নতুন পে-স্কেলে বেতন কত হবে, গ্রেডভিত্তিক হিসাবের নতুন জেনারেটর
নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কত হতে পারে, তা হিসাব করার জন্য তৈরি করা হয়েছে একটি সমন্বিত Salary Statement Generator। এই টুলের মাধ্যমে পুরোনো মূল বেতন, নতুন গ্রেড, বেতন ফিক্সেশন, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতার হিসাব করা যাবে। পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে কর্তন বাদ দিয়ে সম্ভাব্য মাসিক নীট বেতনও দেখা যাবে।
নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে সরকারি কর্মচারীদের অন্যতম আগ্রহের বিষয় হবে নিজের নতুন মূল বেতন কত দাঁড়াবে। তবে শুধু গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন জানলেই প্রত্যেক কর্মচারীর প্রকৃত বেতন নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কারণ চাকরির বয়স, পূর্ববর্তী মূল বেতন, ইনক্রিমেন্ট ও অন্যান্য তথ্যের ওপর নির্ভর করে একই গ্রেডের কর্মচারীদের বেতনেও পার্থক্য হতে পারে।
এই বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে তৈরি করা জেনারেটরটিতে ব্যক্তিগত তথ্য থেকে শুরু করে পুরোনো ও নতুন বেতনের তুলনা, ফিক্সেশন, ভাতা, কর্তন এবং মাসিক বেতন বিবরণী তৈরির সুবিধা রাখা হয়েছে।
গ্রেড নির্বাচন করলেই দেখা যাবে নতুন বেতনের তথ্য
জেনারেটরটিতে গ্রেড-১ থেকে গ্রেড-২০ পর্যন্ত নির্বাচন করার ব্যবস্থা রয়েছে। কর্মচারী নিজের গ্রেড নির্বাচন করলে সংশ্লিষ্ট নতুন ও পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক মূল বেতন এবং বেতনধাপের তথ্য দেখা যাবে।
টুলটিতে সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন স্কেলে গ্রেড-১-এর প্রারম্ভিক মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং গ্রেড-২০-এর প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা। মধ্যবর্তী গ্রেডগুলোর জন্যও পৃথক বেতনধাপ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া নতুন স্কেলের বেতনধাপের তালিকা পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ প্রয়োজন হলে ব্যবহারকারী নিজেই নির্দিষ্ট ঘরে সংশোধিত তথ্য বসাতে পারবেন।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জেনারেটরে থাকা বেতনধাপগুলো সফটওয়্যারে সংরক্ষিত তথ্য। এগুলোকে সরকারি গেজেটের সঙ্গে যাচাই না করে চূড়ান্ত বেতন কাঠামো হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না।
৩০ জুন ২০২৬-এর মূল বেতন দিয়ে হবে ফিক্সেশনের হিসাব
নতুন পে-স্কেলে বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে কর্মচারীর গৃহীত মূল বেতনকে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
জেনারেটরটির নির্ধারিত পদ্ধতিতে প্রথমে পুরোনো মূল বেতন থেকে পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক মূল বেতন বাদ দিয়ে পার্থক্য বের করা হয়। এরপর সেই পার্থক্য নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক মূল বেতনের সঙ্গে যোগ করে সম্ভাব্য সমন্বিত বেতন হিসাব করা হয়।
সহজভাবে হিসাবটি হলো:
নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন + (পুরোনো মূল বেতন - পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন) = সমন্বয়যোগ্য বেতন।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো কর্মচারীর পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৯ হাজার ৩০০ টাকা এবং ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে তাঁর মূল বেতন ১২ হাজার ৪৯০ টাকা হলে পার্থক্য দাঁড়ায় ৩ হাজার ১৯০ টাকা।
নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন ২১ হাজার ৯০০ টাকা হলে সমন্বয়ের পর হিসাব দাঁড়াবে ২৫ হাজার ৯০ টাকা। এরপর জেনারেটরের বেতনধাপের তালিকা অনুযায়ী সমান বা পরবর্তী উচ্চতর ধাপ নির্বাচন করে সম্ভাব্য নির্ধারিত বেতন দেখানো হয়।
তবে এই হিসাব জেনারেটরের নিজস্ব সূত্রের ভিত্তিতে তৈরি। সরকারি চূড়ান্ত ফিক্সেশন পদ্ধতি ও অনুমোদিত বেতনধাপের সঙ্গে এটি মিলিয়ে নেওয়া জরুরি।
ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধির হিসাবও দেখা যাবে
