| ঢাকা, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

সমুদ্রে মাছ কমছে, বিপাকে পড়েছেন উপকূলের জেলেরা

জাতীয় ডেস্ক . বিনোদন৬৯.কম
২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৭ ১৩:৩৩:৪১
সমুদ্রে মাছ কমছে, বিপাকে পড়েছেন উপকূলের জেলেরা

নিজস্ব প্রতিবেদক: বছরের পর বছর অতিরিক্ত মাছ আহরণ, ক্ষতিকর জাল ব্যবহার এবং সামুদ্রিক আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে বাংলাদেশের সমুদ্রে মাছের মজুত উদ্বেগজনকভাবে কমে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছের আহরণে। মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন উপকূলীয় এলাকার জেলেরা।

অনেক জেলে বলছেন, সমুদ্রে গিয়ে যে পরিমাণ মাছ পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়ে ট্রলারের জ্বালানি, খাবার ও অন্যান্য খরচও অনেক সময় ওঠানো সম্ভব হচ্ছে না।

আগের তুলনায় কমেছে মাছের আহরণ

সম্প্রতি আলীপুরের মাছ অবতরণকেন্দ্রগুলো পরিদর্শনের সময় এফবি নূরজাহান ট্রলারের মালিক মিজান হোসেন জানান, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর তার ট্রলারে মাছের আহরণ অন্তত ৪০ শতাংশ কমেছে।

তার মতে, সমুদ্রে ব্যাপকভাবে অবৈধ ট্রলিং ও ক্ষতিকর জাল ব্যবহারের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

মিজান হোসেন বলেন, ট্রলিং জালে আকার ও প্রজাতি নির্বিশেষে বিভিন্ন ধরনের মাছ আটকা পড়ে। বিশেষ করে ছোট মাছ জালে ধরা পড়ার পর বেশির ভাগই মারা যায়। এতে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও মজুতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে।

কুয়াকাটার কাছে মহিপুর মৎস্যজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ফজলু গাজীও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তার দাবি, গত চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে চলতি বছর ইলিশের আহরণ সবচেয়ে কম।

তিনি জানান, প্রতিবছর জেলেদের মাছ ধরার জন্য অগ্রিম টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু মাছের পরিমাণ কমে যাওয়ায় সেই অগ্রিম অর্থ ফেরত পাওয়াও এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।

পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজয় নন্দীও মাছ আহরণ কমে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, শুধু ইলিশ নয়, অন্যান্য সামুদ্রিক মাছের আহরণও কমেছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর সামগ্রিকভাবে মাছ আহরণ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে।

কক্সবাজারেও একই পরিস্থিতি

কক্সবাজারের মাছ ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের কাছ থেকেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

শাহ্ জব্বারিয়া ফিশ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ইসমাইল হোসেন বলেন, একসময় একটি ট্রলার সমুদ্রে গিয়ে দেড় থেকে দুই টন পর্যন্ত ইলিশ নিয়ে ফিরত। এখন একই পরিমাণ ইলিশ সংগ্রহ করতে একাধিক ট্রলারকে সমুদ্রে যেতে হচ্ছে।

তার হিসাবে, জ্বালানি ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে একটি ট্রলারের প্রতিবার সমুদ্রযাত্রায় প্রায় চার লাখ টাকা ব্যয় হয়। অন্যান্য প্রজাতির মাছ ধরা পড়লেও মোট আহরণ এতটাই কম যে অনেক ট্রলারকে লোকসান গুনতে হচ্ছে।

কুতুবদিয়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ রমিজ, যিনি লেদু মাঝি নামে পরিচিত, মহিউদ্দিন কোম্পানির একটি ট্রলার পরিচালনা করেন। তিনি জানান, অল্প মাছের আশায় জেলেদের এখন সমুদ্রে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

তার ভাষায়, সমুদ্রে মাছ প্রায় নেই বললেই চলে। জাল ফেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক সময় সামান্য মাছ পাওয়া যায়।

চলতি বছরের ২৩ জুলাই ৬৫ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর তার ট্রলার ১০ বার সমুদ্রে গেছে। এতে প্রায় ৪০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। বিপরীতে মাছ বিক্রি করে আয় হয়েছে প্রায় ৪২ লাখ টাকা।

অথচ অতীতে একটি ট্রলার একবার সমুদ্রে গিয়েই ১০ লাখ থেকে ৪০ লাখ টাকার মাছ নিয়ে ফিরত বলে জানান তিনি।

লেদু মাঝির মতে, অগভীর সমুদ্রে ট্রলিং জালের ব্যবহার বেড়ে যাওয়াও মাছের মজুত কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। একসময় গভীর সমুদ্রে চলাচলকারী বড় জাহাজে এ ধরনের জাল ব্যবহারের প্রবণতা বেশি থাকলেও এখন কাঠের তৈরি ছোট ট্রলারেও অগভীর সমুদ্রে ট্রলিং করা হচ্ছে।

এতে শুধু সামুদ্রিক আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, কমবয়সী মাছ ও পোনাও ব্যাপকভাবে মারা যাচ্ছে।

সরকারি পরিসংখ্যানেও উৎপাদন কমার চিত্র

জেলেদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যেও সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯-১০ অর্থবছরে দেশে সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ১৭ হাজার টন। এরপর কয়েক বছর ধরে উৎপাদন বাড়তে বাড়তে ২০২১-২২ অর্থবছরে রেকর্ড ৭ লাখ ৬ হাজার টনে পৌঁছায়।

