| ঢাকা, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩

ঢাকায় দিনে গড়ে ৪৪টি সংসার ভাঙছে, তালাকে এগিয়ে নারীরা

জাতীয় ডেস্ক . বিনোদন৬৯.কম
২০২৬ অক্টোবর ২৪ ১৫:১৯:৩৪
ঢাকায় দিনে গড়ে ৪৪টি সংসার ভাঙছে, তালাকে এগিয়ে নারীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানী ঢাকায় দাম্পত্য বিচ্ছেদের চিত্র উদ্বেগ তৈরি করছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়ের হিসাবে দুই এলাকায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪৪টি তালাক কার্যকর হচ্ছে। এসব ঘটনায় নারীদের পক্ষ থেকে তালাকের আবেদন ও উদ্যোগের সংখ্যাও পুরুষদের তুলনায় বেশি।

দাম্পত্য সম্পর্কের অবনতি, পারস্পরিক সন্দেহ, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন, আর্থিক টানাপড়েন, মাদকাসক্তি এবং একে অন্যকে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়ার মতো নানা কারণ সংসার ভাঙনের পেছনে কাজ করছে। তবে সব বিচ্ছেদের কারণ এক নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের নির্যাতন বা অবহেলা থেকে মুক্তি পেতেও বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন স্বামী বা স্ত্রী।

রিয়াদ হাসান ও শাহনাজের নাম দুটি ছদ্মনাম। পাঁচ বছরের প্রেমের পর ২০১৭ সালের জুনে পারিবারিকভাবে তাঁদের বিয়ে হয়। পুরান ঢাকায় সংসার শুরু করা এই দম্পতির ঘরে ২০২১ সালে জন্ম নেয় একটি কন্যাসন্তান। কিন্তু এর মধ্যেই তাঁদের সম্পর্কে তৈরি হয় সন্দেহ ও মানসিক দূরত্ব।

একপর্যায়ে পারস্পরিক বিরোধ ও ঝগড়া বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালে তাঁদের দাম্পত্য সম্পর্কের অবসান ঘটে। এখন রিয়াদ পুরান ঢাকায় থাকেন, আর শাহনাজ মেয়েকে নিয়ে থাকেন মিরপুরে বাবার বাড়িতে।

শাহনাজের ভাষ্য, সন্তানের কথা ভেবে সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেও সফল হননি তিনি। বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। তাঁর দাবি, রিয়াদ সন্তানের ভরণপোষণের অর্থ দেন না।

রাজধানীর খিলগাঁওয়ের আরেক দম্পতি আরিফ ও নাজমার নয় বছরের সংসারও ভেঙেছে। দুজনই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। কাজের ব্যস্ততায় সংসারের দৈনন্দিন দায়িত্ব ও সাড়ে চার বছরের সন্তানকে সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধ ক্রমে বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা।

এ ধরনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা রাজধানীর দাম্পত্য সম্পর্কের সংকটের একটি দিক তুলে ধরে। তবে বিচ্ছেদের পেছনে ব্যক্তিভেদে কারণ ও পরিস্থিতি আলাদা হতে পারে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৭ হাজার ৫১৪টি তালাক কার্যকরের তথ্য দেওয়া হয়েছে। এই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৮টি তালাক কার্যকর হয়েছে।

অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ২ হাজার ৮৫১টি তালাক কার্যকর হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৬টি তালাক কার্যকর হয়েছে।

দুই সিটির তথ্যের সময়কাল এক নয়। দক্ষিণ সিটির তথ্য নয় মাসের, আর উত্তরের তথ্য ছয় মাসের। তাই সংখ্যাগুলো তুলনা করার সময় এই পার্থক্য বিবেচনায় রাখা জরুরি।

