নামজারি আবেদনের কাগজপত্রে নামের বানান আলাদা হলে করণীয় কী
নিজস্ব প্রতিবেদক: জমি কেনা, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কিংবা অন্য কোনোভাবে মালিকানা অর্জনের পর নামজারি করতে গিয়ে অনেকেই একটি সমস্যায় পড়েন। জমির দলিল, খতিয়ান, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) কিংবা অন্যান্য কাগজপত্রে নামের বানানে পার্থক্য দেখা যায়। কোথাও নামের একটি অক্ষর আলাদা, কোথাও আবার পুরো নামের লেখায় কিছুটা ভিন্নতা থাকে। এ ধরনের অসংগতি দেখে অনেকেই মনে করেন, নামজারির আবেদন হয়তো বাতিল হয়ে যাবে।
তবে কাগজপত্রে নামের বানান আলাদা থাকলেই নামজারির আবেদন বাতিল করার নিয়ম নেই। এ ক্ষেত্রে জমির মালিকানা ও ব্যক্তির পরিচয় যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি সংক্রান্ত নির্দেশনাতেও বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।
দলিল ও এনআইডিতে নাম আলাদা হলে কী হবে?
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ১৮ জুলাই ২০২২ তারিখের ই-নামজারি সংক্রান্ত পরিপত্রে বলা হয়েছে, দলিলে উল্লেখিত নামের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের নামের পার্থক্য থাকলেই নামজারির আবেদন বাতিল করা যাবে না।
বিশেষ করে দলিলে বর্ণিত দাতা বা গ্রহীতার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর এবং নামজারি আবেদনে উল্লেখ করা জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর একই হলে শুধু নামের পার্থক্যের কারণে আবেদন নামঞ্জুর করা যাবে না।
তবে নামের ভিন্নতা থাকলে আবেদনকারীর পরিচয় ও মালিকানার পক্ষে অতিরিক্ত প্রমাণপত্র চাওয়া যেতে পারে। যেমন পাসপোর্টের কপি, জন্মনিবন্ধন সনদ, বিভিন্ন ইউটিলিটি বিলের সত্যায়িত অনুলিপি অথবা অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য পরিচয়সংক্রান্ত নথি।
নামের বানান আলাদা হলে যেসব কাগজপত্র কাজে আসতে পারে
নামের বানান বা পরিচয়সংক্রান্ত অসংগতি থাকলে পরিস্থিতি অনুযায়ী নিচের কাগজপত্রগুলো প্রস্তুত রাখা যেতে পারে।
১. জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি।
২. জমির মূল দলিল বা সংশ্লিষ্ট দলিলের কপি।
৩. সংশ্লিষ্ট খতিয়ানের কপি।
৪. জন্মনিবন্ধন সনদ।
৫. শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, বিশেষ করে এসএসসি বা সমমানের সনদ।
৬. পাসপোর্টের কপি, যদি থাকে।
৭. প্রয়োজন অনুযায়ী পিতা-মাতা বা স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়সংক্রান্ত প্রমাণপত্র।
৮. নামের পার্থক্য ব্যাখ্যা করার জন্য অন্যান্য গ্রহণযোগ্য সহায়ক নথি।
মনে রাখতে হবে, সব ক্ষেত্রে এই কাগজপত্র একসঙ্গে জমা দিতে হবে এমন নয়। আবেদনের ধরন, নামের পার্থক্য এবং সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের যাচাই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র নির্ধারিত হতে পারে।
নামের বানান ভুল থাকলে কীভাবে সমাধান করবেন?
প্রথমে নিজের সব কাগজপত্র ভালোভাবে মিলিয়ে দেখতে হবে। দলিল, খতিয়ান, এনআইডি ও জন্মনিবন্ধনে কোথায় কী ধরনের পার্থক্য রয়েছে, তা চিহ্নিত করা জরুরি।
যদি এনআইডিতে নামের বানান ভুল থাকে, তাহলে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র দিয়ে সংশোধনের আবেদন করা যেতে পারে। অন্যদিকে দলিল বা খতিয়ানে করণিক ভুল থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে যথাযথ সংশোধনের আবেদন করতে হবে।
নামের পার্থক্য থাকলেও যদি সব নথি থেকে একই ব্যক্তির পরিচয় এবং জমির মালিকানার ধারাবাহিকতা প্রমাণ করা যায়, তাহলে সেই প্রমাণপত্র ই-নামজারি আবেদনের সঙ্গে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।
কাগজপত্রের ঘাটতি থাকলে কি আবেদন বাতিল হবে?
ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, নামজারি আবেদনে কোনো তথ্য বা কাগজপত্রের ঘাটতি থাকলে প্রথম আদেশেই আবেদন বাতিল না করে ঘাটতির বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে সাধারণভাবে সাত কার্যদিবস অথবা আবেদন বিবেচনায় যুক্তিসংগত সময় দিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা না দিলে আবেদন নামঞ্জুর হতে পারে। তবে পরবর্তী সময়ে চাওয়া তথ্য বা দলিলপত্র পাওয়া গেলে আগের নামঞ্জুর করা আবেদনেই পুনরায় নামজারি কার্যক্রম চালু করার সুযোগ রয়েছে। এ জন্য নতুন করে আবেদন করার প্রয়োজন নেই।
আবেদনকারীর করণীয় কী?
নামজারির আবেদন করার আগে সব কাগজপত্রের নাম, পিতার নাম, এনআইডি নম্বর এবং জমির মালিকানাসংক্রান্ত তথ্য মিলিয়ে নেওয়া উচিত। কোনো অসংগতি থাকলে তা গোপন না করে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা ও সহায়ক প্রমাণপত্র জমা দিতে হবে।
এ ছাড়া ভূমি অফিস থেকে অতিরিক্ত কোনো কাগজপত্র চাওয়া হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা জমা দিতে হবে। আবেদন নামঞ্জুর হলে আদেশে উল্লেখ করা কারণ ভালোভাবে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, নামের বানানে সামান্য পার্থক্য থাকলেই জমির মালিকানা বাতিল হয়ে যায় না কিংবা নামজারির আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার কথা নয়। তবে আবেদনকারীর পরিচয় এবং জমির মালিকানার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নথির মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। জটিলতা থাকলে সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে যোগাযোগ করে করণীয় জেনে নেওয়াই ভালো।
সোহাগ/
