| ঢাকা, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩

বেতন বাড়ল, অর্থ জোগাতে ঋণের পথে সরকার

জাতীয় ডেস্ক . বিনোদন৬৯.কম
২০২৬ নভেম্বর ০২ ১৯:৫৯:৪৪
বেতন বাড়ল, অর্থ জোগাতে ঋণের পথে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন এবং বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে ব্যাংক খাত থেকে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম আয়োজন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী অক্টোবরের বেতন এবং আগের তিন মাসের বর্ধিত বেতনের বকেয়া পরিশোধে এই অর্থ ব্যয় করা হবে।

দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর করা শুরু হয়েছে। তবে বাড়তি বেতন ও বকেয়া পরিশোধের অর্থ জোগাতে স্বল্পমেয়াদি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে সরকারকে। এতে নতুন বেতন কাঠামোর ব্যয় মেটানোর আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত চলতি মাসে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে ৫৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল সরকার। নতুন ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলামসহ অক্টোবর মাসে ঋণ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।

তবে এই পুরো অর্থকে সরকারের নতুন বা নিট ঋণ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। কারণ, সংগৃহীত অর্থের একটি বড় অংশ আগের ঋণের মেয়াদপূর্তিতে পরিশোধ করতে হয়। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা।

সরকারের হিসাব অনুযায়ী, নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এই অর্থ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ দশমিক ৫৫ শতাংশের সমান।

তুলনামূলকভাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ৬২ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা।

অর্থাৎ সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত অর্থ স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দের চেয়ে প্রায় ৪২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বেশি। শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতের বরাদ্দের প্রায় ৭৭ শতাংশের সমান।

ফলে বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি এই বিপুল অর্থের দীর্ঘমেয়াদি সংস্থান কীভাবে হবে, তা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন বাড়ানোর প্রয়োজন থাকলেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের ব্যয় ঠিক রাখা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বশেষ অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামো কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর দীর্ঘ সময় বেতন কাঠামো পরিবর্তন না হওয়ায় নিত্যপণ্য, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে আয়ের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়।

এই পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালে জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়। পর্যালোচনা শেষে কমিশন ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সুপারিশ জমা দেয়। সেখানে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে সরকার কিছু পরিবর্তন এনে ৩১ আগস্ট নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো অনুমোদন করে। সরকারের হিসাবে, এই কাঠামো বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।

১ নভেম্বর থেকে নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন দেওয়া শুরু হয়েছে। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী অক্টোবরের বেতনের পাশাপাশি জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের বর্ধিত বেতনের বকেয়াও পেয়েছেন। তবে বেতন নির্ধারণ বা পে-ফিক্সেশনের কাজ শেষ না হওয়ায় সবার ক্ষেত্রে অর্থ পরিশোধ একই সময়ে সম্পন্ন হয়নি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধার আওতায় রয়েছেন প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী, ৮ লাখ পেনশনভোগী এবং ৬ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক।

সরকারের আর্থিক চাপের অন্যতম কারণ রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। অথচ পুরো অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।

এদিকে চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। আগের অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।

৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের প্রায় ৪২ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে সরকারি বেতন-ভাতা ও পেনশন, ঋণের সুদ এবং ভর্তুকি ও প্রণোদনার মতো খাতে। এসব খাতে মোট বরাদ্দ প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা। নতুন বেতন কাঠামোর ব্যয় যুক্ত হওয়ায় নিয়মিত ব্যয়ের চাপ আরও বাড়ছে।

নতুন বেতন কাঠামোর পক্ষে সরকারের যুক্তি হলো, দীর্ঘদিন বেতন না বাড়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। বেতন সমন্বয় হলে কর্মীদের জীবনমান ও কাজের আগ্রহ বাড়তে পারে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে দুর্নীতি কমার সম্পর্কের কথা বলেছেন। গত ১২ জুন বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আর্থিক অভাব থেকে দুর্নীতির প্রবণতা তৈরি হতে পারে এবং বেতন বাড়লে সেই প্রবণতা কমার কথা।

তবে শুধু বেতন বাড়ালেই দুর্নীতি কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এ জন্য সরকারি কাজে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, কার্যকর তদারকি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে শাস্তি নিশ্চিত করাও জরুরি।

