বিদেশে থাকাকালে মাতৃত্বকালীন ছুটি পাবেন সরকারি চাকরিজীবীরা
নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকারি চাকরিতে ছুটি নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে ঈদ, পূজা বা অন্য কোনো দীর্ঘ সরকারি ছুটির সঙ্গে অর্জিত ছুটি যুক্ত করে বিদেশে গেলে মাঝখানের সরকারি ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলো কীভাবে গণনা হবে, তা নিয়ে অনেকের বিভ্রান্তি রয়েছে। একইভাবে, কোনো নারী সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী বিদেশে অবস্থানকালে গর্ভবতী হলে সেখান থেকেই মাতৃত্বকালীন ছুটির আবেদন করতে পারবেন কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বাংলাদেশের সরকারি চাকরির প্রচলিত বিধিবিধানে অর্জিত ছুটি ও মাতৃত্বকালীন ছুটি আলাদা ধরনের ছুটি। বিদেশে অবস্থান, ছুটির অনুমোদন এবং ছুটির হিসাবের ক্ষেত্রেও রয়েছে নির্দিষ্ট নিয়ম। বিষয়গুলো জেনে রাখা জরুরি, যাতে পরবর্তী সময়ে চাকরির রেকর্ড, বেতন-ভাতা বা কাজে যোগদান নিয়ে জটিলতা তৈরি না হয়।
বিদেশে থাকাকালে মাতৃত্বকালীন ছুটির আবেদন করা যাবে?
বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসের ১৯৭ নম্বর বিধিতে সরকারি নারী কর্মচারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটির বিধান রয়েছে। প্রচলিত বিধান অনুযায়ী, মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাসের জন্য মঞ্জুর করা হয়। ছুটি শুরুর তারিখ অথবা সন্তান প্রসবের জন্য কর্মস্থলে অনুপস্থিত হওয়ার তারিখের মধ্যে যেটি আগে, সেটি বিবেচনায় নেওয়া হয়।
অন্যদিকে, নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা, ১৯৫৯-এর ৯ নম্বর বিধিতে মাতৃত্বজনিত ছুটিসহ কয়েক ধরনের বিশেষ ছুটির প্রচলিত বিধান বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে।
এ কারণে মাতৃত্বকালীন ছুটিকে সাধারণ অর্জিত ছুটির সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই। এটি আলাদা ছুটির ব্যবস্থা। ফলে মাতৃত্বকালীন ছুটির জন্য অনুমোদিত হলে সেটি অর্জিত ছুটির হিসাব থেকে কর্তন করার কথা নয়।
তবে কোনো নারী কর্মকর্তা বা কর্মচারী বিদেশে অবস্থান করছেন বলেই তাঁর মাতৃত্বকালীন ছুটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত হবে, এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। বিদেশে অবস্থানকালে আবেদন গ্রহণ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নথি যাচাই এবং আগের বহিঃবাংলাদেশ ছুটির সঙ্গে নতুন ছুটির সমন্বয় কীভাবে হবে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিষয়।
অর্থাৎ, বিদেশে থাকা অবস্থায় আবেদন করার সুযোগ এবং সেই আবেদন অনুমোদনের বিষয়টি আলাদা করে দেখতে হবে।
বিদেশে যাওয়ার আগে ছুটি অনুমোদন করানো কেন জরুরি?
সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৮৭ তারিখের একটি নির্দেশনায় বাংলাদেশের বাইরে অর্জিত ছুটি ভোগের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, বিদেশে অর্জিত ছুটি কাটাতে হলে দেশ ছাড়ার আগেই যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ছুটি মঞ্জুর করিয়ে নিতে হবে। অনুমোদন না নিয়ে বিদেশে গিয়ে পরে ছুটির আবেদন করা বিধিসম্মত নয়।
এ ছাড়া বিদেশে যাওয়ার আগে অনুপস্থিতির সময়সীমা নির্দিষ্ট করা এবং অফিসে পুনরায় যোগদানের তারিখ উল্লেখ করার বিষয়টিও নির্দেশনায় বলা হয়েছে। অনুমোদিত ছুটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বিদেশে অতিরিক্ত অবস্থান করলে তা অননুমোদিত অনুপস্থিতি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
নির্দেশনায় বিদেশে অবস্থানের জন্য নৈমিত্তিক ছুটি দেওয়ার সুযোগ না থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই নির্দেশনাটি বিশেষভাবে বিদেশে অর্জিত ছুটি ভোগের বিষয়ে। তাই একে সব ধরনের ছুটির ক্ষেত্রে একইভাবে প্রয়োগ করা যাবে না। ছুটির ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বিধি ও কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বিবেচনা করতে হবে।
ছুটির মাঝখানে সরকারি ও সাপ্তাহিক ছুটি পড়লে কী হবে?