জেনারেটরটিতে কয়েকটি নির্দিষ্ট তারিখ ধরে বেতন বৃদ্ধির সম্ভাব্য হিসাব দেখানোর ব্যবস্থা রয়েছে। তারিখগুলো হলো:
-
১ জুলাই ২০২৬
-
১ জানুয়ারি ২০২৭
-
১ জুলাই ২০২৭
-
১ জানুয়ারি ২০২৮
টুলটির ডিফল্ট সেটিং অনুযায়ী, গ্রেড-১ থেকে গ্রেড-৯-এর ক্ষেত্রে প্রথম পর্যায়ে ৪০ শতাংশ, পরবর্তী পর্যায়ে মোট ৭০ শতাংশ এবং শেষ পর্যায়ে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধির হার রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে গ্রেড-১০ থেকে গ্রেড-২০-এর জন্য প্রথম পর্যায়ে ৫০ শতাংশ, পরবর্তী পর্যায়ে মোট ৭৫ শতাংশ এবং সর্বশেষ পর্যায়ে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধির হার দেখানো হয়েছে।
ব্যবহারকারী চাইলে এসব শতাংশ পরিবর্তন করে নিজের মতো করে হিসাব করতে পারবেন। তবে এগুলো জেনারেটরের পূর্বনির্ধারিত সেটিং। সংশ্লিষ্ট তারিখে সরকার কত শতাংশ বেতন কার্যকর করবে, তা সরকারি গেজেট ও বাস্তবায়ন আদেশের ওপর নির্ভর করবে।
কর্মস্থল অনুযায়ী বাড়িভাড়া হিসাবের সুবিধা
সরকারি কর্মচারীদের বেতনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাড়িভাড়া ভাতা। এ কারণে জেনারেটরটিতে কর্মস্থল অনুযায়ী বাড়িভাড়ার হিসাবের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এতে তিন ধরনের কর্মস্থল নির্বাচন করা যায়:
১. ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকা।
২. চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন এবং সাভার পৌর এলাকা।
৩. অন্যান্য স্থান।
কর্মস্থল নির্বাচন করার পর মূল বেতনের বিভিন্ন স্তর অনুযায়ী সম্ভাব্য বাড়িভাড়ার হিসাব দেখানো হয়। জেনারেটরের তথ্য অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি ২০২৮-এর আগের সময়ের জন্য ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মূল বেতনকে ভিত্তি ধরে বাড়িভাড়া হিসাব করা হচ্ছে। আর ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে নতুন মূল বেতনের ভিত্তিতে ভাতা হিসাবের ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে প্রকৃত বাড়িভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশ, কর্মস্থল এবং প্রযোজ্য সর্বনিম্ন সীমা যাচাই করতে হবে।
চিকিৎসা, টিফিন ও যাতায়াত ভাতার হিসাব
বাড়িভাড়ার পাশাপাশি অন্যান্য ভাতার হিসাবও যুক্ত করা হয়েছে জেনারেটরে। এতে পুরোনো ও নতুন ভাতার জন্য কিছু পূর্বনির্ধারিত অঙ্ক রাখা হয়েছে।
| ভাতার ধরন | পুরোনো অঙ্ক | জেনারেটরের নতুন অঙ্ক |
|---|---|---|
| চিকিৎসা ভাতা | ১,৫০০ টাকা | ৩,০০০ টাকা |
| টিফিন ভাতা | ২০০ টাকা | ৫০০ টাকা |
| যাতায়াত ভাতা | ০ টাকা | ৬০০ টাকা |
| ধোলাই ভাতা | ১০০ টাকা | ৩০০ টাকা |
| মোবাইল ভাতা | ০ টাকা | ১৫০ টাকা |
এ ছাড়া শিক্ষা সহায়ক ভাতা, প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা, কার্যভার ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা, পাহাড়ি ভাতা, হাওর-দ্বীপ-চর ভাতা, পোশাক ভাতা এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব ভাতার মতো খাতও যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
তবে টেবিলে দেওয়া অঙ্কগুলো জেনারেটরের পূর্বনির্ধারিত তথ্য। এগুলোকে সব সরকারি কর্মচারীর জন্য অনুমোদিত নতুন ভাতার হার হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
কর্তন বাদ দিয়ে জানা যাবে সম্ভাব্য নীট বেতন
জেনারেটরটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, মোট বেতন থেকে বিভিন্ন খাতের কর্তন বাদ দিয়ে সম্ভাব্য নীট বেতন হিসাব করা।
এতে ভবিষ্য তহবিল বা জিপিএফ, কল্যাণ তহবিল, আয়কর, গ্যাস বিল, গ্রুপ বীমা এবং অন্যান্য কর্তনের তথ্য যুক্ত করা যায়।
কোনো খাতে মূল বেতনের নির্দিষ্ট শতাংশ হারে কর্তন হলে সেই হার বসানো যাবে। আবার নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা কর্তন হলে সরাসরি টাকার পরিমাণ উল্লেখ করা যাবে।
এরপর মূল বেতন ও সব ভাতা যোগ করে মোট বেতন এবং সেখান থেকে কর্তনের অঙ্ক বাদ দিয়ে নীট বেতন দেখাবে জেনারেটরটি। ফলে কর্মচারীরা সম্ভাব্য মোট বেতন এবং মাস শেষে হাতে পাওয়া অর্থের একটি ধারণা পাবেন।
