৫ বছরে পেনশন ব্যয় ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়ানোর পূর্বাভাস
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীদের পেনশন খাতে ব্যয় আগামী পাঁচ বছরে দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে। নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে ২০২৯-৩০ অর্থবছরে এ খাতে সরকারের বার্ষিক ব্যয় বেড়ে ৫০ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এতে জাতীয় বাজেটের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ বাড়ার আশঙ্কা জানিয়েছে জাতীয় বেতন কমিশন।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেনশনভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি, অবসরপ্রাপ্তদের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়া এবং বর্তমান পেনশন ব্যবস্থার পুরো ব্যয় সরকারের রাজস্ব থেকে মেটানোর কারণে ভবিষ্যতে এ খাতের ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পেনশন ব্যবস্থায় টেকসই সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছে কমিশন।
জাতীয় বেতন কমিশনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৯ লাখ ১৬ হাজার পেনশনভোগীর জন্য সরকারের বার্ষিক ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৩৪ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা।
পরবর্তী পাঁচ বছরে পেনশনভোগীর সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১০ লাখ ৪৫ হাজারে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে বার্ষিক পেনশন ব্যয় বেড়ে ৫০ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থাৎ, কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, পেনশন খাতে সরকারের বার্ষিক ব্যয় আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। তবে এসব সংখ্যা নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার শর্তের ওপর নির্ভরশীল পূর্বাভাস; এগুলোকে চূড়ান্ত ব্যয় বা অনুমোদিত সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা উচিত নয়।
কমিশনের প্রতিবেদনে পেনশন ব্যয় বৃদ্ধির কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পেনশনভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি, অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের দীর্ঘ সময় পেনশন পাওয়া এবং বর্তমান ব্যবস্থায় সরকারের সম্পূর্ণ অর্থায়নের দায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পেনশনভোগীর সংখ্যা গড়ে বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বেড়েছে। পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্তদের গড় আয়ু বাড়ায় অনেক কর্মচারী অবসরের পর ২০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে পেনশন পাচ্ছেন।
২০১৫ সালের বেতন কাঠামো অনুযায়ী, গত অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে পেনশন খাতে ব্যয় হয়েছিল ১২ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। ওই ছয় মাসের ব্যয় একই হারে পুরো বছরে হিসাব করলে তা প্রায় ২৪ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা হয়।
কমিশনের মতে, পেনশনের ক্রমবর্ধমান দায় দীর্ঘ মেয়াদে জাতীয় বাজেটের ওপর বড় চাপ তৈরি করতে পারে। এ চাপ সামাল দিতে বর্তমান ব্যবস্থার আর্থিক স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীদের জন্য মূলত সরকারি অর্থায়ননির্ভর নির্ধারিত সুবিধাভিত্তিক বা ‘ডিফাইন্ড বেনিফিট’ পেনশন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এ ব্যবস্থায় চাকরির সময় কর্মচারীদের পেনশন তহবিলে নিয়মিত চাঁদা দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। অবসরের পর পেনশন দেওয়ার দায় সরকার বহন করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীরা সর্বশেষ মূল বেতনের ৯০ শতাংশের ভিত্তিতে মাসিক পেনশন পান। এর পাশাপাশি প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী অবসর-পরবর্তী ছুটিসংক্রান্ত সুবিধাও রয়েছে।
প্রায় ৯০টি স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের পেনশন ব্যবস্থা চালু রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৫টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পেনশন ব্যয়ের বড় অংশ সরকারি অনুদানের মাধ্যমে মেটানো হয়।
এই ব্যবস্থায় অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের নির্ধারিত সুবিধা নিশ্চিত করা গেলেও পেনশনভোগীর সংখ্যা ও ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের আর্থিক দায়ও বাড়ে।
পেনশন ব্যয়ের দীর্ঘমেয়াদি চাপ কমাতে নতুন সরকারি কর্মচারীদের জন্য চাঁদাভিত্তিক বা ‘ডিফাইন্ড কন্ট্রিবিউশন’ পেনশন ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেছে জাতীয় বেতন কমিশন।
