নামজারি আবেদনের জন্য কাগজপত্র প্রস্তুত করবেন যেভাবে
নিজস্ব প্রতিবেদক: জমি কেনার পর কিংবা উত্তরাধিকার সূত্রে জমির মালিক হলে নিজের নামে সরকারি রেকর্ড হালনাগাদ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য করতে হয় নামজারি বা মিউটেশন। বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনলাইন ব্যবস্থায় ঘরে বসেই নামজারির আবেদন করা যায়। তবে আবেদন করার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিকভাবে প্রস্তুত না রাখলে তথ্যের ভুল, নথির ঘাটতি কিংবা জমির বিবরণে অসংগতির কারণে প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ হতে পারে।
অনেকেই জানেন না, নামজারির আবেদনে কোন কোন কাগজপত্র প্রয়োজন এবং সেগুলো কীভাবে প্রস্তুত করতে হবে। জমি কেনা, ওয়ারিশ, হেবা, আদালতের রায় কিংবা অন্য কোনো সূত্রে মালিকানা অর্জনের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নথিতে পার্থক্য থাকতে পারে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-মিউটেশন ব্যবহার নির্দেশিকা অনুযায়ী, আবেদন করার আগে জমির তথ্য, মালিকানার প্রমাণ এবং আবেদনকারীর পরিচয়সংক্রান্ত কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা উচিত।
নামজারি আবেদনের আগে যেসব তথ্য প্রস্তুত করবেন
অনলাইনে আবেদন করার সময় জমির বিভিন্ন তথ্য দিতে হয়। তাই আগে থেকেই নিচের বিষয়গুলো সংগ্রহ করে রাখা ভালো।
১. জমির বিভাগ, জেলা ও উপজেলা।
২. সংশ্লিষ্ট মৌজার নাম ও জে.এল নম্বর।
৩. সর্বশেষ প্রযোজ্য খতিয়ানের নম্বর।
৪. জমির দাগ নম্বর।
৫. মোট জমির পরিমাণ এবং আবেদনকারীর প্রাপ্য জমির পরিমাণ।
৬. রেকর্ডীয় মালিকের নাম, পিতা বা স্বামীর নাম ও ঠিকানা।
৭. জমি কী সূত্রে পাওয়া হয়েছে, যেমন ক্রয়, উত্তরাধিকার, হেবা বা আদালতের রায়।
৮. দলিল নম্বর, দলিলের তারিখ ও সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নাম, যদি প্রযোজ্য হয়।
এসব তথ্য দলিল ও খতিয়ানের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে। বিশেষ করে দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর এবং জমির পরিমাণে ভুল থাকলে আবেদন নিষ্পত্তিতে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
ক্রয়সূত্রে নামজারি করতে যেসব কাগজপত্র লাগবে
জমি রেজিস্ট্রি করে কেনার পর নামজারি করতে চাইলে সাধারণত নিচের নথিগুলো প্রস্তুত রাখতে হবে।
-
রেজিস্ট্রিকৃত ক্রয় দলিলের স্ক্যান কপি।
-
সর্বশেষ খতিয়ানের কপি।
-
আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি।
-
আবেদনকারীর পাসপোর্ট সাইজ ছবি ও স্বাক্ষর।
-
সর্বশেষ ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা।
-
প্রয়োজন অনুযায়ী পূর্ববর্তী মালিকানার দলিল বা অন্যান্য সহায়ক কাগজপত্র।
দলিলের তথ্য, জমির দাগ ও খতিয়ানের বিবরণ ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। একাধিক দলিলের মাধ্যমে জমির মালিকানা অর্জিত হলে সংশ্লিষ্ট দলিলগুলোর তথ্যও প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন হতে পারে।
ওয়ারিশসূত্রে নামজারি করতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
কোনো ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর তাঁর উত্তরাধিকারীরা জমির মালিক হলে নামজারির জন্য উত্তরাধিকারসংক্রান্ত প্রমাণপত্র প্রয়োজন হয়।
এ ক্ষেত্রে সাধারণত প্রস্তুত রাখতে হবে:
-
মৃত ব্যক্তির সর্বশেষ খতিয়ানের কপি।
-
ওয়ারিশ সনদ।
-
আবেদনকারীদের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি।
-
আবেদনকারীদের ছবি ও স্বাক্ষর।
-
সর্বশেষ ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা।
-
প্রয়োজন অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির মৃত্যুসনদ।
-
বণ্টন হয়ে থাকলে নিবন্ধিত বণ্টননামা বা সংশ্লিষ্ট আইনগত দলিল।
