ওয়ারিশের জমি আলাদা খতিয়ান করতে চান, জেনে নিন নামজারির নিয়ম
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাবা-মা বা পরিবারের কোনো সদস্যের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি নিজের নামে রেকর্ড করতে চাইলে নামজারির প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। তবে সব ওয়ারিশের নাম এক খতিয়ানে রাখতে চাইলে এবং প্রত্যেকে নিজের ভাগের জমির জন্য আলাদা খতিয়ান করতে চাইলে নিয়ম এক নয়।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, সব ওয়ারিশ একসঙ্গে যৌথ নামজারির আবেদন করলে শুধু বণ্টননামা নেই, এই কারণ দেখিয়ে আবেদন নামঞ্জুর করা উচিত নয়। অন্যদিকে, জমি ভাগ করে প্রত্যেকের নামে পৃথক খতিয়ান করতে চাইলে সাধারণত সব ওয়ারিশের সম্মতিতে নিবন্ধিত বণ্টননামা তৈরি করতে হয়। এরপর ওই দলিলের ভিত্তিতে পৃথক নামজারির আবেদন করা যায়। এ বিষয়ে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৩বি ধারায় বিধান রয়েছে।
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির নামজারির ক্ষেত্রে প্রথমে ওয়ারিশদের পরিচয়, জমির মালিকানা এবং প্রত্যেকের আইনগত প্রাপ্য অংশ যাচাই করা জরুরি। এরপর জমি যৌথভাবে রেকর্ড করবেন, নাকি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান করবেন, তা ঠিক করতে হবে।
১. ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করুন
মৃত জমির মালিকের বৈধ ওয়ারিশ কারা, তা প্রমাণের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র বা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কাছ থেকে ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করুন।
সনদে সব ওয়ারিশের নাম ও পরিচয়ের তথ্য সঠিক আছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। প্রত্যেকের জমির অংশ প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। তাই সব ক্ষেত্রে ওয়ারিশদের অংশ সমান হবে, এমন ধারণা করা ঠিক নয়।
২. জমির দলিল ও খতিয়ান যাচাই করুন
ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহের পর জমির মালিকানা-সংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই করুন। এ ক্ষেত্রে সাধারণত দেখতে হবে:
-
মূল মালিকের দলিল ও সংশ্লিষ্ট বায়া দলিল
-
সর্বশেষ খতিয়ান বা পর্চা
-
মৌজার নাম ও দাগ নম্বর
-
জমির মোট পরিমাণ
-
ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের তথ্য
-
জমি নিয়ে কোনো মামলা বা মালিকানা-বিরোধ রয়েছে কি না
কাগজপত্রে অসংগতি থাকলে জমি ভাগাভাগি বা নামজারির আবেদন করার আগে তা যাচাই করে নেওয়া ভালো।
৩. যৌথ নামজারি করবেন, নাকি পৃথক খতিয়ান করবেন?
ওয়ারিশের জমি নামজারির ক্ষেত্রে দুটি বিষয় আলাদা করে বুঝতে হবে।
যৌথ নামজারি: সব ওয়ারিশের নাম একই খতিয়ানে রাখতে চাইলে তাঁরা যৌথভাবে আবেদন করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদের ভিত্তিতে মৃত ব্যক্তির মোট জমির মধ্যে প্রত্যেকের প্রাপ্য অংশ উল্লেখ করা যায়। শুধু যৌথ নামজারির জন্য বণ্টননামা বাধ্যতামূলক নয় বলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয়েছে।
পৃথক নামজারি: প্রত্যেক ওয়ারিশ নিজের নির্দিষ্ট জমি আলাদা খতিয়ানে নিতে চাইলে জমির ভাগ নির্ধারণ করতে হবে। কোন ওয়ারিশ কোন দাগের কতটুকু জমি পাবেন, তা সব পক্ষের সম্মতিতে চূড়ান্ত করে নিবন্ধিত বণ্টননামা তৈরি করতে হয়।
৪. নিবন্ধিত বণ্টননামা তৈরি করুন
ওয়ারিশদের মধ্যে জমি ভাগাভাগির বিষয়ে সমঝোতা হলে বণ্টনের বিবরণ দিয়ে বণ্টননামা প্রস্তুত করতে হবে। এতে প্রত্যেকের বরাদ্দকৃত জমির পরিমাণ, দাগ নম্বর ও প্রয়োজনীয় সীমানার তথ্য সঠিকভাবে উল্লেখ করা জরুরি।
রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৩বি ধারা অনুযায়ী, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া স্থাবর সম্পত্তি আপসের মাধ্যমে ভাগ করার পর বণ্টননামা প্রস্তুত, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর স্বাক্ষর এবং নিবন্ধনের বিধান রয়েছে। নিবন্ধিত দলিলের ভিত্তিতে রেকর্ড সংশোধনের আবেদন করা যায়।
কোনো ওয়ারিশ বণ্টনে সম্মত না হলে তাঁর আইনগত অধিকার উপেক্ষা করে একতরফাভাবে জমি ভাগ করা উচিত নয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে আদালতের মাধ্যমে বাটোয়ারার ব্যবস্থা করতে হতে পারে।
৫. অনলাইনে নামজারির আবেদন করুন
বণ্টননামা নিবন্ধন সম্পন্ন হলে পৃথক খতিয়ান করতে ইচ্ছুক ওয়ারিশরা নামজারির আবেদন করতে পারেন। সরকারি ই-নামজারি পোর্টাল হলো:
ওয়েবসাইট: mutation.land.gov.bd
আবেদনের সময় প্রয়োজনীয় তথ্য ও দলিলের কপি জমা দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্তৃপক্ষ নথি যাচাই করে প্রয়োজন অনুযায়ী শুনানি বা তদন্তের পর সিদ্ধান্ত দেবেন। আবেদন অনুমোদিত হলে বরাদ্দকৃত জমির ভিত্তিতে পৃথক নামজারি খতিয়ান তৈরির ব্যবস্থা করা যায়।
আবেদনের ধরন ও জমির পরিস্থিতি অনুযায়ী কাগজপত্রের তালিকা ভিন্ন হতে পারে। সাধারণত নিচের নথিগুলো প্রস্তুত রাখা উপকারী:
-
ওয়ারিশ সনদ
-
মৃত জমির মালিকের মৃত্যু-সংক্রান্ত সনদ, প্রয়োজন হলে
-
জমির মূল দলিল বা প্রাসঙ্গিক দলিলের কপি
-
সর্বশেষ খতিয়ান বা পর্চা
-
পৃথক নামজারির ক্ষেত্রে নিবন্ধিত বণ্টননামা
-
আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য
-
মৌজার নাম, দাগ নম্বর ও জমির পরিমাণের বিবরণ
-
প্রযোজ্য ক্ষেত্রে হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা
-
প্রয়োজন অনুযায়ী মৌজা ম্যাপ বা আদালতের রায় ও আদেশের কপি
সব ক্ষেত্রে সব নথি প্রয়োজন নাও হতে পারে। আবেদন জমা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের নির্দেশনা যাচাই করুন।
জমির ভাগাভাগি নিয়ে ওয়ারিশদের মধ্যে মতবিরোধ থাকলে প্রথমে প্রত্যেকের আইনগত অংশ ও মালিকানার কাগজপত্র যাচাই করা প্রয়োজন। সমঝোতা সম্ভব না হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী দেওয়ানি আদালতে বাটোয়ারা মামলা করার প্রয়োজন হতে পারে।
কোনো ওয়ারিশকে তাঁর প্রাপ্য অংশ থেকে বাদ দেওয়া হলে বা জমির পরিমাণ ও সীমানা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে কাগজপত্র নিয়ে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিরোধপূর্ণ মালিকানার বিষয়টি শুধু নামজারির আবেদন দিয়ে সব ক্ষেত্রে নিষ্পত্তি করা যায় না।
নামজারি জমির সরকারি রেকর্ড হালনাগাদ করার গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। তবে শুধু নামজারি বা খতিয়ান তৈরি হলেই মালিকানা-সংক্রান্ত সব বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়ে যায় না। জমির দলিল, উত্তরাধিকারের অধিকার এবং প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী মালিকানা যাচাই করা প্রয়োজন।
তাই ওয়ারিশের জমি আলাদা খতিয়ানে নেওয়ার আগে সঠিক ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ, জমির কাগজপত্র যাচাই, আইন অনুযায়ী অংশ নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় বণ্টননামা নিবন্ধন করা জরুরি। এতে ভবিষ্যতে জমি বিক্রি, হস্তান্তর ও ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের ক্ষেত্রে জটিলতা কমাতে সহায়তা হতে পারে।
সোহাগ/
