সরকারি চাকরিজীবীরা বাড়ি বা ফ্ল্যাটের ঋণ পাবেন যেভাবে
নিজস্ব প্রতিবেদক: নিজের একটি বাড়ি কিংবা ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন অনেক সরকারি চাকরিজীবীর। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সরকারি কর্মচারীদের জন্য রয়েছে গৃহ নির্মাণ ও ফ্ল্যাট ক্রয়ের ঋণ সুবিধা। তবে এই ঋণ পেতে নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ, অনলাইনে আবেদন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা এবং ব্যাংকের যাচাইসহ কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করতে হয়।
সরকারি চাকরিজীবীদের গৃহ নির্মাণ ঋণসংক্রান্ত নীতিমালার আওতায় যোগ্য কর্মচারীরা নির্ধারিত শর্তে এ সুবিধার জন্য আবেদন করতে পারেন। তবে চাকরির ধরন, বয়স, বেতন, ঋণের পরিমাণ এবং সুদের হারসহ বিভিন্ন বিষয় সংশ্লিষ্ট নীতিমালা ও ব্যাংকের শর্তের ওপর নির্ভর করে।
তাই আবেদন করার আগে সর্বশেষ সরকারি নির্দেশনা দেখে নেওয়া জরুরি। চলুন, বাড়ি নির্মাণ বা ফ্ল্যাট কেনার ঋণ পেতে আবেদন থেকে অনুমোদন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি জেনে নেওয়া যাক।
কারা সরকারি গৃহ নির্মাণ ঋণের জন্য আবেদন করতে পারবেন?
সরকারি কর্মচারীদের গৃহ নির্মাণ বা ফ্ল্যাট ক্রয়ের ঋণ পেতে প্রথমেই নিজের যোগ্যতা যাচাই করতে হবে। এ ক্ষেত্রে চাকরির ধরন, চাকরির স্থায়িত্ব, বয়স, বেতন এবং সংশ্লিষ্ট নীতিমালায় উল্লেখ করা অন্যান্য শর্ত বিবেচনা করা হতে পারে।
কিছু প্রচারিত নির্দেশিকায় চাকরির ন্যূনতম মেয়াদ পাঁচ বছর এবং সর্বোচ্চ বয়স ৫৬ বছরের কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে এই শর্তগুলো সবার ক্ষেত্রে বর্তমানে কার্যকর কি না, তা সংশ্লিষ্ট সরকারি নীতিমালা থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
আবেদনকারীর নাম, পদবি, কর্মস্থল, বেতন ও চাকরিসংক্রান্ত তথ্য সরকারি নথির সঙ্গে মিল থাকা জরুরি।
প্রথম ধাপ: iBAS++ পোর্টালে অনলাইনে আবেদন
যোগ্যতা যাচাইয়ের পর নির্ধারিত পদ্ধতিতে অনলাইনে আবেদন করতে হবে। প্রকাশিত নির্দেশিকা অনুযায়ী, অর্থ মন্ত্রণালয়ের iBAS++ সিস্টেমে প্রবেশ করে ‘House Loan Subsidy Application (Self)’ অপশন থেকে আবেদন ফরম পূরণ করতে হয়।
আবেদনের সময় সাধারণত যেসব তথ্য প্রয়োজন হতে পারে:
-
আবেদনকারীর নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর
-
পদবি ও কর্মস্থলের বিবরণ
-
চাকরিসংক্রান্ত তথ্য
-
বর্তমান বেতন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য
-
ঋণের উদ্দেশ্য, অর্থাৎ বাড়ি নির্মাণ নাকি ফ্ল্যাট কেনা
-
প্রস্তাবিত সম্পত্তির প্রয়োজনীয় বিবরণ
অনলাইন ফরম পূরণের সময় প্রতিটি তথ্য সতর্কতার সঙ্গে দিতে হবে। ভুল তথ্য বা নথির সঙ্গে অমিল থাকলে আবেদন যাচাইয়ের সময় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
দ্বিতীয় ধাপ: ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন
আবেদনপ্রক্রিয়ার পর সংশ্লিষ্ট ঋণ কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হয়।
প্রকাশিত নির্দেশিকায় সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও পূবালী ব্যাংকের নাম উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের কথাও বলা হয়েছে।
তবে সব প্রতিষ্ঠান একই ধরনের ঋণ বা সুবিধা দিচ্ছে কি না, তা আগে নিশ্চিত হতে হবে। সংশ্লিষ্ট ঋণ কার্যক্রমে বর্তমানে কোন ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে, সে বিষয়ে অর্থ বিভাগ অথবা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া ভালো।
ব্যাংক নির্বাচন করার আগে ঋণের শর্ত, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, সম্পত্তি যাচাই এবং কিস্তি পরিশোধের পদ্ধতি সম্পর্কে জেনে নেওয়া উচিত।
তৃতীয় ধাপ: যেসব কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে হবে