ওয়ারিশদের মধ্যে জমি বণ্টন না হয়ে থাকলে উত্তরাধিকারীদের অংশ অনুযায়ী যৌথ নামজারির বিষয়টি বিবেচনায় আসে। আর আইনসম্মতভাবে জমি ভাগ করা থাকলে প্রাসঙ্গিক বণ্টন দলিলের ভিত্তিতে পৃথক নামজারির আবেদন করা যেতে পারে।
হেবা, দান বা আদালতের রায়ের মাধ্যমে জমি পেলে
জমির মালিকানা হস্তান্তরের সূত্র অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দলিল বা আদেশের কপি প্রস্তুত রাখতে হবে।
হেবা বা দানসূত্রে জমি পেলে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধিত দলিলের কপি প্রয়োজন হতে পারে। আদালতের রায় বা ডিক্রির মাধ্যমে মালিকানা অর্জিত হলে রায় বা ডিক্রির কপি এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাগজপত্র সংযুক্ত করতে হবে।
অর্থাৎ সব ধরনের নামজারির জন্য একই কাগজপত্র প্রয়োজন হয় না। জমি যেভাবে অর্জিত হয়েছে, সেই অনুযায়ী মালিকানার প্রমাণ জমা দিতে হবে।
অনলাইনে কাগজপত্র আপলোড করার নিয়ম
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করার পর সেগুলো পরিষ্কারভাবে স্ক্যান করে নির্ধারিত ফরম্যাটে সংরক্ষণ করতে হবে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ব্যবহার নির্দেশিকা অনুযায়ী, আবেদনকারীর ছবি, স্বাক্ষর ও পরিচয়সংক্রান্ত নথি JPG বা PNG ফরম্যাটে এবং জমির দলিল, খতিয়ান, ওয়ারিশ সনদসহ প্রয়োজনীয় দলিলপত্র PDF ফরম্যাটে প্রস্তুত করতে বলা হয়েছে।
নথি আপলোডের সময় কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে:
-
প্রতিটি কাগজের লেখা যেন স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
-
দলিলের সব প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠা স্ক্যান করতে হবে।
-
ভুল বা অসম্পূর্ণ নথি আপলোড করা যাবে না।
-
প্রতিটি নথি সঠিক ক্যাটাগরিতে সংযুক্ত করতে হবে।
-
আপলোডের আগে ফাইলের আকার ও ফরম্যাট পোর্টালের নির্ধারিত সীমার মধ্যে আছে কি না যাচাই করতে হবে।
নামজারি আবেদনের সরকারি ফি কত?
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি ভূমিসেবার ফি তালিকা অনুযায়ী, মিউটেশন আবেদনের জন্য নির্ধারিত ফি হলো:
-
কোর্ট ফি: ২০ টাকা।
-
নোটিশ জারি ফি: ৫০ টাকা।
-
আবেদন পর্যায়ে মোট: ৭০ টাকা।
-
নামজারি অনুমোদনের পর ডিসিআর ফি: ১ হাজার ১০০ টাকা।
অর্থাৎ আবেদন জমা দেওয়ার সময় ৭০ টাকা এবং নামজারি অনুমোদনের পর নির্ধারিত পর্যায়ে আরও ১ হাজার ১০০ টাকা দিতে হয়। ফি অনলাইনে নির্ধারিত পেমেন্ট পদ্ধতিতে পরিশোধ করতে হয়।
নামজারি আবেদন করার আগে যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন
নামজারি আবেদন করার সময় সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে জমির তথ্য ও মালিকানার প্রমাণের ক্ষেত্রে। আবেদন করার আগে দলিলের সঙ্গে খতিয়ানের তথ্য মিলিয়ে নিন। জমির দাগ নম্বর, পরিমাণ, মৌজার নাম এবং আবেদনকারীর পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য ঠিক আছে কি না যাচাই করুন।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারি ই-মিউটেশন নির্দেশিকা অনুযায়ী একটি আবেদনে একটি মৌজার জমি অন্তর্ভুক্ত করা যায়। জমি একাধিক মৌজায় থাকলে পৃথক আবেদন করতে হবে।
আবেদনে কোনো কাগজপত্রের ঘাটতি থাকলে সব ক্ষেত্রে সঙ্গে সঙ্গে আবেদন বাতিল করার কথা নয়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ১৭ জুলাই ২০২২ তারিখের পরিপত্র অনুযায়ী, প্রথম আদেশে ঘাটতি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে সাধারণত সাত কার্যদিবস অথবা যুক্তিসংগত সময় দিয়ে প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
তাই নামজারির আবেদন করার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে রাখা, প্রতিটি তথ্য যাচাই করা এবং সঠিকভাবে অনলাইনে সংযুক্ত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এতে আবেদন প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমানো সম্ভব।
সোহাগ/