নতুন বেতন কাঠামোর আর্থিক প্রভাব নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটির নথিতে বলা হয়েছে, উল্লেখযোগ্য হারে রাজস্ব আদায় না বাড়িয়ে বেতন বাড়ানো হলে সরকারকে ঘাটতি অর্থায়নের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। এতে অর্থবাজারে চাপ সৃষ্টি এবং সুদের হার বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরিও নতুন বেতন কাঠামোর কারণে সরকারি ব্যয় ও বাজারে বাড়তি চাপ তৈরির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপের মধ্যে বেতন বৃদ্ধির প্রভাব পণ্যমূল্যেও পড়তে পারে।

অন্যদিকে, সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান এক নিবন্ধে প্রশ্ন তুলেছেন, বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার স্থায়ী ব্যয় বহন করার মতো আর্থিক সক্ষমতা সরকারের রয়েছে কি না। তাঁর মতে, রাজস্ব আয় না বাড়লে এই ব্যয় মেটাতে সরকারকে ঋণ নিতে, অন্য খাতের ব্যয় কমাতে অথবা বাজেট ঘাটতি বাড়াতে হতে পারে।

জাতীয় বেতন কমিশনও বাড়তি ব্যয়ের অর্থ সংস্থানের জন্য সরকারি ব্যয় কমানো এবং রাজস্ব আয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছিল।

কমিশনের সুপারিশের মধ্যে ছিল ভর্তুকি কমানো, রপ্তানি খাতের নগদ প্রণোদনা পর্যায়ক্রমে বন্ধ করা, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমানো এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর একীভূত বা ছোট করা।

এ ছাড়া অকার্যকর উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো এবং করব্যবস্থায় সংস্কারের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ানোর পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল।

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর যৌক্তিকতা থাকলেও এর আর্থিক দায় দীর্ঘমেয়াদে বহন করতে হবে রাষ্ট্রকে। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি এবং ঋণের সুদ পরিশোধের চাপের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর ব্যয় সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

বাড়তি বেতন দিতে গিয়ে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়লে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি ও বিনিয়োগে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের বরাদ্দ কমিয়ে এই ব্যয় মেটানোও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।

সব মিলিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি কার্যকর করার পাশাপাশি রাজস্ব আয় বাড়ানো, সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা আনা এবং ঋণনির্ভরতা নিয়ন্ত্রণে রাখাই এখন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। তা না হলে নতুন বেতন কাঠামোর আর্থিক চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

সোহাগ/

আপনার জন্য নির্বাচিত নিউজ

ক্রিকেট

বিগ ব্যাশে দল পাচ্ছেন মুস্তাফিজ, খেলবেন যে দলে

বিগ ব্যাশে দল পাচ্ছেন মুস্তাফিজ, খেলবেন যে দলে

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের বাঁহাতি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে অস্ট্রেলিয়ার ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে নতুন খবর সামনে এসেছে। ...

লিটন-মিরাজের শতরানের জুটিতে লাঞ্চের আগে বাংলাদেশের লিড ৪৪৩

লিটন-মিরাজের শতরানের জুটিতে লাঞ্চের আগে বাংলাদেশের লিড ৪৪৩

নিজস্ব প্রতিবেদক: আবুধাবিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টে ব্যাট হাতে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন বাংলাদেশের লিটন দাস। ...

ফুটবল

মেসিকে ছাড়াই খেলবে আর্জেন্টিনা, প্রতিপক্ষ উরুগুয়ে ও কোস্টারিকা

মেসিকে ছাড়াই খেলবে আর্জেন্টিনা, প্রতিপক্ষ উরুগুয়ে ও কোস্টারিকা

নিজস্ব প্রতিবেদক: লিওনেল মেসিকে ছাড়াই নভেম্বরের আন্তর্জাতিক ফুটবল বিরতিতে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলতে যাচ্ছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ...

ব্যালন ডি’অর জিতে কত টাকা পান হ্যারি কেইন

ব্যালন ডি’অর জিতে কত টাকা পান হ্যারি কেইন

নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্যালন ডি’অর ফুটবলের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার। এই ট্রফি জেতা মানে শুধু মাঠের ...