এ ব্যবস্থায় কর্মচারীর বেতন থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পেনশন তহবিলে জমা হবে। একই সঙ্গে সরকার বা নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানও নির্ধারিত হারে অর্থ দেবে। কর্মচারী ও সরকারের জমা করা অর্থ নিয়ে আলাদা তহবিল গঠন করা হবে।
কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, তহবিলের অর্থ সরকারি সিকিউরিটিজ, শেয়ারবাজার ও মিউচুয়াল ফান্ডের মতো বিনিয়োগ খাতে কাজে লাগানো যেতে পারে। বিনিয়োগ থেকে পাওয়া আয়সহ তহবিলের অর্থ ভবিষ্যতে পেনশন সুবিধা দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হবে।
তবে বিনিয়োগ থেকে মুনাফা নিশ্চিত নয়। তাই তহবিল পরিচালনায় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নিয়মিত পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তাও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া এবং বাংলাদেশের প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের চাঁদাভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থার উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে।
এ ধরনের ব্যবস্থায় কর্মচারী ও নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত চাঁদা জমা করে দীর্ঘমেয়াদি তহবিল গড়ে তোলা হয়। পরে তহবিলের বিনিয়োগ আয় ও জমা অর্থের ভিত্তিতে অবসরকালীন সুবিধা দেওয়া হয়।
কমিশনের মতে, সরকারি কর্মচারীরা সাধারণত দীর্ঘ সময় চাকরি করেন। তাঁদের নিয়মিত চাঁদা এবং সরকারের অবদান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি তহবিল গড়ে তোলা গেলে তা পুঁজিবাজার ও অর্থনীতিতেও বিনিয়োগের উৎস হতে পারে।
তবে বিভিন্ন দেশের পেনশন ব্যবস্থার নিয়ম, অবদান, বিনিয়োগের ঝুঁকি এবং অবসরকালীন সুবিধা এক নয়। তাই অন্য দেশের মডেল অনুসরণ করার আগে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও কর্মচারীদের স্বার্থ বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কমিশন নতুন নিয়োগ পাওয়া সরকারি কর্মচারীদের জন্য বাধ্যতামূলক চাঁদাভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা তৈরির বিষয়ে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষকে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, কর্মচারীর বেতন থেকে নির্দিষ্ট অর্থ কেটে নেওয়ার পাশাপাশি সরকারও তহবিলে অর্থ জমা দেবে। এই অর্থ আলাদা পেনশন তহবিলে সংরক্ষণ ও বিনিয়োগ করা হবে।
এ ছাড়া সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য তহবিলভিত্তিক পেনশন সুবিধা সম্প্রসারণে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ও কার্যপরিধি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৩ সালের সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনা আইনের আওতায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নতুন নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের চাঁদাভিত্তিক ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে এ উদ্যোগে বাধা তৈরি হয়। সরকারি কর্মচারীদের এ ব্যবস্থার বাইরে রাখা হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা না হওয়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
চাঁদাভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা চালু হলে নতুন নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীদের বেতন থেকে নিয়মিত অর্থ জমা দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারকেও নির্ধারিত অবদান রাখতে হবে। ফলে কর্মচারীদের অবসরকালীন সুবিধা কীভাবে নির্ধারিত হবে, তহবিল কীভাবে পরিচালিত হবে এবং বিনিয়োগের ঝুঁকি কে বহন করবে—এসব বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি।
অন্যদিকে, বর্তমান পেনশনভোগীদের সুবিধা এবং ইতোমধ্যে চাকরিতে থাকা কর্মচারীদের অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়িত হবে কি না, হলে কোন নিয়মে হবে—তা নির্ভর করবে সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও বিস্তারিত নীতিমালার ওপর।
জাতীয় বেতন কমিশনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে ২০২৯-৩০ অর্থবছরে সরকারি কর্মচারীদের পেনশন খাতে বার্ষিক ব্যয় ৫০ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। ক্রমবর্ধমান এ ব্যয় সামাল দিতে কমিশন চাঁদাভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন সংস্কারের সুপারিশ করেছে।
তবে এসব সুপারিশ এখনই কার্যকর সিদ্ধান্তের সমান নয়। পেনশন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হলে বর্তমান পেনশনভোগী, কর্মরত কর্মচারী এবং নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের ওপর কী প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনার ওপর।
সোহাগ/