প্রতিবেদনে দেওয়া দুই সময়কালের হিসাব একত্রে ধরলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪৪টি তালাক কার্যকরের চিত্র পাওয়া যায়। তবে এই গড়কে একই সময়ের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ২০২৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাস পর্যন্ত মোট ২৩ হাজার ৩৯৯টি তালাক কার্যকরের তথ্য দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নারীদের পক্ষ থেকে ১৬ হাজার ৮৪৮টি এবং পুরুষদের পক্ষ থেকে ৬ হাজার ৫৫১টি তালাকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২০২৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, মোট ১৯ হাজার ৮৬৭টি তালাকের আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে নারীদের পক্ষ থেকে ১২ হাজার ৪৫০টি এবং পুরুষদের পক্ষ থেকে ৭ হাজার ৪১৭টি আবেদন করা হয়েছে।

তবে দক্ষিণ সিটির কার্যকর হওয়া তালাকের সংখ্যা এবং উত্তর সিটির আবেদনের সংখ্যা এক ধরনের পরিসংখ্যান নয়। তাই দুই এলাকার তথ্য যোগ করে নারীদের পক্ষ থেকে তালাকের মোট সংখ্যা নির্ধারণ করার আগে একই সময়কাল ও একই ধরনের তথ্য দিয়ে হিসাব মিলিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

তালাকের নোটিশে ‘মনের অমিল’ একটি পরিচিত কারণ হিসেবে উঠে আসে। কিন্তু এই শব্দবন্ধের আড়ালে থাকতে পারে নানা ধরনের সমস্যা।

প্রতিবেদনে চিহ্নিত সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—

- শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন

- যৌতুকের চাপ ও ভরণপোষণ না দেওয়া

- স্বামী বা স্ত্রীর প্রতি সন্দেহ ও আস্থার সংকট

- বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগ

- মাদকাসক্তি ও পারিবারিক দায়িত্বে অবহেলা

- আয়-ব্যয়ের চাপ ও আর্থিক বিরোধ

- প্রবাসী স্বামী-স্ত্রীর দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা

- পরিবারের অন্য সদস্যদের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ

- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে বিরোধ

- একে অন্যকে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া

- যোগাযোগের ঘাটতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার অভাব

এসব কারণ সব দম্পতির ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। আবার তালাকের নোটিশে লেখা কারণের সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙার পেছনের পূর্ণ পরিস্থিতির পার্থক্যও থাকতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের শিক্ষার প্রসার, কর্মসংস্থান এবং নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ার ফলে অসুখী বা নির্যাতনমূলক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ আগের তুলনায় বেড়েছে।

আগে অনেক নারী আর্থিক নির্ভরতা, সামাজিক চাপ কিংবা সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে দীর্ঘদিন সমস্যাপূর্ণ সম্পর্কে থেকে যেতেন। এখন অনেকেই নিজের আয় ও সামাজিক সহায়তার ওপর ভর করে আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন।

তবে নারীদের পক্ষ থেকে তালাকের আবেদন বেশি হওয়াকে শুধু পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় বা সম্পর্কের প্রতি অনীহা দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। কোনো নারী নির্যাতন বা দীর্ঘদিনের অবহেলা থেকে মুক্তি পেতে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিলে সেটি ভিন্ন বাস্তবতা নির্দেশ করে।

তাই তালাকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে আবেদনের সংখ্যা, বিচ্ছেদের কারণ, নির্যাতনের অভিযোগ এবং পুনর্মিলনের তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন পরিচয়, পুরোনো সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহ কিংবা অনলাইন যোগাযোগকে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ তৈরি হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এসব বিরোধ দাম্পত্য সম্পর্কে আস্থার সংকট আরও বাড়িয়ে দেয়।

মাদকাসক্তিও কোনো কোনো পরিবারে গুরুতর সমস্যা তৈরি করতে পারে। মাদক ব্যবহারের সঙ্গে দায়িত্বহীনতা, অর্থনৈতিক ক্ষতি, পারিবারিক বিরোধ বা নির্যাতনের ঘটনা যুক্ত হলে সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার বা মাদকাসক্তিকে সব বিবাহবিচ্ছেদের সাধারণ কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রতিটি ঘটনার পেছনের পরিস্থিতি আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, কিছু তালাকের নোটিশে স্বামী বা স্ত্রীর পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা না থাকায় নোটিশ ফেরত আসার ঘটনা ঘটে। আবার নোটিশ গ্রহণ না করা হলেও প্রযোজ্য আইনগত প্রক্রিয়া চলতে পারে।