দীর্ঘ সরকারি ছুটির সঙ্গে অর্জিত ছুটি যুক্ত করে বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করলে ছুটির হিসাব আগে থেকেই পরিষ্কার করা জরুরি।
সাধারণভাবে ছুটির আগে বা পরে সরকারি ছুটি যুক্ত করা এবং অনুমোদিত ছুটির মেয়াদের মাঝখানে সরকারি বা সাপ্তাহিক ছুটি পড়া এক বিষয় নয়। বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসের ১৫৩ ও ১৫৫ নম্বর বিধিতে ছুটির আগে বা পরে সরকারি ছুটি যুক্ত করার বিষয়ে বিধান রয়েছে।
ছুটির আগে বা পরে যুক্ত সরকারি ছুটির ক্ষেত্রে ছুটি কার্যকর হওয়ার তারিখ ও মেয়াদ নির্ধারণের নিয়ম রয়েছে। কিন্তু অনুমোদিত ছুটির সময়সীমার মধ্যে কোনো সরকারি বা সাপ্তাহিক ছুটি পড়লে সেটি আলাদাভাবে বাদ যাবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট ছুটির ধরন ও প্রযোজ্য বিধি দেখে নির্ধারণ করতে হবে।
তাই শুধু ক্যালেন্ডারে সরকারি ছুটি বা সাপ্তাহিক ছুটি রয়েছে বলে সেগুলো অর্জিত ছুটির হিসাব থেকে বাদ যাবে, এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়। আবার সব পরিস্থিতিতে প্রতিটি মধ্যবর্তী দিন অর্জিত ছুটি হিসেবে কর্তন হবে, এমন সিদ্ধান্তও সংশ্লিষ্ট বিধি না দেখে দেওয়া উচিত নয়।
বিদেশ ভ্রমণের আগে নিজের ছুটির হিসাব শাখা বা প্রশাসন শাখা থেকে লিখিতভাবে নিশ্চিত করে নেওয়াই নিরাপদ।
ভারতে অবস্থানকালে মাতৃত্বকালীন ছুটির আবেদন করবেন যেভাবে
কোনো নারী সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী চিকিৎসা, আইভিএফ (IVF) বা পারিবারিক প্রয়োজনে ভারতে অবস্থান করছেন এবং সেখানে মাতৃত্বকালীন ছুটির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, তাহলে দ্রুত নিজ দপ্তরের প্রশাসন শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।
আবেদনের ক্ষেত্রে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে:
১. চিকিৎসকের সনদ সংগ্রহ করুন
ভারতের যে হাসপাতাল বা চিকিৎসকের অধীনে চিকিৎসা চলছে, সেখান থেকে প্রয়োজনীয় মেডিকেল সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে হবে। এতে গর্ভাবস্থার সময়কাল, সম্ভাব্য প্রসবের তারিখ এবং চিকিৎসকের প্রয়োজনীয় পরামর্শ উল্লেখ থাকা ভালো।
২. মাতৃত্বকালীন ছুটির আবেদন তৈরি করুন
আবেদনে নিজের নাম, পদবি, কর্মস্থল, কর্মচারী পরিচিতি, বিদেশে অবস্থানের ঠিকানা এবং মাতৃত্বকালীন ছুটির সম্ভাব্য শুরুর তারিখ উল্লেখ করতে হবে।
৩. নিজ দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করুন
আবেদন ও চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখায় পাঠানোর জন্য যোগাযোগ করতে হবে। দপ্তরের নির্ধারিত ই-ফাইলিং, ই-মেইল বা অন্য দাপ্তরিক পদ্ধতি থাকলে সেটি অনুসরণ করতে হবে।
৪. প্রয়োজনে বাংলাদেশ মিশনের সহায়তা নিন
ভারতে অবস্থানরত কেউ প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ হাইকমিশন বা কনস্যুলার মিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে নথি পাঠানো বা প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক যোগাযোগের বিষয়ে সহায়তা চাইতে পারেন। তবে হাইকমিশন সাধারণত সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর ছুটি মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ নয়। ছুটি অনুমোদনের সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের।
৫. লিখিত অনুমোদন সংগ্রহ করুন
মাতৃত্বকালীন ছুটি অনুমোদিত হলে অফিস আদেশ বা লিখিত অনুমোদনের কপি সংগ্রহ করতে হবে। আগের বহিঃবাংলাদেশ ছুটি কখন শেষ হবে এবং মাতৃত্বকালীন ছুটি কোন তারিখ থেকে কার্যকর হবে, তা স্পষ্টভাবে জেনে নেওয়া জরুরি।
মাতৃত্বকালীন ছুটির আবেদনে যেসব কাগজপত্র লাগতে পারে
দপ্তরভেদে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে পার্থক্য থাকতে পারে। তবে সাধারণভাবে নিচের নথিগুলো প্রস্তুত রাখা যেতে পারে:
১. মাতৃত্বকালীন ছুটির আবেদনপত্র।
২. বিদেশি হাসপাতাল বা চিকিৎসকের মেডিকেল সার্টিফিকেট।
৩. গর্ভাবস্থার চিকিৎসাসংক্রান্ত রিপোর্ট।
৪. সম্ভাব্য প্রসবের তারিখ উল্লেখ করা চিকিৎসকের প্রত্যয়নপত্র।
৫. পাসপোর্ট ও বিদেশে অবস্থানের প্রাসঙ্গিক তথ্য।