৩০ মাসের মাসিক বেতন বিবরণী তৈরি করা যাবে
জেনারেটরটিতে জুলাই ২০২৬ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩০ মাসের বেতন বিবরণী তৈরির সুবিধা রয়েছে। ব্যবহারকারী কত মাসের হিসাব দেখতে চান, তা নির্বাচন করতে পারবেন।
মাসভিত্তিক বিবরণীতে থাকবে:
-
মাস ও বছর অনুযায়ী মূল বেতন।
-
প্রতিটি ভাতার পৃথক হিসাব।
-
মোট মাসিক বেতন।
-
বিভিন্ন খাতের কর্তন।
-
মোট কর্তনের পরিমাণ।
-
কর্তন বাদ দেওয়ার পর নীট বেতন।
একাধিক মাসের হিসাব একসঙ্গে দেখা এবং নির্দিষ্ট সময়ের মোট বেতন, কর্তন ও নীট বেতনের সমষ্টিও বের করা যাবে।
তবে জেনারেটরটির বর্তমান ব্যবস্থায় উৎসব ভাতা ও বকেয়া বেতন অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। একইভাবে ১ জুলাই ২০২৮-এর পরবর্তী বার্ষিক ইনক্রিমেন্টও হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে।
PDF ও প্রিন্টে সংরক্ষণ করা যাবে বেতন বিবরণী
বেতন হিসাব সম্পন্ন হওয়ার পর পুরো বিবরণী প্রিন্ট অথবা PDF আকারে সংরক্ষণ করা যাবে। এতে কর্মচারীর ব্যক্তিগত তথ্য, পদবি, অফিসের নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, ভেরিফিকেশন নম্বর এবং বেতন নির্ধারণের বিভিন্ন ধাপ দেখানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
এ ছাড়া তারিখ অনুযায়ী মূল বেতন, মোট ভাতা, কর্তন এবং নীট বেতনের হিসাবও আলাদাভাবে দেখা যাবে। মাসিক স্যালারি শিটের জন্য রয়েছে পৃথক প্রিন্ট সুবিধা।
জেনারেটরের হিসাব ব্যবহারের আগে যেসব বিষয় যাচাই করবেন
জেনারেটরটি সরকারি কর্মচারীদের সম্ভাব্য বেতন হিসাব সহজ করতে তৈরি হলেও এতে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই এর ফলাফলকে সরাসরি সরকারি বেতন নির্ধারণ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।
প্রথমত, পুরোনো স্কেলের সব গ্রেডের বেতনধাপ সরাসরি সরকারি তালিকা থেকে নেওয়া হয়নি। গ্রেড-১৬-এর জন্য নির্দিষ্ট ধাপের তালিকা থাকলেও অন্য কিছু গ্রেডের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের সূত্র ব্যবহার করে ধাপ তৈরির ব্যবস্থা রয়েছে। তাই প্রকৃত সরকারি বেতনধাপের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, ভাতা ও কর্তনের প্রাথমিক অঙ্কগুলো পরিবর্তনযোগ্য। ফলে এগুলো সব কর্মচারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সরকারি হার, এমনটি ধরে নেওয়া যাবে না।
তৃতীয়ত, বিভিন্ন তারিখে বেতন বৃদ্ধির হিসাবেও কিছু গণনাগত অসংগতি থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে ১ জুলাই ২০২৭ তারিখের অবশিষ্ট বেতন বৃদ্ধির অঙ্ক এবং সংশ্লিষ্ট বিবরণীর প্রদর্শিত হিসাবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই ব্যবহার করার আগে সফটওয়্যারের এই অংশ যাচাই করা প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জেনারেটরটি কোনো সরকারি পে-ফিকেশন আদেশ নয়। এটি ব্যবহারকারীর দেওয়া তথ্য ও সফটওয়্যারে সংরক্ষিত সূত্রের ভিত্তিতে সম্ভাব্য হিসাব তৈরি করে।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য কেন কাজে আসতে পারে?
নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার সময় প্রত্যেক কর্মচারী নিজের মূল বেতন, ইনক্রিমেন্ট, বাড়িভাড়া, অন্যান্য ভাতা এবং কর্তন শেষে নীট বেতন সম্পর্কে জানতে চাইবেন।
একই গ্রেডে চাকরি করলেও চাকরিতে যোগদানের সময়, পূর্ববর্তী মূল বেতন ও ইনক্রিমেন্টের কারণে কর্মচারীদের বেতনে পার্থক্য থাকতে পারে। তাই ব্যক্তিগত তথ্যের ভিত্তিতে আলাদা হিসাব করা গুরুত্বপূর্ণ।
এই জেনারেটরটি এক জায়গায় পুরোনো ও নতুন বেতনের তুলনা, সম্ভাব্য ফিক্সেশন, ভাতা, কর্তন এবং মাসিক বেতন বিবরণী দেখার সুযোগ দিচ্ছে। ফলে সরকারি কর্মচারীরা নিজেদের সম্ভাব্য বেতন সম্পর্কে আগাম ধারণা পেতে পারেন।
তবে চূড়ান্ত বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারি গেজেট, বাস্তবায়ন আদেশ এবং হিসাবরক্ষণ কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত হিসাবই অনুসরণ করতে হবে। জেনারেটরের ফলাফলকে প্রাথমিক ধারণা হিসেবে ব্যবহার করাই নিরাপদ।
সোহাগ/
