একই দাগে খাসজমি থাকলেও হবে ব্যক্তিমালিকানার জমির নামজারি, নতুন নির্দেশনা
নিজস্ব প্রতিবেদক: আপনার কেনা বা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির দাগে কিছু অংশ সরকারি খাসজমি রয়েছে? এ কারণে কি বছরের পর বছর নামজারি করতে পারছেন না? ভূমি অফিসে গেলে বলা হচ্ছে, একই দাগে সরকারি জমি থাকায় ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশের নামজারিও করা সম্ভব নয়? এমন সমস্যায় থাকা জমির মালিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, একই দাগে সরকারি খাসজমি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি থাকলেও সীমানা নির্ধারণ করে ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশের নামজারি করা যাবে। পাশাপাশি ওই অংশের ভূমি উন্নয়ন করও আদায় করতে হবে।
ভূমি মন্ত্রণালয় ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এ বিষয়ে একটি পরিপত্র জারি করেছে। পরিপত্রে সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির সীমানা পৃথক করে নামজারি এবং ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
একই দাগে খাসজমি থাকলে এতদিন কী সমস্যা হতো?
জমির কাগজপত্রে দাগ বলতে নির্দিষ্ট একটি জমির খণ্ডকে বোঝায়। অনেক ক্ষেত্রে একই দাগের একাংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন হলেও অন্য অংশ সরকারি খাসজমি হিসেবে রেকর্ডভুক্ত থাকে।
এমন পরিস্থিতিতে অনেক জমির মালিক নামজারি করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভূমি অফিস থেকে পুরো দাগে সরকারি জমি থাকার কথা জানিয়ে ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশের নামজারির আবেদনও গ্রহণ বা অনুমোদন করা হতো না।
এমনকি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করতেও জটিলতা তৈরি হতো। ফলে বৈধ দলিল থাকার পরও জমির রেকর্ড হালনাগাদ করতে পারতেন না অনেক মালিক।
এই সমস্যা সমাধানেই নতুন নির্দেশনা দিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়।
নতুন পরিপত্রে নামজারি নিয়ে কী নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে?
ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, একই দাগে সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি থাকলে প্রথমে দুই অংশের সীমানা নির্ধারণ করতে হবে। এরপর যাচাই-বাছাই করে ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশের নামজারির ব্যবস্থা নিতে হবে।
নতুন পরিপত্রের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাগুলো হলো:
১. সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির সীমানা নির্ধারণ
একই দাগে সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি থাকলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) দুই অংশের সীমানা নির্ধারণের ব্যবস্থা করবেন। এ কাজে জরিপকারীর সহায়তা নেওয়া হবে।
এ সময় হালনাগাদ রেকর্ড, দাগসূচি, মৌজা নকশা, জমির মালিকানার ধারাবাহিকতা এবং সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র যাচাই করতে হবে। প্রয়োজনে সরেজমিনে জমি পরিদর্শন করে সীমানা চিহ্নিত করতে হবে।
২. শুধু খাসজমি থাকার কারণে নামজারি বাতিল নয়
কোনো দাগের একাংশ সরকারি জমি বলে পুরো নামজারির আবেদন বাতিল করা যাবে না। সরকারি অংশ আলাদা করে চিহ্নিত করার পর ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশের নামজারি অনুমোদনের ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. সরকারি জমি ব্যক্তির নামে করা যাবে না
নতুন নির্দেশনায় সরকারি জমির মালিকানা সুরক্ষার বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছে। সরকারি বা খাসজমি কোনোভাবেই ব্যক্তির নামে নামজারি করা যাবে না।
শুধু যাচাইয়ে বৈধ বলে প্রমাণিত ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশের নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন কর আদায় করা যাবে।
৪. একই নামজারি নথিতে সীমানা পৃথক করার ব্যবস্থা
নামজারির আবেদন নিষ্পত্তি করতে গিয়ে সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির সীমানা আলাদা করার প্রয়োজন হলে একই নামজারি নথিতে এ কাজ সম্পন্ন করতে হবে। এ জন্য নতুন করে আলাদা নথি খোলার প্রয়োজন হবে না।
তবে নামজারির আবেদন ছাড়াই কেউ শুধু সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির সীমানা পৃথক করার আবেদন করলে আলাদা নথি খুলতে হবে।
৫. ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়া যাবে
যাচাই করে ব্যক্তিমালিকানাধীন হিসেবে নির্ধারিত জমির ভূমি উন্নয়ন কর নিয়মিত আদায় করতে হবে। ফলে জমির মালিক কর পরিশোধ করে দাখিলা সংগ্রহ করতে পারবেন।
৬. অনলাইন নামজারি ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হবে
নতুন নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য ই-নামজারি ও অনলাইন ভূমিসেবার সফটওয়্যারে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার কথাও বলা হয়েছে।
পরিপত্রটি জনস্বার্থে জারি করা হয়েছে এবং অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যাদের নামজারি আটকে আছে, তারা এখন কী করবেন?
