নবম পে-স্কেলে ৫ অসংগতি, যেসব পরিবর্তন চান কর্মচারীরা
নিজস্ব প্রতিবেদক: ৯ম জাতীয় পে স্কেলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও গ্রেডভিত্তিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে নতুন করে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি তুলে ধরা হয়েছে। এসব বিষয়ে সংশোধনের দাবি জানিয়ে শিক্ষা ভাতা বৃদ্ধি, বাড়িভাড়া ভাতার হার সমন্বয়, বৈশাখী ভাতা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা, টিফিন ভাতা বাড়ানো এবং উচ্চতর গ্রেড প্রদানের নিয়ম স্পষ্ট করার প্রস্তাব দিয়েছেন কর্মচারীরা।
তাঁদের মতে, নতুন বেতন কাঠামোয় শুধু মূল বেতন বাড়ালেই হবে না। বিভিন্ন গ্রেডের কর্মচারীদের মধ্যে ভাতা ও মোট বেতনের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করাও জরুরি। বিশেষ করে দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় শিক্ষা, টিফিন ও বাড়িভাড়া ভাতার পরিমাণ পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তবে এসব প্রস্তাব কর্মচারীদের দাবি ও নিজস্ব হিসাবের ভিত্তিতে উত্থাপিত হয়েছে। এগুলো এখনো সরকারি সিদ্ধান্ত বা অনুমোদিত সংশোধনী নয়।
১. শিক্ষা ভাতা এক সন্তানের জন্য ২ হাজার, দুই সন্তানের জন্য ৪ হাজার টাকা করার প্রস্তাব
সরকারি কর্মচারীদের সন্তানদের পড়াশোনার খরচ দিন দিন বাড়ছে। বই, খাতা, পোশাক, যাতায়াতসহ শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতে অভিভাবকদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে প্রচলিত শিক্ষা ভাতার পরিমাণ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন কর্মচারীরা। তাঁদের প্রস্তাব অনুযায়ী, এক সন্তানের জন্য মাসিক শিক্ষা ভাতা ২ হাজার টাকা এবং দুই সন্তানের জন্য ৪ হাজার টাকা করা যেতে পারে।
তাঁদের যুক্তি, শিক্ষা ব্যয়ের সঙ্গে বর্তমান ভাতার সামঞ্জস্য না থাকায় বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। ভাতা বাড়ানো হলে সন্তানদের শিক্ষা ব্যয় মেটাতে কিছুটা সহায়তা পাওয়া যাবে।
২. বাড়িভাড়া ভাতায় গ্রেডভিত্তিক বৈষম্য দূর করার দাবি
নতুন বেতন কাঠামোয় বাড়িভাড়া ভাতার হার ও মূল বেতনের পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন গ্রেডের কর্মচারীদের মোট বেতনে অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কর্মচারীদের তুলে ধরা একটি উদাহরণে দেখা যায়, ১৭তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর মূল বেতন ২১ হাজার ৪০০ টাকা এবং বাড়িভাড়া ৬০ শতাংশ হিসাবে ১২ হাজার ৮৪০ টাকা। অন্যদিকে ১৫তম গ্রেডের কর্মচারীর মূল বেতন ২২ হাজার ৮০০ টাকা হলেও বাড়িভাড়া ৫০ শতাংশ হিসাবে দাঁড়ায় ১১ হাজার ৪০০ টাকা।
দুই কর্মচারীর অন্যান্য ভাতা সমান ধরে প্রস্তাবিত হিসাবটি এমন:
| বেতনের খাত | ১৭তম গ্রেড | ১৫তম গ্রেড |
|---|---|---|
| মূল বেতন | ২১,৪০০ | ২২,৮০০ |
| বাড়িভাড়া | ১২,৮৪০ | ১১,৪০০ |
| চিকিৎসা ভাতা | ৩,০০০ | ৩,০০০ |
| শিক্ষা ভাতা | ১,০০০ | ১,০০০ |
| যাতায়াত ভাতা | ৬০০ | ৬০০ |
| টিফিন ভাতা | ৫০০ | ৫০০ |
| ধোলাই ভাতা | ৩০০ | ৩০০ |
| মোবাইল ভাতা | ১৫০ | ১৫০ |
| মোট | ৩৯,৭৯০ | ৩৯,৭৫০ |
এই উদাহরণ অনুযায়ী, ১৭তম গ্রেডের কর্মচারীর মোট বেতন ১৫তম গ্রেডের কর্মচারীর চেয়ে ৪০ টাকা বেশি দাঁড়ায়। অর্থাৎ মূল বেতন বেশি হলেও বাড়িভাড়া ভাতার হারের কারণে মোট বেতনের ব্যবধান কমে যাচ্ছে।
এ সমস্যা সমাধানে ১০ম থেকে ১৫তম গ্রেডের বাড়িভাড়া ভাতা কর্মস্থলভেদে সমন্বয় করে ৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন কর্মচারীরা। তাঁদের মতে, এমন নীতি থাকা প্রয়োজন, যাতে উচ্চতর গ্রেডের কর্মচারীরা মোট বেতনের হিসাবে অযৌক্তিকভাবে পিছিয়ে না পড়েন।
৩. বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ বহাল রাখার দাবি
বৈশাখী ভাতার হার নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন সরকারি কর্মচারীদের একটি অংশ। তাঁদের দাবি, আগে মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বৈশাখী ভাতা দেওয়ার সুবিধা ছিল। নতুন কাঠামোর প্রস্তাবিত হিসাবে তা ১৫ শতাংশ করার বিষয়টি সামনে এসেছে।
এ অবস্থায় আগের মতো মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বৈশাখী ভাতা বহাল রাখার দাবি জানানো হয়েছে।
কর্মচারীদের যুক্তি, বাংলা নববর্ষ বাঙালির ঐতিহ্যবাহী উৎসব। উৎসবের ব্যয় ও জীবনযাত্রার খরচ বিবেচনায় ভাতার হার কমানোর পরিবর্তে আগের সুবিধা বজায় রাখা উচিত।
