জমির দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে কি না, জানবেন যেভাবে
নিজস্ব প্রতিবেদক: জমি কেনার পর দলিল সত্যিই রেজিস্ট্রি হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দলিল রেজিস্ট্রি অফিসে জমা দেওয়া, রসিদ পাওয়া এবং নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া এক বিষয় নয়। তাই জমি কেনার পর শুধু দলিলের কপি বা রসিদের ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড যাচাই করা উচিত।
বাংলাদেশে নিবন্ধিত দলিলের তথ্য যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দলিলের নম্বর, নিবন্ধনের সাল, বালাম বইয়ের তথ্য এবং প্রয়োজনে সার্টিফায়েড নকলের মাধ্যমে নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য মিলিয়ে দেখা যায়।
১. মূল দলিলের শেষ পাতার তথ্য দেখুন
নিবন্ধিত দলিলের শেষ পাতার উল্টো দিকে সাধারণত নিবন্ধনসংক্রান্ত কিছু তথ্য উল্লেখ থাকে। এর মধ্যে বালাম বইয়ের নম্বর, সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠা এবং নিবন্ধন কর্মকর্তার স্বাক্ষর থাকতে পারে।
এসব তথ্য দলিল যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। তবে শুধু সিল, স্বাক্ষর বা ছাপানো লেখা দেখেই দলিলের সত্যতা নিশ্চিত ধরে নেওয়া ঠিক নয়। সন্দেহ থাকলে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সংরক্ষিত রেকর্ডের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে নিন।
২. দলিল নম্বর ও সাল দিয়ে অফিসে খোঁজ নিন
দলিলের নম্বর, নিবন্ধনের সাল এবং কোন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলটি নিবন্ধিত হয়েছে, তা জানা থাকলে যাচাই করা সহজ হয়।
সংশ্লিষ্ট অফিসে গিয়ে দলিলের তথ্য দিয়ে রেকর্ড তল্লাশির নিয়ম জানতে পারেন। প্রয়োজনে সঙ্গে রাখুন—
-
দলিল নম্বর ও নিবন্ধনের সাল
-
ক্রেতা-বিক্রেতা বা দাতা-গ্রহীতার নাম
-
জমির মৌজার নাম
-
খতিয়ান ও দাগ নম্বর
-
মূল দলিলের কপি বা জমা দেওয়ার রসিদ
সব তথ্য জানা না থাকলেও অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী পাওয়া তথ্য দিয়ে তল্লাশির চেষ্টা করা যেতে পারে।
৩. দলিল নম্বর জানা না থাকলে সূচিবহি তল্লাশি করুন
পুরোনো দলিল হারিয়ে গেলে কিংবা দলিল নম্বর মনে না থাকলে যাচাইয়ের সুযোগ শেষ হয়ে যায় না। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সূচিবহি তল্লাশির পদ্ধতি জানতে পারেন।
দাতা বা বিক্রেতার নাম, গ্রহীতা বা ক্রেতার নাম এবং জমির মৌজার তথ্য দিয়ে দলিল শনাক্ত করতে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। অফিসের নিয়ম অনুযায়ী আরও তথ্য বা নির্ধারিত ফি প্রয়োজন হতে পারে।
রেকর্ড শনাক্ত হওয়ার পর প্রয়োজন হলে নিবন্ধিত দলিলের প্রত্যয়িত অনুলিপির জন্য আবেদন করা যায়।
৪. সার্টিফায়েড নকল তুলে তথ্য মিলিয়ে নিন
দলিলের নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো সার্টিফায়েড নকল বা প্রত্যয়িত অনুলিপি সংগ্রহ করা। এটি সংশ্লিষ্ট অফিসের সংরক্ষিত রেকর্ডের ভিত্তিতে দেওয়া হয়।
নকল হাতে পাওয়ার পর নিজের কাছে থাকা দলিলের কপির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলিয়ে দেখুন। যেমন—
-
দাতা ও গ্রহীতার নাম
-
দলিল নম্বর ও নিবন্ধনের সাল
-
জমির মৌজা, খতিয়ান ও দাগ নম্বর
-
জমির পরিমাণ ও সীমানার বিবরণ
