তাহসিফ মামলায় দীপের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ
নিজস্ব প্রতিবেদক: বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। তদন্তকারীদের দাবি, ঘটনার দিন সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত তাহসিফের সঙ্গে ছিলেন দীপ। পরে দুজন টঙ্গীর একটি এলাকায় গেলেও সেখান থেকে দীপ একাই ফিরে আসেন বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ঘটনায় দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। শনিবার তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাসিব উল্লাহ পিয়াস এই আদেশ দেন।
নৌ পুলিশ ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় দীপের সংশ্লিষ্টতার কিছু প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। রিমান্ডে তাঁকে আরও বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে এর বেশি তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।
তদন্তের সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঘটনার দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত দেড়টা পর্যন্ত তাহসিফের সঙ্গে ছিলেন দীপ।
তদন্তকারীদের দাবি, দীপ তাহসিফকে সঙ্গে নিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন। তবে সেখান থেকে দীপ একাই ফিরে আসেন। বিষয়টি তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য এবং সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে দীপের সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম জানিয়েছেন, দীপ তাঁদের বাসায় নিয়মিত আসতেন এবং তাহসিফের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পিবিআইয়ের তদন্তের সময় দীপ টঙ্গীতে যাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। অথচ এর আগে তিনি জানিয়েছিলেন, তাহসিফকে তাঁদের বাসার কম্পাউন্ডে নামিয়ে দিয়ে গেছেন। দীপের এই দুই বক্তব্যের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে বলে মনে করছেন তাহসিফের বাবা।
তবে হত্যাকাণ্ডে কে বা কারা জড়িত, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে চাননি তিনি। পরিবারের প্রত্যাশা, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসবে এবং দায়ীদের শনাক্ত করা হবে।
গত ২৯ অক্টোবর রাতে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসা থেকে দীপকে হেফাজতে নেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পরে তাহসিফের বাবা উত্তরখান থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করলে তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
এর আগে ২৮ অক্টোবর বিকেলে টঙ্গীর তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগের দিন থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন।
নিখোঁজ হওয়ার কিছুক্ষণ আগে ধারণ করা সিসিটিভি ফুটেজে এক যুবকের সঙ্গে মোটরসাইকেলে করে তাঁকে বের হতে দেখা যায়। পরিবারের সদস্যরা ওই যুবককে দীপ হিসেবে শনাক্ত করেন।
পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দীপকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। একপর্যায়ে নম্বরপ্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেলও উদ্ধার করে পিবিআই।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনী কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতি (রাওয়া)। সংগঠনটির একটি প্রতিনিধি দল তাহসিফের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ নেয়।
রাওয়ার প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, তাঁরা পুরো ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান। তদন্তের অগ্রগতির ওপরও সংগঠনটি নজর রাখবে।
এদিকে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটিও (এইচআরএসএস) ঘটনার স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও পাওয়া তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি থাকলে তা গুজবের মাধ্যমে নয়, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
তাহসিফ কীভাবে তুরাগ নদে গেলেন, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় ঠিক কী ঘটেছিল এবং তাঁর মৃত্যুর পেছনে কারা জড়িত, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। ইউনিফর্ম পরা ব্যক্তিদের ধাওয়ার যে কথা দীপের বক্তব্যে এসেছে, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, রিমান্ডে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এসব বিষয়ে আরও তথ্য জানার চেষ্টা করা হবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
সোহাগ/