৬. পূর্ববর্তী বহিঃবাংলাদেশ ছুটির অনুমোদনপত্র।
৭. ছুটি প্রাপ্যতার হিসাব বা সনদ, যদি দপ্তর চায়।
৮. আগে মাতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়া হয়ে থাকলে তার তথ্য, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের সেবা প্রদান প্রতিশ্রুতি বা নাগরিক সনদে মাতৃত্বকালীন ছুটির আবেদনের সঙ্গে চিকিৎসকের সনদ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দেওয়ার কথা উল্লেখ থাকতে পারে। তাই নিজ দপ্তরের নির্ধারিত তালিকা দেখে কাগজপত্র প্রস্তুত করা উচিত।
হাই-রিস্ক প্রেগন্যান্সি বা IVF চিকিৎসার ক্ষেত্রে করণীয়
বিদেশে অবস্থানকালে কোনো নারী সরকারি কর্মচারীর গর্ভাবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ হলে বা IVF চিকিৎসার মাধ্যমে গর্ভধারণের পর নিয়মিত চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে থাকতে হলে চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের কাছ থেকে বিস্তারিত সনদ সংগ্রহ, সম্ভাব্য প্রসবের তারিখ উল্লেখ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-পরামর্শ নথিভুক্ত রাখা উচিত। এরপর দ্রুত নিজ দপ্তরের প্রশাসন শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করে ছুটির আবেদন ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে হবে।
চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থায় অবশ্যই নিজের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে ছুটির অনুমোদন ও বিদেশে অবস্থানের বৈধতা বজায় রাখতে দাপ্তরিক যোগাযোগ চালু রাখা জরুরি।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
ছুটি নিয়ে পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক জটিলতা এড়াতে কয়েকটি বিষয় মনে রাখা দরকার:
-
বিদেশে যাওয়ার আগে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ছুটি অনুমোদন করিয়ে নিন।
-
অনুমোদিত ছুটির শুরু ও শেষের তারিখ লিখিতভাবে নিশ্চিত করুন।
-
ছুটির আগে, পরে এবং মাঝখানে থাকা সরকারি বা সাপ্তাহিক ছুটির হিসাব আলাদা করে যাচাই করুন।
-
বিদেশে অবস্থানকালে নতুন ধরনের ছুটির প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করুন।
-
মাতৃত্বকালীন ছুটি ও অর্জিত ছুটির হিসাব আলাদাভাবে সংরক্ষণ করুন।
-
অনুমোদিত মেয়াদ শেষ হলে ছুটি বাড়ানোর লিখিত অনুমতি ছাড়া বিদেশে অবস্থান করবেন না।
-
ছুটি মঞ্জুরের অফিস আদেশ ও চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র সংরক্ষণ করুন।
সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ১৬ ধারায় বলা হয়েছে, একজন সরকারি কর্মচারী তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান ও সরকারি আদেশ অনুসারে ছুটি প্রাপ্য হবেন এবং তা ভোগ করতে পারবেন। অর্থাৎ ছুটির ধরন, প্রাপ্যতা ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধি এবং কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই গুরুত্বপূর্ণ।
বিদেশে অবস্থানকালে মাতৃত্বকালীন ছুটির প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট নারী সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী নিজ দপ্তরের কাছে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সনদসহ আবেদন করতে পারেন। তবে আবেদন করলেই ছুটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত হবে, এমন নয়। আগের বহিঃবাংলাদেশ ছুটির সঙ্গে নতুন ছুটির সমন্বয় এবং অনুমোদনের বিষয়টি লিখিতভাবে নিশ্চিত করা জরুরি।
অন্যদিকে, দীর্ঘ সরকারি ছুটির সঙ্গে অর্জিত ছুটি যুক্ত করে বিদেশে যাওয়ার আগে সরকারি ও সাপ্তাহিক ছুটির হিসাব সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছ থেকে যাচাই করে নেওয়া উচিত। কারণ ছুটির আগে বা পরে যুক্ত ছুটি এবং ছুটির মধ্যবর্তী ছুটির দিন গণনার নিয়ম এক নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মাতৃত্বকালীন ছুটি অর্জিত ছুটি থেকে আলাদা। তাই বিদেশে অবস্থানকালে এ ধরনের ছুটির প্রয়োজন দেখা দিলে সাধারণ অর্জিত ছুটির নিয়মের সঙ্গে এক করে না দেখে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী আবেদন ও অনুমোদনের ব্যবস্থা করতে হবে।
সোহাগ/