৪. টিফিন ভাতা ৫০০ টাকার পরিবর্তে বাড়ানোর প্রস্তাব
বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে মাসিক ৫০০ টাকা টিফিন ভাতার সামঞ্জস্য নেই বলে মনে করছেন কর্মচারীরা। তাঁদের দাবি, দৈনন্দিন নাশতার খরচ বিবেচনায় এই ভাতা পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
কর্মচারীদের দেওয়া একটি আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, সাধারণ নাশতার খরচ হতে পারে:
| নাশতার উপকরণ | আনুমানিক দাম |
|---|---|
| এক পিস পাউরুটি | ১৫ টাকা |
| একটি কলা | ১৫ টাকা |
| এক কাপ চা | ১৫ টাকা |
| এক গ্লাস পানি | ১০ টাকা |
| মোট | ৫৫ টাকা |
এই হিসাব ধরে সপ্তাহে পাঁচ দিন এবং মাসে গড়ে ২২ কর্মদিবস বিবেচনা করলে নাশতার খরচ দাঁড়ায় ১ হাজার ২১০ টাকা।
অন্যদিকে মাসিক ৫০০ টাকা টিফিন ভাতা ২২ কর্মদিবসে ভাগ করলে প্রতিদিন পাওয়া যায় প্রায় ২২ টাকা ৭৩ পয়সা। ফলে প্রস্তাবিত ভাতার পরিমাণ দৈনন্দিন নাশতার ব্যয়ের তুলনায় কম বলে দাবি করছেন কর্মচারীরা।
তাঁদের মতে, বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে টিফিন ভাতা বাড়ানো প্রয়োজন।
৫. উচ্চতর গ্রেড ও উন্নীত গ্রেডের নিয়ম আলাদা করার দাবি
উচ্চতর গ্রেড এবং উন্নীত গ্রেডের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করার দাবিও উঠেছে। কর্মচারীদের বক্তব্য, এই দুটি বিষয় এক নয়। তাই দুটির জন্য পৃথক ও সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।
তাঁদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, উচ্চতর গ্রেড হলো নির্দিষ্ট চাকরির মেয়াদ, পদোন্নতির সুযোগ এবং প্রযোজ্য শর্ত পূরণের ভিত্তিতে পাওয়া আর্থিক সুবিধা। অন্যদিকে উন্নীত গ্রেড সাধারণত পদ বা চাকরির কাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, পদোন্নতি না পাওয়া কর্মচারীদের ক্ষেত্রে চাকরিতে যোগদানের তারিখ থেকে চাকরির সময়কাল গণনা করে উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা নিশ্চিত করা উচিত। এ ক্ষেত্রে ৮ বছর এবং পরবর্তী ৬ বছর পূর্ণ হলে দুটি উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার প্রস্তাবও তুলে ধরা হয়েছে।
কর্মচারীদের দাবি, পদোন্নতি, চাকরির মেয়াদ এবং গ্রেড উন্নীতকরণের বিষয়গুলো আলাদাভাবে বিবেচনা করলে দীর্ঘদিন পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মচারীদের সুবিধা নির্ধারণে জটিলতা কমবে।
কর্মচারীদের উত্থাপিত পাঁচটি প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো বেতন-ভাতার মধ্যে সামঞ্জস্য আনা এবং গ্রেডভিত্তিক অসংগতি কমানো। প্রস্তাবগুলো বিবেচনায় নেওয়া হলে সম্ভাব্য পরিবর্তনগুলো হতে পারে:
১. শিক্ষা ভাতা বাড়লে সন্তানদের পড়াশোনার খরচে কর্মচারীরা বাড়তি সহায়তা পাবেন।
২. বাড়িভাড়া ভাতার হার সমন্বয় হলে বিভিন্ন গ্রেডের মোট বেতনের ব্যবধান আরও যৌক্তিক হতে পারে।
৩. বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ বহাল থাকলে আগের উৎসব সুবিধা বজায় থাকবে।
৪. টিফিন ভাতা বাড়ানো হলে দৈনন্দিন নাশতার ব্যয়ের সঙ্গে ভাতার পরিমাণের সামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে।
৫. উচ্চতর গ্রেড ও উন্নীত গ্রেডের নিয়ম আলাদা হলে চাকরির মেয়াদ ও পদোন্নতির ভিত্তিতে সুবিধা নির্ধারণ সহজ হতে পারে।
৯ম জাতীয় পে স্কেল নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের আলোচনায় বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি ভাতা ও গ্রেডভিত্তিক সুযোগ-সুবিধার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে। তাঁদের মতে, নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার সময় জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মস্থল, চাকরির মেয়াদ এবং পদোন্নতির সুযোগ বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
তবে শিক্ষা ভাতা, বাড়িভাড়া, বৈশাখী ভাতা, টিফিন ভাতা কিংবা উচ্চতর গ্রেডের বিষয়ে উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো এখনো কর্মচারীদের দাবি হিসেবেই বিবেচিত হবে। এগুলো বাস্তবায়নের বিষয়ে কোনো সরকারি অনুমোদন বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
তাই এসব সুবিধা কার্যকর হয়েছে বা সরকার অনুমোদন দিয়েছে, এমন ধারণা করা ঠিক হবে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন বা আদেশ জারি হলেই কেবল চূড়ান্ত নিয়ম ও সুবিধার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।
সোহাগ/
