ঘরে বসে বিকাশ-নগদে জমির খাজনা দেবেন যেভাবে, জেনে নিন ধাপগুলো
নিজস্ব প্রতিবেদক: জমির ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধ করতে এখন অনলাইন সেবা ব্যবহার করতে পারেন জমির মালিকেরা। নির্ধারিত সরকারি পোর্টালের মাধ্যমে জমির তথ্য যুক্ত করা, বকেয়া কর যাচাই, অনলাইনে পেমেন্ট এবং কর পরিশোধের দাখিলা সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে। পেমেন্ট গেটওয়েতে বিকাশ, নগদ বা অন্য কোনো মাধ্যম দেখালে তা ব্যবহার করে ঘরে বসেই খাজনা পরিশোধ করা সম্ভব।
তবে অনলাইনে খাজনা দিতে হলে প্রথমে নাগরিক অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে হবে। এরপর জমির খতিয়ান ও হোল্ডিংয়ের তথ্য যুক্ত করে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের অনুমোদন নিতে হতে পারে। পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে জেনে নিন।
অনলাইনে জমির খাজনা দিতে যা লাগবে
ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের আগে কয়েকটি তথ্য ও কাগজপত্র প্রস্তুত রাখুন।
-
জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও জন্মতারিখ
-
সচল মোবাইল নম্বর
-
জমির খতিয়ান নম্বর ও সংশ্লিষ্ট তথ্য
-
জমির অবস্থান—বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও মৌজা
-
প্রয়োজন অনুযায়ী খতিয়ানের কপি বা স্ক্যান করা নথি
-
পেমেন্টের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও সচল পেমেন্ট অ্যাকাউন্ট
জমির মালিকানার তথ্য এবং এনআইডির তথ্যের মধ্যে অসংগতি থাকলে নিবন্ধন বা খতিয়ান যুক্ত করার সময় সমস্যা হতে পারে। তাই আগে থেকেই তথ্যগুলো মিলিয়ে নেওয়া ভালো।
ধাপ ১: ভূমি সেবার পোর্টালে নিবন্ধন করুন
প্রথমে সরকারি ভূমি সেবা পোর্টাল land.gov.bd-এ প্রবেশ করুন। সেখান থেকে ভূমি উন্নয়ন করের অনলাইন সেবায় যান।
নতুন ব্যবহারকারী হলে নাগরিক বা সংস্থা-সংক্রান্ত নিবন্ধন অপশন নির্বাচন করে প্রয়োজনীয় তথ্য দিন। নির্দেশনা অনুযায়ী এনআইডি, মোবাইল নম্বর এবং অন্যান্য তথ্য পূরণ করুন। মোবাইলে ওটিপি এলে সেটি দিয়ে পরিচয় যাচাই সম্পন্ন করুন এবং পাসওয়ার্ড তৈরি করুন।
নিবন্ধন শেষে মোবাইল নম্বর ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করুন। প্রয়োজন হলে প্রোফাইলে এনআইডি ও জন্মতারিখসহ পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য হালনাগাদ করুন।
ধাপ ২: জমির খতিয়ান যুক্ত করুন
লগইন করার পর ড্যাশবোর্ড থেকে ‘ভূমি উন্নয়ন কর’ বিভাগে প্রবেশ করুন। এরপর খতিয়ান বা জমির তথ্য যুক্ত করার অপশন নির্বাচন করুন।
এ পর্যায়ে সাধারণত জমির বিভাগ, জেলা, উপজেলা, মৌজা, জরিপের ধরন এবং খতিয়ান নম্বর দিতে হয়। প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করে যাচাই করুন।
এরপর পোর্টালের নির্দেশনা অনুযায়ী হোল্ডিং ও মালিকানাসংক্রান্ত তথ্য দিন। প্রয়োজন হলে খতিয়ানের কপি বা স্ক্যান করা নথি আপলোড করে আবেদন সংরক্ষণ করুন।
খতিয়ান যুক্ত করার পর সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের অনুমোদন প্রয়োজন হলে তা সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে খাজনা পরিশোধের অপশন চালু নাও থাকতে পারে।
ধাপ ৩: বকেয়া খাজনা ও জমির তথ্য যাচাই করুন
