৯ম পে-স্কেলে পদোন্নতির পর মূল বেতন কত হবে
নিজস্ব প্রতিবেদক: নতুন জাতীয় বেতন স্কেলে পদোন্নতি পাওয়ার পর মূল বেতন কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নির্ধারিত চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার আগেই কেউ উচ্চতর গ্রেডে পদোন্নতি পেলে তাঁর বেতন কোন নিয়মে নির্ধারিত হবে, তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।
‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’-এর ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে বিভিন্ন গ্রেডে পূর্ণ বেতন পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় চাকরিকালের শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে রয়েছে বেতন নির্ধারণসংক্রান্ত বিধান। ফলে পদোন্নতির পর বেতন নির্ধারণ এবং পূর্ণ বেতন পাওয়ার যোগ্যতা, এই দুটি বিষয় আলাদাভাবে বুঝতে হবে।
৯ম পে-স্কেলে পূর্ণ বেতন পেতে কত বছর চাকরি করতে হবে?
অর্থ বিভাগের প্রকাশিত ২০২৬ সালের বেতন আদেশের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে গ্রেডভিত্তিক পূর্ণ বেতন পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট চাকরিকালের কথা বলা হয়েছে। প্রকাশিত সারণি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সময় হলো:
| গ্রেড | বেতন স্কেল | প্রয়োজনীয় চাকরিকাল |
|---|---|---|
| ১ম | ১,৫৬,০০০ টাকা | ২০ বছর |
| ২য় | ১,৩২,০০০–১,৫৩,০০০ টাকা | ১৭ বছর |
| ৩য় | ১,১৩,০০০–১,৪৮,৮০০ টাকা | ১৪ বছর |
| ৪র্থ | ১,০০,০০০–১,৪২,৪০০ টাকা | ১২ বছর |
| ৫ম | ৮৬,০০০–১,৩৯,৭০০ টাকা | ১০ বছর |
| ৬ষ্ঠ | ৭১,০০০–১,৩৪,০০০ টাকা | ৫ বছর |
| ৭ম | ৫৮,০০০–১,২৬,৮০০ টাকা | ৪ বছর |
এই সারণি অনুযায়ী, ষষ্ঠ গ্রেডে পূর্ণ বেতন পাওয়ার জন্য পাঁচ বছর এবং সপ্তম গ্রেডের ক্ষেত্রে চার বছরের চাকরিকাল প্রয়োজন। তবে শুধু পদোন্নতি পেলেই নির্ধারিত চাকরিকালের শর্ত পূরণ হয়ে যায় না।
চাকরিকাল গণনায় কোন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?
বেতন আদেশের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদের উপ-অনুচ্ছেদ (২)-এ চাকরিকাল গণনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা রয়েছে। সেখানে নির্ধারিত চাকরিকাল বলতে নবম বা তদূর্ধ্ব গ্রেডে নিয়োজিত প্রকৃত চাকরিকালকে বোঝানো হয়েছে।
অর্থাৎ একজন কর্মচারীর মোট সরকারি চাকরির বয়স এবং এই বিধানের আওতায় গণনাযোগ্য চাকরিকাল এক বিষয় নয়। তিনি কত বছর নবম বা তদূর্ধ্ব গ্রেডে প্রকৃতপক্ষে চাকরি করেছেন, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
এ কারণে শুধু চাকরিতে যোগদানের তারিখ থেকে মোট কর্মজীবনের বছর হিসাব করলেই পূর্ণ বেতন পাওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণ করা যাবে না।
নির্ধারিত চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার আগে পদোন্নতি পেলে কী হবে?
সরকারি কর্মচারীদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই। ধরা যাক, একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারী নবম বা তদূর্ধ্ব গ্রেডে তিন বছর চাকরি করার পর ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি পেলেন। অথচ ষষ্ঠ গ্রেডে পূর্ণ বেতন পাওয়ার জন্য নির্ধারিত চাকরিকাল পাঁচ বছর।
এ অবস্থায় তাঁর মূল বেতন কীভাবে নির্ধারণ হবে?
এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় সামনে আসে:
-
পদোন্নতির তারিখে আগের গ্রেডে তাঁর মূল বেতন কত ছিল?
-
নতুন গ্রেডের বেতন স্কেলে কোন ধাপে বেতন নির্ধারণ হবে?
-
পদোন্নতির পর বার্ষিক বেতনবৃদ্ধি কীভাবে কার্যকর হবে?
-
নির্ধারিত চাকরিকাল পূর্ণ হলে পূর্ণ বেতনের যোগ্যতা কীভাবে বিবেচিত হবে?
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। ১১ নম্বর অনুচ্ছেদের চাকরিকালের সারণি থেকে নির্ধারিত সময়ের কম চাকরির জন্য সরাসরি আনুপাতিক বেতন বের করা যায় না। যেমন, পাঁচ বছরের শর্ত থাকলে তিন বছরের জন্য পাঁচ ভাগের তিন ভাগ বেতন দিতে হবে, এমন কোনো সরল হিসাব এই সারণি থেকে করা ঠিক হবে না।
পদোন্নতির পর বেতন নির্ধারণে কোন বিধান প্রযোজ্য?