গৃহ নির্মাণ বা ফ্ল্যাট কেনার ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই আবেদন করার আগেই ব্যক্তিগত, চাকরি ও সম্পত্তিসংক্রান্ত নথি সংগ্রহ করে রাখা ভালো।
ব্যক্তিগত ও আবেদনসংক্রান্ত কাগজপত্র:
-
অনলাইন আবেদনের প্রিন্ট কপি
-
জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি
-
প্রয়োজনীয় ছবি
-
কর্তৃপক্ষ বা ব্যাংকের চাহিদা অনুযায়ী অন্যান্য নথি
চাকরি ও বেতনসংক্রান্ত কাগজপত্র:
-
চাকরি স্থায়ীকরণের আদেশ বা প্রযোজ্য প্রমাণপত্র
-
বর্তমান বেতন সনদ
-
সাম্প্রতিক বেতন বিবরণী বা পে-স্লিপ
-
চাকরিসংক্রান্ত অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি
আয়করসংক্রান্ত কাগজপত্র:
-
সর্বশেষ আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র বা প্রাপ্তিস্বীকারপত্র, যেখানে প্রযোজ্য
জমি বা বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে:
-
জমির মালিকানার দলিল
-
নামজারি বা মিউটেশনসংক্রান্ত কাগজপত্র
-
হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ
-
প্রয়োজন অনুযায়ী অনাপত্তিপত্র বা NOC
-
অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণ পরিকল্পনা
ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে:
-
ফ্ল্যাট ক্রয়ের চুক্তিপত্র
-
বরাদ্দপত্র
-
ভবনের অনুমোদিত নকশা বা পরিকল্পনার কপি
-
মালিকানা ও সম্পত্তিসংক্রান্ত অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি
এ তালিকা সাধারণ নির্দেশিকা হিসেবে দেওয়া হয়েছে। ঋণের ধরন ও ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী অতিরিক্ত কাগজপত্র প্রয়োজন হতে পারে।
চতুর্থ ধাপ: ব্যাংকে প্রয়োজনীয় নথি জমা
অনলাইনে আবেদন করার পর নির্বাচিত ব্যাংক বা শাখার নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল নথি দেখানো এবং সত্যায়িত অনুলিপি জমা দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
এ সময় ব্যাংক আবেদনকারীর দেওয়া তথ্যের সঙ্গে কাগজপত্র মিলিয়ে দেখে। চাকরির বিবরণ, বেতন, সম্পত্তির মালিকানা কিংবা ঋণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অসংগতি থাকলে অতিরিক্ত নথি বা ব্যাখ্যা চাওয়া হতে পারে।
তাই জমা দেওয়া প্রতিটি কাগজের একটি অনুলিপি নিজের কাছে রাখা উচিত। ব্যাংক থেকে কোনো গ্রহণপত্র বা রসিদ দেওয়া হলে সেটিও সংরক্ষণ করতে হবে।
পঞ্চম ধাপ: জমি বা ফ্ল্যাটের আইনগত যাচাই
ঋণ অনুমোদনের আগে ব্যাংক প্রস্তাবিত সম্পত্তির আইনগত বৈধতা যাচাই করতে পারে। এ ক্ষেত্রে জমি বা ফ্ল্যাটের দলিল, মালিকানার ধারাবাহিকতা, নামজারি, প্রয়োজনীয় নিবন্ধন এবং অনুমোদিত নকশাসহ সংশ্লিষ্ট নথি পরীক্ষা করা হয়।
সম্পত্তির কাগজপত্রে সমস্যা থাকলে ঋণ অনুমোদনে বিলম্ব হতে পারে। তাই জমি বা ফ্ল্যাট কেনার আগেই অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে দলিল ও মালিকানার বিষয়গুলো যাচাই করানো ভালো।
ব্যাংকের শর্ত পূরণ হলে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী সম্পত্তি বন্ধক বা মর্টগেজ নিবন্ধন এবং ঋণচুক্তি সম্পন্ন করতে হয়।
ষষ্ঠ ধাপ: ঋণ অনুমোদন ও অর্থ ছাড়
ব্যাংকের আর্থিক ও আইনগত যাচাই সম্পন্ন হওয়ার পর ঋণ অনুমোদনের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়। অনুমোদন পেলে ঋণচুক্তিতে নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী অর্থ ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়।
বাড়ি নির্মাণ এবং ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে অর্থ ছাড়ের পদ্ধতি এক রকম নাও হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে।
ঋণচুক্তিতে স্বাক্ষরের আগে ঋণের পরিমাণ, সুদের হার, মাসিক কিস্তি, পরিশোধের সময়সীমা এবং অন্যান্য শর্ত ভালোভাবে পড়ে নেওয়া জরুরি।
গৃহ নির্মাণ ঋণের সুদের হার ও মেয়াদ কত?
