পৃথিবীর নতুন মিনি চাঁদ ২০২৬ QQ8, কত দিন থাকবে
নিজস্ব প্রতিবেদক: পৃথিবীর একমাত্র স্থায়ী প্রাকৃতিক উপগ্রহ চাঁদ। তবে মাঝেমধ্যে ছোট ছোট মহাকাশীয় বস্তু পৃথিবীর মহাকর্ষের টানে সাময়িকভাবে এর চারপাশে ঘুরতে শুরু করে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় এগুলোকে বলা হয় ‘মিনি মুন’ বা অস্থায়ী উপগ্রহ। এবার এমনই একটি ক্ষুদ্র মহাকাশীয় বস্তু পৃথিবীর মহাকর্ষের টানে আটকা পড়েছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ২০২৬ QQ8।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, বস্তুটি ২০২৬ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে পৃথিবীর মহাকর্ষীয় প্রভাবে সাময়িকভাবে আবদ্ধ হয়। তবে এর অস্তিত্ব প্রথম শনাক্ত করা হয় ২০ আগস্ট। পরে আরও পর্যবেক্ষণ ও কক্ষপথ বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি কোনো মহাকাশ আবর্জনা নয়, বরং প্রাকৃতিক একটি মহাকাশীয় বস্তু। আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়নের মাইনর প্ল্যানেট সেন্টার ২৯ অক্টোবর এ বিষয়ে তথ্য প্রকাশ করে।
কত দিন পৃথিবীর কাছে থাকবে এই মিনি চাঁদ?
২০২৬ QQ8 পৃথিবীর স্থায়ী উপগ্রহ নয়। বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, এটি ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পৃথিবীর মহাকর্ষের প্রভাবে আবদ্ধ থাকতে পারে। এরপর পৃথিবীর আকর্ষণ ছেড়ে আবার সূর্যকে কেন্দ্র করে নিজের কক্ষপথে চলতে শুরু করবে। ২০২৭ সালে এটি পৃথিবীর কাছ থেকে দূরে সরে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কক্ষপথের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ২০২৬ QQ8 সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে প্রায় ৩৫৯ দিন সময় নেয়। অর্থাৎ এর কক্ষপথের সময়কাল পৃথিবীর এক বছরের কাছাকাছি। প্রায় প্রতি ১০ বছর পরপর এটি পৃথিবীর কাছাকাছি আসে। তবে এবারের অবস্থানে পৃথিবীর মহাকর্ষের প্রভাবে সাময়িকভাবে আটকা পড়েছে।
পৃথিবী থেকে কত দূরে রয়েছে ২০২৬ QQ8?
মাইনর প্ল্যানেট সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর সঙ্গে সাময়িকভাবে আবদ্ধ থাকার সময় বস্তুটি একপর্যায়ে প্রায় ৩ লাখ ৫৩ হাজার মাইল বা ৫ লাখ ৬৮ হাজার কিলোমিটার দূরত্বে ছিল। এই দূরত্ব পৃথিবী ও চাঁদের গড় দূরত্বের চেয়ে বেশি।
মহাকাশীয় বস্তুটির আকারও খুব ছোট। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এর ব্যাস আনুমানিক ১ থেকে ২ মিটার বলা হয়েছে। এত ছোট এবং দূরবর্তী হওয়ায় এটি সাধারণ মানুষের খালি চোখে দেখার মতো নয়। এর অবস্থান ও গতিপথ নির্ণয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপ এবং উন্নত কম্পিউটার মডেলের সাহায্য নিতে হয়।
পৃথিবীর জন্য কি কোনো বিপদের কারণ হতে পারে?
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ QQ8 পৃথিবীর জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি করছে না। বস্তুটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করলেও এর ক্ষুদ্র আকারের কারণে বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে ঘর্ষণে পুড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে ভূপৃষ্ঠে পৌঁছে বড় ধরনের ক্ষতি করার আশঙ্কা নেই।
তবে এর গতিপথ পর্যবেক্ষণ করা বিজ্ঞানীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর কাছাকাছি আসা ছোট গ্রহাণুগুলোর গঠন, গতি এবং মহাকর্ষীয় আচরণ সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি করে এ ধরনের ঘটনা।
পৃথিবীর কি একাধিক মিনি চাঁদ থাকতে পারে?
হ্যাঁ। পৃথিবী অতীতেও বিভিন্ন সময়ে ছোট মহাকাশীয় বস্তুকে সাময়িকভাবে নিজের মহাকর্ষের প্রভাবে আবদ্ধ করেছে। এগুলো কিছু সময় পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে, পরে আবার মহাশূন্যে চলে যায়।
গবেষণায় ধারণা দেওয়া হয়েছে, যেকোনো সময়ে পৃথিবীর মহাকর্ষীয় প্রভাবে একাধিক অস্থায়ী উপগ্রহ থাকতে পারে। কিছু মডেল অনুযায়ী, একই সময়ে প্রায় ছয়টি পর্যন্ত ক্ষুদ্র বস্তু পৃথিবীর চারপাশে সাময়িকভাবে অবস্থান করতে পারে। তবে এগুলোর বেশির ভাগই এত ছোট যে সাধারণ পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ে না।
মডেলভিত্তিক গবেষণায় অস্থায়ী উপগ্রহের গড় আকার প্রায় ৭৫ সেন্টিমিটার এবং পৃথিবীর কাছে থাকার গড় সময় প্রায় নয় মাস বলে অনুমান করা হয়েছে। তবে প্রতিটি বস্তুর আকার, গতি ও অবস্থানের ওপর নির্ভর করে এই সময়ের পরিবর্তন হতে পারে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই মিনি চাঁদের আবিষ্কার?
২০২৬ QQ8-এর মতো বস্তু পৃথিবীর কাছাকাছি অবস্থান করায় বিজ্ঞানীরা গ্রহাণুর গতিপথ ও মহাকর্ষের প্রভাব আরও ভালোভাবে বুঝতে পারেন। এসব বস্তু পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সৌরজগতের ক্ষুদ্র মহাকাশীয় পাথরের গঠন এবং তাদের চলাচল সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া সম্ভব।
তবে ‘মিনি চাঁদ’ নাম শুনে রাতের আকাশে নতুন কোনো চাঁদ দেখার আশা করার কারণ নেই। ২০২৬ QQ8 এতটাই ছোট ও দূরে যে খালি চোখে এটি দেখা সম্ভব নয়। পৃথিবীর আকাশে এটি নতুন দৃশ্যমান চাঁদ নয়, বরং মহাকর্ষের টানে কিছু সময়ের জন্য পৃথিবীর সঙ্গী হয়ে থাকা এক ক্ষুদ্র মহাকাশীয় অতিথি।
সিদ্দিকা/