মুসলিম পারিবারিক আইনে তালাকের নোটিশ ও পুনর্মিলনের সুযোগের বিষয়ে নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় নোটিশ যথাযথভাবে দেওয়া হয়েছে কি না, তালাক কখন কার্যকর হবে এবং কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে—তা সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রযোজ্য আইন দেখে নির্ধারণ করতে হয়।

দাম্পত্য বিচ্ছেদের পর সন্তানের দেখাশোনা, ভরণপোষণ, পড়াশোনা এবং মানসিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে। মা-বাবার মধ্যে বিরোধ চলতে থাকলে শিশুর দৈনন্দিন জীবনেও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সামাজিক চাপ বা সন্তানের কথা ভেবে নির্যাতনমূলক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাই সমাধান নয়। বরং সম্পর্কের সমস্যা গুরুতর হওয়ার আগেই নিরাপদ পরিবেশে আলোচনা, দাম্পত্য কাউন্সেলিং এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনগত সহায়তার সুযোগ থাকা জরুরি।

বিচ্ছেদ হলে মা-বাবা উভয়েরই সন্তানের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। শিশুকে বিরোধের মধ্যে জড়িয়ে না ফেলা, তার প্রয়োজনীয় খরচ ও যত্ন নিশ্চিত করা এবং মানসিক সহায়তা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকার তালাকের পরিসংখ্যান নগরজীবনের নানা চাপ ও দাম্পত্য সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজন তুলে ধরে। কর্মব্যস্ততা, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পারস্পরিক আস্থার অভাব, নির্যাতন এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে মতবিরোধ—এসব বিষয় কোনো কোনো সম্পর্কে গভীর সংকট তৈরি করতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ-অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক প্রতিবেদনে বলেছেন, উচ্চশিক্ষিত ও কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা বেশি হলেই বিবাহবিচ্ছেদ বাড়ে—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তাঁর মতে, দাম্পত্য সম্পর্কে সহনশীলতা, ধৈর্য এবং আলোচনার মাধ্যমে যৌথ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে, তালাকের সংখ্যা শুধু ভেঙে যাওয়া সংসারের হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা, আর্থিক স্থিতি এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ। তাই বিচ্ছেদের কারণ বোঝার পাশাপাশি নির্যাতন প্রতিরোধ, প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং শিশুদের সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়াও জরুরি।

সোহাগ/

আপনার জন্য নির্বাচিত নিউজ

ক্রিকেট

১৬ ডিসেম্বর হতে পারে আইপিএলের নিলাম, কোথায় হবে আয়োজন

১৬ ডিসেম্বর হতে পারে আইপিএলের নিলাম, কোথায় হবে আয়োজন

নিজস্ব প্রতিবেদক: ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) ২০২৭ মৌসুমের মিনি নিলাম আগামী ১৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হতে ...

লিটন-মিরাজের শতরানের জুটিতে লাঞ্চের আগে বাংলাদেশের লিড ৪৪৩

লিটন-মিরাজের শতরানের জুটিতে লাঞ্চের আগে বাংলাদেশের লিড ৪৪৩

নিজস্ব প্রতিবেদক: আবুধাবিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টে ব্যাট হাতে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন বাংলাদেশের লিটন দাস। ...

ফুটবল

রোনালদোর গোল ৯৮২

রোনালদোর গোল ৯৮২

নিজস্ব প্রতিবেদক: ক্যারিয়ারে ১ হাজার গোলের ঐতিহাসিক মাইলফলক ছোঁয়ার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন ...

হ্যারি কেইনের ৭৩ গোল, প্রথম ব্যালন ডি’অর জয়ের পথে কতটা এগিয়ে

হ্যারি কেইনের ৭৩ গোল, প্রথম ব্যালন ডি’অর জয়ের পথে কতটা এগিয়ে

নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্যালন ডি’অর জয়ের দৌড়ে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ও বায়ার্ন মিউনিখের ফরোয়ার্ড ...