন্য কোনো কাগজপত্র প্রয়োজন কি না।
সব জমির ক্ষেত্রে একই কাগজপত্র প্রযোজ্য নয়। তাই আবেদন করার আগে সরকারি পোর্টালের নির্দেশনা দেখে নিন।
৬. একাধিক মৌজার জমি একই আবেদনে যুক্ত করা
সরকারি ই-নামজারি ব্যবহার নির্দেশিকায় একটি আবেদন নির্দিষ্ট একটি মৌজার জমির জন্য করার কথা বলা হয়েছে। জমি একাধিক মৌজায় থাকলে সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী পৃথক আবেদন করতে হতে পারে।
তাই জমির অবস্থান, মৌজা ও জে.এল. নম্বর ভালোভাবে যাচাই করে আবেদন করুন।
৭. ভুল মোবাইল নম্বর দেওয়া
আবেদনে দেওয়া মোবাইল নম্বরটি সচল ও সঠিক কি না নিশ্চিত করুন। আবেদনসংক্রান্ত বার্তা, পরবর্তী নির্দেশনা বা যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই নম্বর গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
আবেদন জমা দেওয়ার পর আবেদন নম্বর বা রসিদ সংরক্ষণ করুন। পরে আবেদনের অবস্থা যাচাই করতে এগুলো কাজে লাগতে পারে।
৮. আবেদন জমা দেওয়ার আগে পুরো ফরম যাচাই না করা
সব তথ্য পূরণ করেই তাড়াহুড়ো করে আবেদন জমা দেবেন না। শেষবারের মতো দলিল, খতিয়ান, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ, আবেদনকারীর পরিচয় এবং সংযুক্ত ফাইলগুলো মিলিয়ে নিন।
কোনো তথ্য নিশ্চিত না হলে অনুমান করে লিখবেন না। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের সহায়তা নিন।
৯. সরকারি ফি ছাড়া অতিরিক্ত টাকা দেওয়া
নামজারির জন্য নির্ধারিত সরকারি ফি প্রযোজ্য। আবেদন করার সময় সরকারি পোর্টালে প্রদর্শিত সর্বশেষ ফি ও পরিশোধপদ্ধতি যাচাই করুন এবং অর্থ পরিশোধের প্রমাণ সংরক্ষণ করুন।
কেউ অতিরিক্ত টাকা দাবি করলে তার কারণ ও বৈধতা যাচাই না করে অর্থ দেবেন না। সম্ভব হলে সরকারি অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমেই ফি পরিশোধ করুন।
১০. আবেদন জমা দিয়ে আর খোঁজ না রাখা
আবেদন জমা দেওয়ার পর কাজ শেষ—এমনটি ভাববেন না। নির্ধারিত পদ্ধতিতে আবেদনের অগ্রগতি দেখুন এবং ভূমি অফিস থেকে অতিরিক্ত তথ্য বা কাগজপত্র চাওয়া হলে নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিন।
আবেদন নামঞ্জুর হলে আদেশে উল্লেখ করা কারণ ভালোভাবে পড়ুন। কারণটি বুঝতে সমস্যা হলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের সহায়তা নিন। পরিস্থিতি অনুযায়ী পুনর্বিবেচনা বা আপিলের সুযোগ থাকতে পারে।
অনলাইনে নামজারির আবেদন কোথায় করবেন?
ই-নামজারির জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি পোর্টাল ব্যবহার করুন:
-
ই-নামজারি: https://mutation.land.gov.bd/
-
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সেবা পোর্টাল: https://land.gov.bd/
আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট পোর্টালে দেওয়া নির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা যাচাই করুন।
অনলাইনে নামজারির আবেদন করার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সঠিক জমির তথ্য দেওয়া, মূল নথির সঙ্গে সব তথ্য মিলিয়ে দেখা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠযোগ্যভাবে সংযুক্ত করা এবং আবেদন জমা দেওয়ার পর অগ্রগতি অনুসরণ করা। এসব সতর্কতা আবেদনসংক্রান্ত ভুল কমাতে এবং অপ্রয়োজনীয় দেরি এড়াতে সহায়ক হতে পারে।
মনে রাখবেন: নামজারি আবেদন মঞ্জুর হওয়া জমির মালিকানা-সংক্রান্ত সব বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির সমান নয়। জমি নিয়ে বিরোধ বা নথিতে গুরুতর অসংগতি থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস বা আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
সোহাগ/