প্রচারিত কিছু নির্দেশিকায় ৯ শতাংশ সরল সুদ এবং সর্বোচ্চ ২০ বছর বা ২৪০ মাসে ঋণ পরিশোধের তথ্য উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব তথ্যকে সর্বশেষ কার্যকর সরকারি শর্ত হিসেবে ধরে নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা ও ব্যাংকের কাছ থেকে নিশ্চিত হতে হবে।
ঋণের সুদের হার, সরকারি সুদ ভর্তুকি, অনুমোদনযোগ্য ঋণের পরিমাণ এবং পরিশোধের মেয়াদ সংশ্লিষ্ট নীতিমালা ও পরবর্তী সংশোধনীর ওপর নির্ভর করতে পারে।
আবেদনের আগে ব্যাংক থেকে লিখিতভাবে জেনে নিন:
-
সর্বোচ্চ কত টাকা ঋণ পাওয়া যাবে
-
ঋণের সুদের হার কত
-
সরকারি সুদ ভর্তুকি প্রযোজ্য কি না এবং শর্ত কী
-
প্রতি মাসে কত টাকা কিস্তি দিতে হবে
-
কত বছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে হবে
-
আগাম ঋণ পরিশোধের সুযোগ ও শর্ত কী
এসব তথ্য পরিষ্কারভাবে জেনে ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ভবিষ্যতে আর্থিক চাপ এড়ানো সহজ হবে।
যেসব কারণে ঋণ অনুমোদনে দেরি হতে পারে
আবেদন করার সময় কিছু সাধারণ ভুলের কারণে ঋণপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে। যেমন:
১. অনলাইন আবেদনে ভুল তথ্য দেওয়া।
২. চাকরি ও বেতনসংক্রান্ত নথির সঙ্গে আবেদনের তথ্যের অমিল।
৩. জমি বা ফ্ল্যাটের দলিলে সমস্যা থাকা।
৪. ব্যাংকের চাহিদা অনুযায়ী কাগজপত্র জমা দিতে দেরি করা।
৫. সম্পত্তির আইনগত যাচাই ও মর্টগেজ নিবন্ধনে জটিলতা তৈরি হওয়া।
এসব সমস্যা এড়াতে আবেদন করার আগেই প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করুন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন।
আবেদনকারীদের জন্য জরুরি পরামর্শ
সরকারি গৃহ নির্মাণ বা ফ্ল্যাট ক্রয়ের ঋণ নেওয়ার আগে নিজের আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। মাসিক বেতন থেকে কিস্তি দেওয়ার পর সংসারের অন্যান্য খরচ চালানো সম্ভব হবে কি না, সেটিও হিসাব করে দেখতে হবে।
এ ছাড়া ঋণ অনুমোদনের নামে কোনো দালাল বা অননুমোদিত ব্যক্তিকে টাকা দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। আবেদন ও অনুমোদনের বিষয়ে সরাসরি সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর এবং ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্যের ওপর নির্ভর না করে অর্থ বিভাগের সর্বশেষ নীতিমালা ও সংশোধনী অনুসরণ করা।
সরকারি গৃহ নির্মাণ ঋণের তথ্য ও আবেদনসংক্রান্ত লিংক
গৃহ নির্মাণ ঋণের নীতিমালা, ঋণ মঞ্জুরের প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় ফরম সম্পর্কে জানতে অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইটের সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠাগুলো দেখতে পারেন।
-
গৃহ নির্মাণ ঋণের নীতিমালা: https://mof.gov.bd/pages/static-pages/694032b935ce18e1c05613f8
-
ঋণ মঞ্জুরের প্রক্রিয়া: https://mof.gov.bd/pages/static-pages/694032be35ce18e1c0561a60
-
প্রয়োজনীয় ফরম: https://mof.gov.bd/pages/static-pages/694032b035ce18e1c05609b0
আবেদন করার আগে এসব পৃষ্ঠায় প্রকাশিত সর্বশেষ নির্দেশনা, সংশোধনী এবং প্রযোজ্য শর্ত যাচাই করে নিন।
সোহাগ/
