পরিত্যক্ত সম্পত্তির মালিকানা দাবি করবেন কোথায়
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে পরিত্যক্ত সম্পত্তির মালিকানা দাবি কিংবা সরকারি প্রক্রিয়ায় বিক্রি করা এমন সম্পত্তির দলিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করতে সাধারণ দেওয়ানি আদালতে মামলা করা যাবে না। এ ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আইন অনুযায়ী নির্ধারিত বিশেষ আদালত ‘কোর্ট অব সেটেলমেন্টে’ যেতে হবে বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
‘সমীরেন্দ্র গুহ রায় বনাম শাবানা খাতুন ও অন্যান্য’ মামলার রায়ে আদালত এ পর্যবেক্ষণ দেন। একই সঙ্গে পরিত্যক্ত সম্পত্তির মালিকানা ও দখল পুনরুদ্ধার নিয়ে অধস্তন আদালতের দেওয়া রায় ও ডিক্রি বাতিল করেছেন হাইকোর্ট।
বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান ও বিচারপতি তামান্না রহমান খালিদীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ২৩ আগস্ট এ রায় দেন। ১০ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি ২৮ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
পরিত্যক্ত সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের শুরু যেভাবে
রাজবাড়ী সদর উপজেলার এসএ খতিয়ান নম্বর ১৬৪-তে থাকা আবদুল জব্বারের একটি বসতভিটা ও জমি নিয়ে এ মামলার সূত্রপাত। মামলার নথি অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় অবাঙালি আবদুল জব্বার ও তাঁর স্ত্রী নিহত হন। তখন তাঁদের এক বছর বয়সী শিশু সন্তান শাবানা খাতুন বেঁচে যান।
পরে ফরিদপুরের শেখ বশির মিয়ার পরিবার শিশুটিকে লালন-পালন করে এবং একপর্যায়ে তাঁর বিয়ে দেয়।
এদিকে, ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির ১৬ নম্বর আদেশের আওতায় ওই সম্পত্তি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করে সরকার। পরবর্তী সময়ে সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ১৯৯৪ সালের ৯ এপ্রিল রেজিস্টার্ড কবলা দলিলে সম্পত্তিটি সমীরেন্দ্র গুহ রায়ের কাছে বিক্রি করা হয়। এরপর থেকে তিনি পরিবারসহ সেখানে বসবাস শুরু করেন।
জমির উত্তরাধিকারী দাবি করে মামলা করেন শাবানা
১৯৯৮ সালের ৩ জুন রাজবাড়ীর ১ নম্বর সহকারী জজ আদালতে সমীরেন্দ্র গুহ রায়সহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে স্বত্ব ঘোষণার মামলা করেন শাবানা খাতুন।
মামলায় তিনি নিজেকে আবদুল জব্বারের একমাত্র জীবিত উত্তরাধিকারী দাবি করেন। একই সঙ্গে সমীরেন্দ্র গুহ রায়ের নামে করা কবলা দলিল অবৈধ ঘোষণা, ৯ দশমিক ১৮ শতক জমির স্বত্ব প্রতিষ্ঠা এবং দখল পুনরুদ্ধারের আবেদন জানান।
শাবানার দাবি ছিল, এসএ খতিয়ান নম্বর ১৬৪-তে তাঁর বাবা আবদুল জব্বারের নামে জমির রেকর্ড ছিল এবং সেখানে তাঁদের বসতবাড়ি ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাবা-মা নিহত হওয়ার পর তিনি শিশু অবস্থায় বেঁচে যান। পরে শেখ বশির মিয়া তাঁকে নিজের বাড়িতে নিয়ে লালন-পালন করেন।
তবে তাঁর বিয়ের কাবিননামায় নাম ফাতেমা খাতুন এবং বাবার নাম বশির মিয়া উল্লেখ ছিল। শাবানার আরও দাবি ছিল, রাষ্ট্রপতির ১৬ নম্বর আদেশ অনুযায়ী সম্পত্তিটি পরিত্যক্ত ঘোষণার যোগ্য ছিল না। ১৯৯৭ সালে সমীরেন্দ্র গুহ রায় জোরপূর্বক জমিতে প্রবেশ করেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
অন্যদিকে, বিবাদীরা আদালতে দাবি করেন, রাষ্ট্রপতির ১৬ নম্বর আদেশ অনুযায়ী সম্পত্তিটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে সরকারি গেজেট প্রকাশ করা হয়েছিল। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের সময় সমীরেন্দ্র গুহ রায়ের নিজের বাড়ি ধ্বংস হয়ে যায় এবং তাঁর বড় ভাই নিহত হন। এরপর তিনি ওই পরিত্যক্ত বাড়িতে বসবাস শুরু করেন।