-
নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য
কোনো অমিল পাওয়া গেলে নিজে থেকে দলিল জাল বা বাতিল বলে সিদ্ধান্ত নেবেন না। সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বিষয়টি যাচাই করুন। প্রয়োজন হলে ভূমি আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
৫. রেজিস্ট্রির রসিদ দিয়ে বর্তমান অবস্থা জানুন
দলিল জমা দেওয়ার পর পাওয়া রসিদ গুরুত্বপূর্ণ নথি। তবে শুধু রসিদ হাতে থাকলেই নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না।
রসিদে থাকা তথ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট অফিসে যোগাযোগ করে জানতে চান, দলিলের নিবন্ধন কার্যক্রম শেষ হয়েছে কি না এবং মূল দলিল সংগ্রহের জন্য প্রস্তুত কি না। নিবন্ধনের পর প্রয়োজনীয় রেকর্ড প্রস্তুত ও অন্যান্য দাপ্তরিক কাজ শেষ করতে সময় লাগতে পারে।
অনলাইনে ভূমিসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা পাওয়া গেলেও সব নিবন্ধিত দলিলের অবস্থা সরাসরি অনলাইনে যাচাই করা যায়—এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়। দলিলের রেকর্ড যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত।
নিবন্ধন অধিদপ্তরের সরকারি ওয়েবসাইটে তল্লাশি ও পরিদর্শন এবং নকলের আবেদনসংক্রান্ত ফরম খুঁজে দেখতে পারেন। আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট অফিস থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, প্রযোজ্য ফি এবং জমা দেওয়ার নিয়ম নিশ্চিত করুন।
না। দলিলের নিবন্ধন যাচাই করা এবং জমির মালিকানা ও অন্যান্য ঝুঁকি যাচাই করা আলাদা বিষয়।
নিবন্ধনসংক্রান্ত রেকর্ড পাওয়া গেলেও জমির পূর্ববর্তী মালিকানার ধারাবাহিকতা, জমির দখল, একই জমি নিয়ে বিরোধ বা অন্য কোনো দলিল রয়েছে কি না—এসব বিষয় প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করা উচিত। পাশাপাশি খতিয়ান, নামজারি এবং ভূমি উন্নয়ন করের তথ্যও মিলিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
মনে রাখবেন, দলিল নিবন্ধন, নামজারি এবং খতিয়ান হালনাগাদ একই প্রক্রিয়া নয়। একটি নথিতে তথ্য পাওয়া গেলেই অন্য সব বিষয় নিশ্চিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যাবে না।
প্রথমে যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলটি নিবন্ধিত হয়েছে, সেখানে যোগাযোগ করুন। অফিসের নাম জানা না থাকলে জমির মৌজা, অবস্থান ও দলিলের অন্যান্য তথ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট কার্যালয় শনাক্ত করার সহায়তা নিন।
সরকারি ফরম ও নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্যের জন্য নিবন্ধন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের ফরম বিভাগ দেখতে পারেন। আবেদন করার আগে অফিস থেকে তল্লাশি, পরিদর্শন বা নকলের জন্য প্রযোজ্য নিয়ম জেনে নিন।
সব মিলিয়ে, জমির দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে কি না নিশ্চিত হতে মূল দলিলের নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য পরীক্ষা করুন, সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেকর্ড তল্লাশি করুন এবং প্রয়োজনে সার্টিফায়েড নকল সংগ্রহ করুন। জমি কেনাবেচার আগে নিবন্ধনের পাশাপাশি মালিকানা ও ভূমি রেকর্ড যাচাই করাও জরুরি।
সোহাগ/