তবে এরপর থেকে টানা চার বছর সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন কমেছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রাথমিক হিসাবে সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ১৫ হাজার টন। গত ১৬ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন উৎপাদন। সর্বোচ্চ উৎপাদনের তুলনায় এ পরিমাণ প্রায় ২৭ শতাংশ কম।

মৎস্য অধিদপ্তরের ব্লু ইকোনমি বিভাগের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ শরিফুল আজম জানান, সামুদ্রিক মাছের সামগ্রিক উৎপাদন কমে যাওয়ার সঙ্গে ইলিশের আহরণ কমারও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। কারণ, দেশের মোট সামুদ্রিক মাছ আহরণের প্রায় ৪০ শতাংশই ইলিশ।

দূষণ ও অতিরিক্ত শিকার বড় কারণ

মৎস্য বিশেষজ্ঞ শরিফুল আজমের মতে, ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে নদী ও সমুদ্রের দূষণ, আবাসস্থলের পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত মাছ শিকার অন্যতম প্রধান কারণ।

তিনি বলেন, দূষণের কারণে নদী ও মাছের প্রজননক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে ইলিশের ডিম ফুটে পোনা হওয়ার হার এবং ছোট মাছের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় পানির নিচে চর ও বালুর বাঁধ তৈরি হয়েছে, যেগুলো স্থানীয়ভাবে ‘ডুবোচর’ নামে পরিচিত। এসব ডুবোচরের কারণে নদী ও সমুদ্রের মধ্যে ইলিশের চলাচলের পথ অগভীর হয়ে পড়ছে। এতে মাছের স্বাভাবিক বিচরণও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

অতিরিক্ত মাছ শিকার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দেশের প্রায় ৩০ হাজার ছোট ও মাঝারি আকারের মাছ ধরার নৌকার ৮৫ শতাংশের বেশি ইলিশ শিকারের সঙ্গে যুক্ত। বছরের পর বছর অতিরিক্ত আহরণের ফলে ইলিশের মজুত কমে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

হুমকিতে অন্যান্য সামুদ্রিক মাছও

শুধু ইলিশ নয়, অন্যান্য সামুদ্রিক মাছের মজুতও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

শরিফুল আজম জানান, বেহুন্দি জাল ও মোহনা এলাকায় ব্যবহৃত সেট ব্যাগ নেটের মাধ্যমে নির্বিচারে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরা পড়ছে। বিশেষ করে পোনা ও কমবয়সী মাছ এসব জালে ব্যাপকভাবে আটকা পড়ছে।

বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালানো হলেও এসব জালের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বরগুনা, পটুয়াখালী ও কলাপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় মনোফিলামেন্ট গিলনেট এবং অবৈধ ট্রল ডোর ও জালের ব্যবহারও মাছের মজুত কমার অন্যতম কারণ বলে জানান তিনি।

ফিরতে পারে মাছের মজুত, তবে প্রয়োজন সময়

সংশ্লিষ্টদের মতে, কার্যকরভাবে মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা করা গেলে সামুদ্রিক মাছের মজুত ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। এজন্য সমুদ্রে নজরদারি ও টহল বাড়ানোর পাশাপাশি মাছ ধরার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

তবে ইতোমধ্যে কমে যাওয়া মাছের মজুত আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে বলে সতর্ক করেছেন মৎস্য বিশেষজ্ঞরা।

মাছ ধরার নৌযানগুলো পর্যবেক্ষণের জন্য ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের ফিশারিজ মনিটরিং সেন্টারকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, মাছ ধরার নৌযানগুলোকে ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনা গেলে অবৈধ মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

একই সঙ্গে জেলে ও ট্রলার মালিকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং টেকসইভাবে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সোহাগ/

আপনার জন্য নির্বাচিত নিউজ

ক্রিকেট

এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের দল ঘোষণা, অধিনায়ক লিটন

এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের দল ঘোষণা, অধিনায়ক লিটন

নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০তম এশিয়ান গেমসে পুরুষ ক্রিকেট ইভেন্টের জন্য ১৫ সদস্যের দল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ...

সাব্বিরের ব্যাটে অস্ট্রেলিয়ার টানা জয় বাংলাদেশের

সাব্বিরের ব্যাটে অস্ট্রেলিয়ার টানা জয় বাংলাদেশের

নিজস্ব প্রতিবেদক: সাব্বির রহমানের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে অস্ট্রেলিয়ার ডারউইনে হোবার্ট হারিকেন্স একাডেমিকে হারিয়েছে বাংলাদেশ হাই পারফরম্যান্স ...

ফুটবল

৯০ মিনিটের খেলা শেষ; বার্সেলোনা-ভ্যালেন্সিয়া, জানুন ফলাফল

৯০ মিনিটের খেলা শেষ; বার্সেলোনা-ভ্যালেন্সিয়া, জানুন ফলাফল

নিজস্ব প্রতিবেদক: লা লিগায় নিজেদের দুর্দান্ত ফর্ম বজায় রেখে ভ্যালেন্সিয়াকে তাদেরই মাঠে ৫-০ গোলের বড় ...

৯০ মিনিটের খেলা শেষ; বাংলাদেশ-সিরিয়া অনূর্ধ্ব-২০, জানুন ফলাফল

৯০ মিনিটের খেলা শেষ; বাংলাদেশ-সিরিয়া অনূর্ধ্ব-২০, জানুন ফলাফল

নিজস্ব প্রতিবেদক: এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপ ২০২৭ বাছাইপর্বে সিরিয়ার কাছে ৩-০ গোলে হেরেছে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ ...