পে-স্কেল ২০২৬: চুক্তিভিত্তিক সরকারি চাকরির বেতনে ৮ সিদ্ধান্ত
নিজস্ব প্রতিবেদক: চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। ২৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত এ প্রজ্ঞাপনে বিদ্যমান চুক্তিভিত্তিক কর্মী এবং ভবিষ্যতে চুক্তিতে নিয়োগ পেতে পারেন—এমন ব্যক্তিদের বেতন নির্ধারণ ও অন্যান্য সুবিধার বিষয়ে আটটি সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছে।
সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ প্রজাতন্ত্রের বিভিন্ন অসামরিক পদে জনস্বার্থে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে এসব নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে। প্রজ্ঞাপনে চুক্তির শর্ত সংশোধন, বেতন নির্ধারণের ভিত্তি, পেনশন, ইনক্রিমেন্ট এবং আগের নির্দেশনার কার্যকারিতা সম্পর্কেও বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এটি সব সরকারি কর্মচারীর বেতন নিয়ে সাধারণ নির্দেশনা নয়। প্রজ্ঞাপনটির মূল বিষয় হলো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা নির্ধারণ।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে অর্থ বিভাগের ৮ সিদ্ধান্ত
১. আগে থেকে চুক্তিতে থাকা কর্মীদের বেতন পুনর্নির্ধারণ
জাতীয় বেতনস্কেল ২০১৫-এর আওতায় বিভিন্ন গ্রেডে চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত যেসব কর্মচারীর চুক্তির মেয়াদ ১ জুলাই ২০২৬-এর পরও বহাল রয়েছে, তাঁদের বেতন নতুন বেতনস্কেল অনুযায়ী নির্ধারণের বিধান রাখা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি সংশোধন করতে হবে। প্রজ্ঞাপনে বর্ণিত নিয়ম অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট গ্রেড ও ধাপে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে বেতন নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
বেতন-ভাতার ক্ষেত্রে চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬-এর নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদের বিধান এবং চুক্তিতে প্রযোজ্য ভাতার শর্ত বিবেচনায় নিতে হবে। বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির অংশটি এই নির্দেশনায় উল্লিখিত সুবিধার বাইরে রাখা হয়েছে।
২. নতুন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে বেতন নির্ধারণের নিয়ম
১ জুলাই ২০২৬-এর পরে চুক্তিভিত্তিক পদে নিয়োগ পাওয়া বা ভবিষ্যতে নিয়োগ পেতে যাওয়া ব্যক্তিদের বেতন নির্ধারণের জন্যও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে অবসর গ্রহণের অব্যবহিত আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যে জাতীয় বেতনস্কেলের গ্রেড ও ধাপে মূল বেতন পেতেন, ২০২৬ সালের বেতনস্কেলে তার অনুরূপ গ্রেড ও ধাপ বিবেচনায় নিয়ে চুক্তিভিত্তিক পদের বেতন নির্ধারণ করা হবে—প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিদ্যমান চুক্তি সংশোধন সাপেক্ষে।
তবে বিশেষ ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত বেতন অথবা উভয় পক্ষের সম্মতিতে সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিতে নির্ধারিত বেতন প্রযোজ্য হতে পারে। ফলে সব চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে একই অঙ্কের বেতন হবে, এমনটি বলা যায় না।
৩. চুক্তিভিত্তিক বেতন থেকে পেনশন বাদ দেওয়ার বিষয়ে নির্দেশনা
প্রজ্ঞাপনে চুক্তিভিত্তিক নির্ধারিত বেতন থেকে নির্ধারিত গ্রস পেনশন—কম্যুটেশন বা সমর্পণের আগের অঙ্ক—এবং বিশেষ অতিরিক্ত পেনশন থাকলে তা বাদ না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ, এই বিষয়ে প্রজ্ঞাপনে নির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। তবে ব্যক্তিগত বেতন ও পেনশন হিসাবের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চুক্তির শর্ত এবং প্রযোজ্য বিধান মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
৪. চুক্তির মেয়াদে ইনক্রিমেন্ট, আনুতোষিক ও বর্ধিত পেনশন
প্রজ্ঞাপনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগকালীন চাকরির জন্য ইনক্রিমেন্ট, আনুতোষিক এবং বর্ধিত পেনশন প্রদেয় হবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এটি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের শর্ত বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। নিয়োগের আগে বা চুক্তি সংশোধনের সময় বেতন ও অন্যান্য সুবিধার বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট শর্তের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া উচিত।
৫. অবসরপ্রাপ্ত নন—এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে শর্ত নির্ধারণ
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী ছাড়া অন্য ব্যক্তিদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে বেতন-ভাতা ও অন্যান্য শর্ত প্রতিটি নিয়োগের গুণাগুণ বিবেচনা করে নির্ধারণ করা হবে।