পদোন্নতির পর মূল বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের বেতন আদেশের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ গুরুত্বপূর্ণ। এই বিধানের আওতায় পূর্ববর্তী মূল বেতন, নতুন পদের গ্রেড এবং প্রযোজ্য বেতন নির্ধারণের নিয়ম বিবেচনা করতে হবে।
অন্যদিকে, ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে রয়েছে সংশ্লিষ্ট গ্রেডে পূর্ণ বেতন পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় চাকরিকালের শর্ত।
অর্থাৎ দুটি বিষয় আলাদা:
১. পদোন্নতির পর বেতন নির্ধারণ: পদোন্নতির তারিখে প্রযোজ্য বিধি অনুসারে নতুন পদের গ্রেডে মূল বেতন কত হবে, সেটি নির্ধারণ করা।
২. পূর্ণ বেতন পাওয়ার যোগ্যতা: সংশ্লিষ্ট গ্রেডের জন্য নির্ধারিত চাকরিকাল পূরণ হয়েছে কি না, সেটি যাচাই করা।
এই দুটি বিষয়কে এক করে দেখলে বেতন হিসাব নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হতে পারে।
একটি উদাহরণে বিষয়টি বুঝে নিন
ধরা যাক, একজন সরকারি কর্মচারীর নবম বা তদূর্ধ্ব গ্রেডে প্রকৃত চাকরিকাল তিন বছর। তিনি ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি পেলেন। ষষ্ঠ গ্রেডের বেতন স্কেল ৭১ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা এবং পূর্ণ বেতন পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় চাকরিকাল পাঁচ বছর।
এ ক্ষেত্রে তাঁর বেতন নির্ধারণের সময় দুটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
প্রথমত, পদোন্নতির তারিখে ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁর মূল বেতন কত হবে?
দ্বিতীয়ত, নির্ধারিত পাঁচ বছরের চাকরিকাল পূর্ণ হলে পূর্ণ বেতন পাওয়ার যোগ্যতা কীভাবে কার্যকর হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদের পূর্ণ বিধান, কর্মচারীর চাকরির বিবরণ এবং পদোন্নতির আদেশ একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। শুধু উদাহরণ দেখে নির্দিষ্ট অঙ্কের বেতন ঘোষণা করা ঠিক হবে না।
বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোথায় যাচাই করবেন?
নতুন পে-স্কেলে পদোন্নতির পর বেতন নির্ধারণ নিয়ে কোনো সংশয় থাকলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কয়েকটি বিষয় যাচাই করতে পারেন:
১. ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’-এর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ।
২. একই আদেশের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদ।
৩. ১১ নম্বর অনুচ্ছেদের উপ-অনুচ্ছেদ (২)-এ চাকরিকাল গণনার ব্যাখ্যা।
৪. সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর পদোন্নতির আদেশ ও পূর্ববর্তী মূল বেতনের তথ্য।
৫. নিজ দপ্তরের হিসাবরক্ষণ ও প্রশাসন শাখার বেতন নির্ধারণসংক্রান্ত নির্দেশনা।
প্রয়োজনে অর্থ বিভাগ বা হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া যেতে পারে। বেতন নির্ধারণের পর আইবাস++ ব্যবস্থায় তথ্যের সঙ্গে অনুমোদিত আদেশের মিল রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা জরুরি।
পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মচারীদের জন্য কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?
নতুন বেতন আদেশে গ্রেডভিত্তিক পূর্ণ বেতন পাওয়ার জন্য চাকরিকালের শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে যাঁরা নির্ধারিত সময় পূর্ণ হওয়ার আগেই পদোন্নতি পাবেন, তাঁদের বেতন নির্ধারণের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশেষ করে পদোন্নতির পর মূল বেতন কোন ধাপে নির্ধারিত হবে, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট কীভাবে যুক্ত হবে এবং পূর্ণ বেতনের যোগ্যতা কখন কার্যকর হবে, তা পরিষ্কারভাবে জানা প্রয়োজন।
এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা ও দাপ্তরিক নির্দেশনা পাওয়া গেলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ নিয়ে বিভ্রান্তি কমবে।
৯ম পে-স্কেলে পদোন্নতির পর মূল বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং পূর্ণ বেতন পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় চাকরিকালের ক্ষেত্রে ১১ নম্বর অনুচ্ছেদ গুরুত্বপূর্ণ। তবে নির্ধারিত চাকরিকাল পূর্ণ না হলে ঠিক কত টাকা মূল বেতন হবে, তা শুধু গ্রেডভিত্তিক সারণি দেখে নির্ধারণ করা যায় না।
তাই পদোন্নতির পর বেতন নির্ধারণের আগে সংশ্লিষ্ট গেজেট, চাকরিকালের হিসাব এবং দপ্তরের অনুমোদিত নির্দেশনা যাচাই করা উচিত। বিশেষ করে যাঁদের নির্ধারিত চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার আগেই পদোন্নতি হচ্ছে, তাঁদের ক্ষেত্রে অনুমানভিত্তিক হিসাব না করে কর্তৃপক্ষের লিখিত ব্যাখ্যা নেওয়াই নিরাপদ।
সোহাগ/