আপনার জমির দাগে খাসজমি থাকার কারণে নামজারি আটকে থাকলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভূমি অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন। প্রয়োজনে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর আবেদন করতে পারবেন।
আবেদনের সময় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা ভালো।
- জমির মূল বা সংশ্লিষ্ট ক্রয় দলিলের কপি।
- আগের মালিকের মালিকানাসংক্রান্ত দলিল।
- সংশ্লিষ্ট খতিয়ান ও দাগের তথ্য।
- মৌজা নকশা বা জমির অবস্থানসংক্রান্ত কাগজপত্র।
- আগের ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা, যদি থাকে।
- উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র।
জমির সীমানা নির্ধারণের জন্য সরেজমিনে জরিপ করা হলে সেখানে উপস্থিত থেকে নিজের জমির অবস্থান ও সীমানা দেখিয়ে দেওয়া উচিত।
নামজারি হলে জমির মালিকদের কী সুবিধা হবে?
নতুন নির্দেশনার ফলে একই দাগে খাসজমি থাকার কারণে ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশের নামজারি আটকে যাওয়ার সমস্যা কমতে পারে।
যেসব জমির মালিকের মালিকানা যাচাই করে নামজারি সম্পন্ন হবে, তারা জমির রেকর্ড হালনাগাদ করার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করে দাখিলা সংগ্রহ করতে পারবেন।
এর ফলে জমি বিক্রি, হস্তান্তর, ব্যাংকঋণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত এবং উত্তরাধিকারীদের মধ্যে জমির হিসাব ও বণ্টনসংক্রান্ত কাজ সহজ হতে পারে।
অন্যদিকে, সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির সীমানা আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হলে সরকারি খাসজমি সুরক্ষিত রাখাও সহজ হবে।
জমির মালিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
নতুন পরিপত্রের অর্থ এই নয় যে একই দাগে জমি থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নামজারি হয়ে যাবে। আবেদনকারীর মালিকানার বৈধতা, দলিলের ধারাবাহিকতা, খতিয়ান, মৌজা নকশা এবং সরেজমিন জরিপের মাধ্যমে জমির প্রকৃত সীমানা যাচাই করা হবে।
তাই জমির মালিকদের উচিত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে সরাসরি ইউনিয়ন ভূমি অফিস অথবা উপজেলা ভূমি অফিসে যোগাযোগ করা। কোনো দালালের মাধ্যমে কাজ করানোর পরিবর্তে সরকারি নিয়মে আবেদন ও সেবা গ্রহণ করা ভালো।
একই দাগে সরকারি খাসজমি থাকার কারণে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির নামজারি আটকে যাওয়ার সমস্যা অনেক জমির মালিকের জন্য দীর্ঘদিনের ভোগান্তি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের নতুন পরিপত্রে এই সমস্যার সমাধানে আলাদা সীমানা নির্ধারণ করে ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশের নামজারির পথ দেখানো হয়েছে।
তবে মনে রাখতে হবে, সরকারি জমি সরকারেরই থাকবে। কেবল যাচাই-বাছাইয়ে বৈধ প্রমাণিত ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশের নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের সুযোগ থাকবে।