খতিয়ান অনুমোদিত হলে ড্যাশবোর্ডের হোল্ডিং তালিকা বা সংশ্লিষ্ট বিভাগে প্রবেশ করুন। সেখানে নিজের জমির হোল্ডিং নির্বাচন করে বিস্তারিত তথ্য দেখুন।
পেমেন্ট করার আগে কয়েকটি বিষয় মিলিয়ে নিন—
-
জমির মালিকের নাম ও হোল্ডিংয়ের তথ্য
-
জমির তফসিল ও খতিয়ানসংক্রান্ত বিবরণ
-
সর্বশেষ কোন সাল পর্যন্ত খাজনা পরিশোধ করা হয়েছে
-
চলতি বছরের কর ও আগের বকেয়া
-
পোর্টালে দেখানো মোট দাবিকৃত অর্থ
কোনো তথ্য ভুল মনে হলে বা বকেয়ার পরিমাণ নিয়ে সন্দেহ থাকলে টাকা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে যোগাযোগ করুন।
ধাপ ৪: বিকাশ, নগদ বা অন্য মাধ্যমে খাজনা পরিশোধ
জমির তথ্য এবং মোট করের পরিমাণ যাচাই করার পর পোর্টালে থাকা ‘পেমেন্ট’ বা ‘ই-পেমেন্ট’ অপশন নির্বাচন করুন।
এরপর পেমেন্ট গেটওয়েতে যেসব মাধ্যম দেখানো হয়, সেখান থেকে নিজের সুবিধামতো মাধ্যম বেছে নিন। বিকাশ, নগদ, রকেট বা অন্য কোনো মাধ্যমের নাম প্রদর্শিত হলে সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা অনুসরণ করে পেমেন্ট সম্পন্ন করুন।
পেমেন্টের সময় প্রদর্শিত অর্থের পরিমাণ, লেনদেনের বিবরণ ও সম্ভাব্য চার্জ ভালোভাবে দেখে নিন। এরপর নির্বাচিত মাধ্যমের নির্দেশনা অনুযায়ী লেনদেন নিশ্চিত করুন।
সতর্কতা: ওটিপি বা পিন কেবল অনুমোদিত পেমেন্ট প্রক্রিয়ায় নিজে ব্যবহার করবেন। কাউকে ফোনে বা মেসেজে পিন, ওটিপি কিংবা পাসওয়ার্ড জানাবেন না। অপরিচিত লিংক বা ব্যক্তিগত নম্বরে টাকা পাঠিয়ে খাজনা পরিশোধ করবেন না।
ধাপ ৫: খাজনা পরিশোধের দাখিলা ডাউনলোড করুন
পেমেন্ট সফল হলে লেনদেনের তথ্য যাচাই করুন। পোর্টালে ডিজিটাল দাখিলা তৈরি হলে সেটি ডাউনলোড করে রাখুন। প্রয়োজন হলে প্রিন্ট করে সংরক্ষণ করুন।
পরে আবার দাখিলা সংগ্রহ করতে হলে ড্যাশবোর্ডের ‘দাখিলা’ বা সংশ্লিষ্ট বিভাগে গিয়ে নির্দিষ্ট হোল্ডিং বা চালানের বিবরণ থেকে সেটি খুঁজে নেওয়া যেতে পারে। পোর্টালের বর্তমান নির্দেশনা অনুযায়ী দাখিলা ডাউনলোড বা প্রিন্ট করুন।
পেমেন্ট সম্পন্ন হলেও সঙ্গে সঙ্গে দাখিলা না এলে একই কর দ্বিতীয়বার পরিশোধ করবেন না। প্রথমে লেনদেনের অবস্থা যাচাই করুন। পোর্টালে পেমেন্ট যাচাই বা রিকনসিলিয়েশনের ব্যবস্থা থাকলে সেটি ব্যবহার করুন। প্রয়োজন হলে লেনদেনের নম্বর ও পেমেন্টের প্রমাণসহ সংশ্লিষ্ট সহায়তা কেন্দ্রে যোগাযোগ করুন।
অনলাইনে খাজনা দিলে কোন বিষয়গুলো মনে রাখবেন?
জমির খাজনা অনলাইনে পরিশোধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক হোল্ডিং নির্বাচন, বকেয়ার পরিমাণ যাচাই এবং পেমেন্টের প্রমাণ সংরক্ষণ করা।
মনে রাখবেন, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা জমির মালিকানার দলিলের বিকল্প নয়। খাজনা দেওয়া থাকলেই জমির মালিকানা নিয়ে সব ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তি হয়ে যায় না। জমি কেনাবেচা বা মালিকানা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে দলিল, খতিয়ান, নামজারি ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথিও আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সরকারি পোর্টালের মেনু, নিবন্ধন পদ্ধতি ও পেমেন্টের মাধ্যম সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই লেনদেনের আগে পোর্টালে প্রদর্শিত সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
সোহাগ/