এ জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে শর্তাবলি স্থির করার কথা বলা হয়েছে। এরপর সেই অনুযায়ী চুক্তিপত্র সম্পাদন করা হবে।
অর্থাৎ, এ ধরনের নিয়োগে বেতন-ভাতার শর্ত নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিয়োগের পরিস্থিতি বিবেচনা করা হবে।
৬. আগের পরিপত্র ও নির্দেশনার সংশ্লিষ্ট অংশ বাতিল
নতুন প্রজ্ঞাপনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক আগের আদেশ, স্মারক বা নির্দেশনার সংশ্লিষ্ট অংশ বাতিল বলে গণ্য হবে।
তবে নতুন প্রজ্ঞাপনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আগের নির্দেশনাগুলো বহাল থাকবে। ফলে আগের কোনো নির্দেশনা পুরোপুরি বাতিল হয়েছে কি না, তা বোঝার জন্য নতুন প্রজ্ঞাপনের সঙ্গে সেটির বিষয়বস্তু মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
৭. পরবর্তী সরকারি আদেশও প্রযোজ্য হবে
প্রজ্ঞাপনে বেতন-ভাতা সম্পর্কে যে বিধান উল্লেখ করা হয়েছে, তার পাশাপাশি সরকার পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে যেসব আদেশ জারি করবে, সেগুলোও প্রযোজ্য হবে বলে জানানো হয়েছে।
এ কারণে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বেতন ও সুবিধা নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু বর্তমান প্রজ্ঞাপন নয়, পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত প্রাসঙ্গিক নির্দেশনাও বিবেচনায় নিতে হবে।
৮. ২০১৬ সালের আগের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে নতুন নির্দেশনা
অর্থ বিভাগের ২৬ জানুয়ারি ২০১৬ তারিখে জারি করা প্রজ্ঞাপন বাতিল করে নতুন প্রজ্ঞাপনটি জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন নির্দেশনাটি ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে।
এ বিধান অনুসারে, প্রজ্ঞাপনের আওতাভুক্ত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বেতন-ভাতা নির্ধারণের সময় কার্যকর তারিখ ও চুক্তির শর্ত যাচাই করা জরুরি।
কারা এই প্রজ্ঞাপনের আওতায় পড়বেন?
প্রজ্ঞাপনের শিরোনাম ও বিবরণ অনুযায়ী, এটি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ প্রজাতন্ত্রের বিভিন্ন অসামরিক পদে জনস্বার্থে চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত ব্যক্তি এবং ভবিষ্যতে নিয়োগ পেতে পারেন—এমন ব্যক্তিদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা নির্ধারণসংক্রান্ত।
তবে কোনো ব্যক্তি এই নির্দেশনার আওতায় পড়বেন কি না, তা তাঁর নিয়োগের ধরন, চুক্তির শর্ত, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিধান এবং প্রজ্ঞাপনের প্রযোজ্যতার ওপর নির্ভর করবে।
চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের এখন কী করা উচিত?
প্রজ্ঞাপনটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বেতন ও সুবিধা নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলেও ব্যক্তিগত বেতনের অঙ্ক জানতে কয়েকটি বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন।
-
বর্তমান চুক্তির মেয়াদ ১ জুলাই ২০২৬-এর পর পর্যন্ত বহাল আছে কি না।
-
চুক্তিতে বেতন ও ভাতার কী শর্ত রয়েছে।
-
নতুন বেতনস্কেল অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট গ্রেড ও ধাপ কীভাবে নির্ধারিত হবে।
-
চুক্তি সংশোধনের প্রয়োজন আছে কি না।
-
পেনশন, ইনক্রিমেন্ট ও অন্যান্য সুবিধার ক্ষেত্রে কোন বিধান প্রযোজ্য।
-
পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে নতুন কোনো সরকারি আদেশ জারি হয়েছে কি না।
প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রশাসন শাখা, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বা অর্থ বিভাগের নির্দেশনা অনুসরণ করে বেতন নির্ধারণের বিষয়টি নিশ্চিত করা উচিত।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণে অর্থ বিভাগের ২৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের প্রজ্ঞাপনে আটটি সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যমান চুক্তির বেতন পুনর্নির্ধারণ, নতুন নিয়োগে বেতন নির্ধারণের ভিত্তি, পেনশন-সংক্রান্ত নির্দেশনা, চুক্তির মেয়াদে ইনক্রিমেন্ট ও আনুতোষিকের বিধান এবং আগের নির্দেশনার সংশ্লিষ্ট অংশ বাতিল।
তবে প্রজ্ঞাপনটি সব সরকারি কর্মচারীর জন্য নতুন বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা নয়। এটি নির্দিষ্টভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বেতন-ভাতা ও সুবিধা নির্ধারণসংক্রান্ত। তাই নিজের ক্ষেত্রে কোন বিধান প্রযোজ্য, তা নিশ্চিত করতে মূল প্রজ্ঞাপন ও সংশ্লিষ্ট চুক্তির শর্ত যাচাই করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: অর্থ বিভাগের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ২৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের প্রজ্ঞাপন।
সোহাগ/
