৮ কোটির বেশি খতিয়ান অনলাইনে, ঘরে বসেই মিলবে জমির তথ্য
নিজস্ব প্রতিবেদক: জমির খতিয়ান সংগ্রহ, মালিকানার তথ্য যাচাই কিংবা নামজারির জন্য ভূমি অফিসে বারবার যাওয়ার ঝামেলা কমাতে ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ করছে সরকার। এরই মধ্যে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল রেকর্ড ব্যবস্থায় ৮ কোটির বেশি খতিয়ান বা পর্চা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ফলে জমির রেকর্ড খোঁজা ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল রেকর্ড রুমের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন জরিপের খতিয়ান এবং ই-নামজারির মাধ্যমে তৈরি ও হালনাগাদ হওয়া রেকর্ড মিলিয়ে ডিজিটাল ডাটাবেজে এই সংখ্যা ৮ কোটি ছাড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, পর্যায়ক্রমে সব খতিয়ান অনলাইনে যুক্ত করা সম্ভব হলে জমির রেকর্ড সংগ্রহে ভোগান্তি কমবে। পাশাপাশি জমির মালিকানা যাচাই, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির তথ্য খোঁজা এবং জমি কেনাবেচার আগে প্রয়োজনীয় রেকর্ড পরীক্ষা করাও সহজ হবে।
৮ কোটির বেশি খতিয়ানের মধ্যে রয়েছে যেসব রেকর্ড
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ব্যবস্থায় বিভিন্ন সময়ের জরিপের খতিয়ান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস জরিপের রেকর্ড রয়েছে। পাশাপাশি ই-নামজারির মাধ্যমে তৈরি ও হালনাগাদ হওয়া খতিয়ানও এই ব্যবস্থার অংশ।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, অনলাইন সার্ভে খতিয়ানের ডাটাবেজে প্রায় ৫ কোটি ১২ লাখ থেকে ৫ কোটি ১৩ লাখ খতিয়ান রয়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ৫ কোটি ১২ লাখ খতিয়ান অনলাইনে উন্মুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ই-নামজারি ও অন্যান্য ডিজিটাল ভূমিসেবা সম্প্রসারণের সঙ্গে রেকর্ডের সংখ্যা আরও বেড়েছে।
ঘরে বসে যেসব ভূমিসেবা পাওয়া সহজ হচ্ছে
ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনার কারণে জমির মালিকদের জন্য বেশ কিছু কাজ আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। বিশেষ করে অনলাইনে তথ্য অনুসন্ধান এবং নির্ধারিত নিয়মে খতিয়ানের কপি পাওয়ার আবেদন করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এর মাধ্যমে নাগরিকেরা যেসব সুবিধা পেতে পারেন:
-
নিজের জমির খতিয়ান ও রেকর্ডের তথ্য অনুসন্ধান।
-
জমির দাগ নম্বর ও রেকর্ডভুক্ত মালিকের তথ্য যাচাই।
-
প্রয়োজন অনুযায়ী সার্টিফায়েড খতিয়ানের কপির আবেদন।
-
নামজারি আবেদনের প্রক্রিয়া ও অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্য পাওয়া।
-
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির পুরোনো রেকর্ড খুঁজে বের করা।
-
জমি কেনার আগে প্রাথমিকভাবে রেকর্ডের তথ্য যাচাই।
তবে অনলাইনে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জমির চূড়ান্ত মালিকানা নিশ্চিত ধরে নেওয়া যাবে না। জমি কেনাবেচার আগে দলিল, খতিয়ান, দাগ, নামজারি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করা জরুরি।
৫১৬টি উপজেলা ও সার্কেল ভূমি অফিসে ই-নামজারি
দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় ই-নামজারিও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৫১৬টি উপজেলা ও সার্কেল ভূমি অফিস এবং ৩ হাজার ৪৬৭টি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ই-নামজারি কার্যক্রম চালু রয়েছে।
এই ব্যবস্থায় প্রতি মাসে অনলাইনে প্রায় ৫ লাখ নামজারি মামলা নিষ্পত্তি করা হচ্ছে।
নামজারি হলো জমির মালিকানা পরিবর্তনের পর সরকারি ভূমি রেকর্ডে নতুন মালিকের তথ্য হালনাগাদ করার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। জমি কেনা, উত্তরাধিকার, দান বা অন্য কোনো বৈধ উপায়ে মালিকানা পরিবর্তনের পর প্রযোজ্য নিয়মে নামজারি করতে হয়।
অনলাইন ব্যবস্থার ফলে আবেদন জমা দেওয়া, প্রয়োজনীয় নথি যাচাই এবং আবেদনের অগ্রগতি জানার ক্ষেত্রে নাগরিকদের সুবিধা বেড়েছে।
ভূমি উন্নয়ন কর ও ই-পর্চায়ও বাড়ছে ডিজিটাল সেবা
খতিয়ান ও নামজারির পাশাপাশি ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ এবং ই-পর্চা সেবাও ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় এসেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ৫ কোটি ৭০ লাখ হোল্ডিংয়ের তথ্য ম্যানুয়াল পদ্ধতি থেকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় রূপান্তর করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ অনলাইন দাখিলা দেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত ই-পর্চা সেবার মাধ্যমে সরকারের কোষাগারে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা জমা হয়েছে।
ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ ও খতিয়ানের আবেদন করার সুযোগ বাড়ায় নাগরিকদের ভূমি অফিসে সরাসরি যাওয়ার প্রয়োজনও অনেক ক্ষেত্রে কমেছে।
সব খতিয়ান অনলাইনে আনার নতুন উদ্যোগ
দেশের সব খতিয়ান সরকারি ব্যবস্থায় অনলাইনে যুক্ত করার লক্ষ্যে ডাটা এন্ট্রি কার্যক্রম হাতে নিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। প্রকল্প পরিচালক পারভেজ হাসান জানান, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহায়তায় ইতোমধ্যে ১১টি উপজেলায় পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে সারা দেশে এই কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য একটি ক্রয় প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। অনুমোদন এবং দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হলে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পুরোনো কাগজের খতিয়ানসহ বিভিন্ন ভূমি রেকর্ড পর্যায়ক্রমে ডিজিটাল ডাটাবেজে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।
জমি কেনার আগে তথ্য যাচাই সহজ হবে যেভাবে
জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে খতিয়ান ও মালিকানার তথ্য যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় পুরোনো রেকর্ড খুঁজে পেতে জমির ক্রেতা বা মালিককে একাধিক দপ্তরে যেতে হয়।
ডিজিটাল ডাটাবেজে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া গেলে জমির দাগ নম্বর, রেকর্ডভুক্ত মালিকের নাম এবং জমির পরিমাণ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নেওয়া সহজ হবে।
একইভাবে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির পুরোনো রেকর্ড খুঁজে বের করা, দলিলের সঙ্গে খতিয়ানের তথ্য মিলিয়ে দেখা এবং নামজারির প্রস্তুতি নেওয়ার কাজও সহজ হতে পারে।
বিদেশে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্যও এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। দেশে না থেকেও অনলাইনে জমির তথ্য অনুসন্ধানের সুযোগ থাকলে জমিসংক্রান্ত প্রাথমিক কাজের জন্য অন্যের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে।
ভবিষ্যতে ড্রোনে ভূমি জরিপের পরিকল্পনা
ডিজিটাল ভূমিসেবার পাশাপাশি ভূমি জরিপে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। ভবিষ্যতে ড্রোন ব্যবহার করে ভূমি জরিপের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের সময় কমানো এবং নির্ভুলতা বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
এ ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে জমিসংক্রান্ত তথ্য অনুসন্ধানের সুযোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ভূমি অফিসের অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে সারা দেশে ১ হাজার ৩৩০টি ইউনিয়ন ভূমি অফিস এবং ১৫০টি সমন্বিত উপজেলা ভূমি কমপ্লেক্স নির্মাণের লক্ষ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল খতিয়ানে ভুল থাকলে কী হবে?
ডিজিটাল ভূমিসেবার পরিধি বাড়লেও তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। কোনো খতিয়ানে ভুল তথ্য থাকলে কিংবা পুরোনো রেকর্ড অনলাইনে খুঁজে পাওয়া না গেলে নাগরিকদের জন্য কার্যকর সংশোধন ও অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা প্রয়োজন।
এ ছাড়া ওয়েবসাইট ও সার্ভারের কার্যক্রম সচল রাখা, তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পুরোনো কাগজের নথি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করাও জরুরি।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. এমদাদুল হক চৌধুরী জানান, ভূমিসেবাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করতে ডিজিটাল কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে সব খতিয়ান অনলাইনে আনা সম্ভব হলে নাগরিকেরা ঘরে বসেই জমির রেকর্ড সংগ্রহ ও প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করতে পারবেন।
তিনি আরও জানান, ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনায় তথ্যের নির্ভুলতা, নিয়মিত হালনাগাদ, নিরাপত্তা এবং নাগরিকদের সহজে সেবা পাওয়ার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে ডিজিটাল ডাটাবেজে ৮ কোটির বেশি খতিয়ান অন্তর্ভুক্ত হওয়া দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে সব খতিয়ান অনলাইনে সহজলভ্য করা এবং ভুল তথ্য সংশোধনের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে সাধারণ মানুষ এই ডিজিটাল সেবার পূর্ণ সুফল পাবেন।
সোহাগ/
