লিভার সিরোসিস হলে কী খাবেন, কী খাবেন না? জেনে নিন
নিজস্ব প্রতিবেদক: লিভার সিরোসিস একটি গুরুতর রোগ, যেখানে দীর্ঘদিনের ক্ষতির কারণে লিভারের স্বাভাবিক কোষে স্থায়ী দাগ বা ক্ষত তৈরি হয়। এতে লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। এ রোগে অপুষ্টি, শরীরের ওজন কমে যাওয়া এবং পেশি ক্ষয়ের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
তাই লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য সঠিক খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় শুধু খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া নয়, বরং শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরি। তবে রোগীর শারীরিক অবস্থা, লিভারের ক্ষতির মাত্রা এবং অন্যান্য অসুস্থতার ওপর ভিত্তি করে খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করতে হয়।
লিভার সিরোসিস হলে যেসব খাবার খাবেন
১. প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার
লিভার সিরোসিসে পেশি ক্ষয় ও দুর্বলতা ঠেকাতে পর্যাপ্ত প্রোটিন প্রয়োজন। এ জন্য খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে—
- মাছ ও ভালোভাবে রান্না করা মাংস
- ডিম
- দুধ ও দই
- ডাল, ছোলা ও শিমজাতীয় খাবার
তবে কিডনির সমস্যা বা অন্য কোনো জটিলতা থাকলে প্রোটিনের পরিমাণ চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী ঠিক করা উচিত। চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া প্রোটিন খাওয়া অকারণে কমিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।
২. অল্প অল্প করে বারবার খাবার
লিভার সিরোসিসে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে শরীরের পেশি ভাঙার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই একবারে অনেক খাবার না খেয়ে দিনের বিভিন্ন সময়ে অল্প অল্প করে খাওয়া উপকারী।
সাধারণভাবে তিন থেকে চার ঘণ্টা পরপর খাবার খাওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রাতে ঘুমানোর আগে পুষ্টিকর নাশতা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে দীর্ঘ সময় উপবাসে থাকার বিরতি কমানো যায়।
৩. শাকসবজি ও ফলমূল
শাকসবজি, ফলমূল, পূর্ণ শস্য এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার সুষম খাদ্যতালিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব খাবার শরীরের প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ ও আঁশ সরবরাহ করে।
প্রতিদিনের খাবারে বৈচিত্র্য রাখুন। তবে ডায়াবেটিস, কিডনির সমস্যা বা রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা থাকলে কোন ফল ও সবজি কতটা খাবেন, তা চিকিৎসকের পরামর্শে নির্ধারণ করুন।
৪. পর্যাপ্ত ক্যালরিযুক্ত সুষম খাবার
সিরোসিসে অপুষ্টির ঝুঁকি থাকায় শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত ক্যালরি গ্রহণ করা জরুরি। ভাত, রুটি, ওটস, আলু এবং অন্যান্য শস্যজাতীয় খাবার থেকে শক্তি পাওয়া যায়। পাশাপাশি প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বির উপযুক্ত উৎসও খাদ্যতালিকায় রাখা প্রয়োজন।
লিভার সিরোসিস হলে যেসব খাবার এড়িয়ে চলবেন
১. অ্যালকোহল সম্পূর্ণ বন্ধ করুন
লিভার সিরোসিস থাকলে অ্যালকোহল সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা জরুরি। অ্যালকোহল লিভারের আরও ক্ষতি করতে পারে এবং রোগের জটিলতা বাড়াতে পারে। রোগের কারণ যা-ই হোক, এ ক্ষেত্রে অ্যালকোহল পান না করাই নিরাপদ।
২. অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার কমান
লিভার সিরোসিসের কারণে পেটে পানি জমা বা পা ফুলে যাওয়ার সমস্যা হলে চিকিৎসক খাবারে সোডিয়াম বা লবণের পরিমাণ কমাতে বলতে পারেন।
এ ক্ষেত্রে চিপস, চানাচুর, আচার, অতিরিক্ত লবণযুক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং বেশি লবণ দিয়ে রান্না করা খাবার সীমিত করা প্রয়োজন হতে পারে। পেটে পানি জমার ক্ষেত্রে অনেক সময় দৈনিক সোডিয়াম গ্রহণ ২ গ্রামের নিচে রাখার লক্ষ্য দেওয়া হয়। তবে এই পরিমাণ সবার জন্য একই নয়।
লবণ কমাতে গিয়ে যেন খাবারের স্বাদ ও পরিমাণ এতটাই কমে না যায় যে রোগী প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হন, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
৩. কাঁচা বা আধা সেদ্ধ খাবার খাবেন না
লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি হতে পারে। তাই কাঁচা বা আধা সেদ্ধ মাছ, মাংস, শেলফিশ এবং অপরিশোধিত বা পাস্তুরিত নয় এমন দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত।
মাছ-মাংস ভালোভাবে রান্না করে খেতে হবে। খাবার প্রস্তুত ও সংরক্ষণের সময় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও জরুরি।
৪. চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া হারবাল পণ্য বা সাপ্লিমেন্ট নয়
কিছু ভেষজ পণ্য, পুষ্টি-সাপ্লিমেন্ট ও ওষুধ লিভারের ক্ষতি করতে পারে। আবার কিছু পণ্যের উপাদান ও নিরাপত্তা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্যও থাকে না।
তাই লিভার সিরোসিস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া হারবাল ওষুধ, শরীরচর্চার সাপ্লিমেন্ট, ভিটামিন বা অন্য কোনো পুষ্টি-পরিপূরক গ্রহণ করবেন না। নিয়মিত কোনো ওষুধ খেলে সেটিও চিকিৎসককে জানানো প্রয়োজন।
লিভার সিরোসিসে সবার খাদ্যতালিকা কি একই?
না। রোগীর লিভারের অবস্থা, পেটে পানি জমা, পা ফুলে যাওয়া, কিডনির কার্যক্ষমতা, ডায়াবেটিস এবং অপুষ্টির মাত্রার ওপর ভিত্তি করে খাদ্যতালিকা পরিবর্তিত হতে পারে।
কেউ কেউ অতিরিক্ত লবণ কমানোর প্রয়োজন অনুভব করেন, আবার কারও পর্যাপ্ত ক্যালরি ও প্রোটিন নিশ্চিত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই সবার জন্য একই খাদ্যতালিকা অনুসরণ না করে চিকিৎসক বা লিভার রোগে অভিজ্ঞ পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
লিভার সিরোসিসে সঠিক খাদ্যাভ্যাস রোগীর পুষ্টি বজায় রাখতে এবং পেশি ক্ষয়ের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে। অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা, পর্যাপ্ত প্রোটিন ও ক্যালরি গ্রহণ, দীর্ঘ সময় না খেয়ে না থাকা এবং খাবারের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে খাদ্যাভ্যাস চিকিৎসার বিকল্প নয়। লিভার সিরোসিস শনাক্ত হলে নিয়মিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকা এবং নিজের শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী খাদ্যতালিকা তৈরি করাই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।
সিদ্দিকা/
