পাতাল মেট্রোরেলের ৪ প্যাকেজের চুক্তি সই, কোন পথে হবে টানেল?
নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর প্রথম পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্প এমআরটি লাইন-১ বাস্তবায়নে আরও এক ধাপ এগিয়েছে। প্রকল্পটির চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্যাকেজের নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এসব চুক্তির আওতায় পাতাল রেলপথ ও স্টেশন নির্মাণ, রেললাইন স্থাপন, বৈদ্যুতিক অবকাঠামো এবং ট্রেন পরিচালনার আধুনিক প্রযুক্তি স্থাপন করা হবে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে মেট্রোরেল ভবনের সম্মেলনকক্ষে চুক্তিগুলো স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)-এর যৌথ অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
এমআরটি লাইন-১-এর চারটি প্যাকেজের মধ্যে দুটি দিয়ে পাতাল রেলপথ ও স্টেশন নির্মাণ করা হবে। বাকি দুটি প্যাকেজে রেললাইন, বিদ্যুৎ, সিগন্যালিং ও যোগাযোগব্যবস্থা স্থাপন করা হবে।
চুক্তি অনুযায়ী কাজগুলো হলো:
১. সিপি-০৪: রামপুরা থেকে নতুন বাজার
এই প্যাকেজের আওতায় রামপুরা আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনের উত্তর প্রান্ত থেকে নতুন বাজার স্টেশন পর্যন্ত ৪ দশমিক ৪৪৭ কিলোমিটার পাতাল রেলপথ নির্মাণ করা হবে।
২. সিপি-০৬: নদ্দা থেকে বিমানবন্দর
এই প্যাকেজে নদ্দা আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনের উত্তর প্রান্ত থেকে বিমানবন্দর স্টেশন পর্যন্ত ৫ দশমিক ১৮২ কিলোমিটার পাতাল রেলপথ নির্মাণ করা হবে।
অর্থাৎ সিপি-০৪ ও সিপি-০৬ মিলিয়ে মোট ৯ দশমিক ৬২৯ কিলোমিটার পাতাল রেলপথ নির্মাণের কাজ হবে।
৩. সিপি-০৯: ট্র্যাক ওয়ার্কস
এ প্যাকেজের আওতায় এমআরটি লাইন-১-এর রেললাইন স্থাপন করা হবে। এর মধ্যে থাকবে রেল, টার্নআউট, পয়েন্ট ও ক্রসিংসহ ট্রেন চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় ট্র্যাক অবকাঠামো। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক অবকাঠামো নির্মাণের কাজও করা হবে।
৪. সিপি-১০: সিগন্যালিং ও টেলিযোগাযোগ
ট্রেন পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক প্রযুক্তি স্থাপন করা হবে এই প্যাকেজে। এর মধ্যে রয়েছে কমিউনিকেশন বেজড অটোমেটিক ট্রেন কন্ট্রোলিং সিস্টেম, অপটিক্যাল ফাইবারভিত্তিক ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক এবং এলটিই প্রযুক্তির রেডিও যোগাযোগব্যবস্থা।
এ ছাড়া প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর ও এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ইআরএমএস) স্থাপনের কাজও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক। তিনি বলেন, রাজধানীর যানজট কমানো, যাতায়াতের সময় বাঁচানো এবং আধুনিক গণপরিবহন নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
তাঁর মতে, এমআরটি লাইন-১ বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় নতুন সুযোগ তৈরি হবে। চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্যাকেজের চুক্তি স্বাক্ষর প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি।
নির্মাণকাজে শ্রম আইনসহ দেশের প্রচলিত আইন মেনে নিরাপত্তা ও গুণগত মান নিশ্চিত করার নির্দেশনাও দেন তিনি। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা এবং নির্মাণের কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি দীর্ঘায়িত না করার ওপর গুরুত্ব দেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনইচি এবং জাইকা বাংলাদেশ অফিসের চিফ রিপ্রেজেন্টেটিভ তাকাহাশি জুনকো।
জাপানের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং উন্নয়ন সহযোগিতার প্রশংসা করেন। মেট্রোরেল প্রকল্পের বাস্তবায়ন কার্যক্রম আবার গতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়ায় বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে দুই দেশের সহযোগিতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন রাষ্ট্রদূত।
এমআরটি লাইন-১ দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্প। চারটি প্যাকেজের কাজ বাস্তবায়িত হলে প্রকল্পটির টানেল, স্টেশন, রেললাইন এবং ট্রেন পরিচালনার প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নির্মাণে অগ্রগতি হবে।
প্রকল্পটি চালু হলে রাজধানীর গণপরিবহনে নতুন একটি ব্যবস্থা যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এতে যাতায়াতের সময় কমানো, সড়কের ওপর যানবাহনের চাপ কমানো এবং পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে চারটি প্যাকেজের নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষর মানেই পাতাল মেট্রোরেল চালু হয়ে যাওয়া নয়। এখন নির্ধারিত কাজগুলো বাস্তবায়ন, নির্মাণের অগ্রগতি এবং পরবর্তী পর্যায়ের কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করবে প্রকল্পটির সময়সূচি।
সব মিলিয়ে, এমআরটি লাইন-১-এর চারটি প্যাকেজের চুক্তি স্বাক্ষর রাজধানীর প্রথম পাতাল মেট্রোরেল বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এখন প্রকল্পের কাজ কত দ্রুত ও নির্ধারিত মান বজায় রেখে এগোয়, সেটিই দেখার বিষয়।
সোহাগ/