বিবাদীদের দাবি, সরকার প্রথমে তাঁকে বাড়িটি বরাদ্দ দেয়। পরে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয় এবং কোনো দাবি না আসায় তাঁর অনুকূলে রেজিস্টার্ড সাফ কবলা দলিল সম্পাদন করা হয়।
অধস্তন আদালতে শাবানার পক্ষে রায়
মামলার আরজি, বিবাদীদের লিখিত জবাব, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে ২০০০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর শাবানা খাতুনের পক্ষে রায় ও ডিক্রি দেন রাজবাড়ীর যুগ্ম জেলা জজ আদালত।
ওই রায় ও ডিক্রিতে সংক্ষুব্ধ হয়ে একই বছর হাইকোর্টে ফাস্ট আপিল করেন সমীরেন্দ্র গুহ রায়। আপিলের শুনানিতে উভয় পক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য শোনেন এবং মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করেন হাইকোর্ট।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ: দেওয়ানি আদালতের এখতিয়ার নেই
রায়ে হাইকোর্ট বলেন, অধস্তন আদালতের বাদী শাবানা খাতুন নিজেকে আবদুল জব্বারের মেয়ে ও বৈধ উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রমাণ করার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।
আদালত আরও বলেন, কোনো সম্পত্তিকে পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা এবং পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা বোর্ডের মাধ্যমে রেজিস্টার্ড কবলা দলিলে ওই সম্পত্তি হস্তান্তরের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মামলা করা হলে তা গ্রহণের এখতিয়ার সাধারণ দেওয়ানি আদালতের নেই।
এ ধরনের সম্পত্তির মালিকানা বা স্বত্বসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আইন অনুযায়ী বিশেষ আদালত ‘কোর্ট অব সেটেলমেন্ট’ গঠন করা হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা তাঁর উত্তরাধিকারীদের এ ধরনের দাবি নিয়ে ওই বিশেষ আদালতেই যেতে হবে।
তবে আদালত বলেন, আবদুল জব্বারের কোনো প্রকৃত উত্তরাধিকারী থাকলে এবং আইনের অন্য কোনো বিধানে তাঁর দাবি বাধাগ্রস্ত না হলে, তিনি যথাযথ প্রতিকার চেয়ে কোর্ট অব সেটেলমেন্টে যাওয়ার স্বাধীনতা রাখেন।
অধস্তন আদালতের রায় ও ডিক্রি বাতিল
মামলার ঘটনা, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও নথিপত্রের উপাদান বিবেচনায় হাইকোর্ট ফাস্ট আপিলের যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে বলে মত দেন। এরপর আপিলটি মঞ্জুর করেন আদালত।
একই সঙ্গে ২০০০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর যুগ্ম জেলা জজ আদালতের দেওয়া রায় ও ডিক্রি বাতিল করা হয়। অবিলম্বে অধস্তন আদালতের নথি ফেরত পাঠানোর নির্দেশও দিয়েছেন হাইকোর্ট।
পরিত্যক্ত সম্পত্তি নিয়ে বিরোধে কী বিষয় মনে রাখবেন?
এই রায়ের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পরিত্যক্ত সম্পত্তির মালিকানা বা সরকারি ব্যবস্থাপনায় হস্তান্তরসংক্রান্ত বিরোধে কোন আদালতে যেতে হবে, সে বিষয়ে হাইকোর্টের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ।
তবে রায়টি থেকে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না যে জমি বা সম্পত্তি নিয়ে সব ধরনের বিরোধই কোর্ট অব সেটেলমেন্টে করতে হবে। আদালতের পর্যবেক্ষণটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত সম্পত্তি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি হস্তান্তর প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
তাই কোনো সম্পত্তি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত কি না, সরকারি গেজেট প্রকাশিত হয়েছিল কি না এবং কী প্রক্রিয়ায় হস্তান্তর করা হয়েছে, এসব নথি যাচাই করা জরুরি। মামলা করার আগে সংশ্লিষ্ট আইন ও আদালতের এখতিয়ার সম্পর্কে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সিদ্দিকা/
