হাসিনাসহ আ.লীগ নেতাদের সম্পত্তি বিক্রি করে ক্ষতিপূরণ
নিজস্ব প্রতিবেদক: মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা ও সাবেক জনপ্রতিনিধির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তবে এসব সম্পত্তি কীভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হবে, বিক্রি করা হবে এবং সেই অর্থ ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে পৌঁছাবে, তা নিয়ে এখনো প্রক্রিয়াগত জটিলতা রয়েছে।
এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফের মামলার রায়ের পর বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রি করে ক্ষতিপূরণের অর্থ বিতরণে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রসিকিউশন। পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাওয়ার পর এ বিষয়ে সরকারকে চিঠি দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
প্রসিকিউশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আদালতের নির্দেশে বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, তা বিক্রির ব্যবস্থা করা এবং বিক্রির অর্থ জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হবে।
সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ থাকলেও বাস্তবায়নে জটিলতা
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ২০(এ) ধারায় ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে আইন ও কার্যপ্রণালি বিধিতে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং জরিমানা করার সুযোগ আছে। তবে বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রি করে অর্থ আদায় এবং তা ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণের বিস্তারিত পদ্ধতি স্পষ্ট নয়।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম এর আগে জানিয়েছিলেন, প্রচলিত পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি অ্যাক্ট অথবা ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৮৬ ধারার বিধান অনুসরণ করে সম্পত্তি বিক্রি ও জরিমানা আদায়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। রায়ের নির্দেশনার সঙ্গে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়ার সমন্বয় করা গেলে আদেশ বাস্তবায়ন সহজ হবে বলে মনে করছে প্রসিকিউশন।
শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ
ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ আসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মামলায়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাদের দেশে থাকা সব সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে জুলাই-আগস্টের ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের প্রাপ্য অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়।
এরপর আরও কয়েকটি মামলার রায়ে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ আসে। এর মধ্যে চানখারপুলে হত্যাকাণ্ডের মামলাটি উল্লেখযোগ্য।
চানখারপুলের ছয় নিহতের পরিবার পাবে ক্ষতিপূরণ
চানখারপুলে হত্যাকাণ্ডের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের নগদ অর্থ, ব্যাংক আমানত, শেয়ারসহ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। বাজেয়াপ্ত সম্পদ থেকে পাওয়া অর্থ ছয় নিহতের পরিবারের মধ্যে সমানভাবে বণ্টনের আদেশও দেওয়া হয়।
নিহত ছয়জন হলেন শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ মাহাদী হাসান জুনায়েদ ওরফে মোস্তাকিন, মো. ইয়াকুব, রাকিব হাওলাদার, মোহাম্মদ ইসমামুল হক এবং মানিক মিয়া ওরফে শাহরিক।
এ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী এবং অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ আলম মো. আক্তারুল ইসলাম। রায়ে প্রয়োজনে ঢাকা জেলা প্রশাসককে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগও রাখা হয়।
আশুলিয়ার মামলায় সাইফুল ইসলামের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত
আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর মামলায় ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামের দেশে থাকা সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একই মামলায় অন্য আসামিদেরও নির্দিষ্ট অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। সাতজনকে এক লাখ টাকা করে, একজনকে ৫০ হাজার টাকা এবং ছয়জনকে পাঁচ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়।
রায়ে ক্ষতিপূরণ বিতরণে স্বচ্ছতা ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, উদ্ধার এবং ক্ষতিপূরণ বিতরণের অগ্রগতি জানিয়ে ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়।
ওবায়দুল কাদেরসহ পাঁচ নেতার অর্ধেক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ পাঁচ নেতার সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। অন্য চারজন হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ এবং সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল।
রায়ে তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এসব সম্পত্তি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ জুলাই ফাউন্ডেশন অথবা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের কিংবা তাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার কথা বলা হয়।
হানিফসহ চারজনের সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত
সর্বশেষ কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার মামলায় মাহবুব উল আলম হানিফসহ চারজনের সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। অন্য তিন আসামি হলেন কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সদর উদ্দিন খান, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসগর আলী এবং কুষ্টিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান।
গত ২৯ অক্টোবর ঘোষিত রায়ে হানিফকে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য তিন আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করে বিক্রির অর্থ জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
রায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, বিক্রয়লব্ধ অর্থ জুলাই ফাউন্ডেশন অথবা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের মধ্যে বিতরণ করার কথা রয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর সরকারকে চিঠি দেবে প্রসিকিউশন
বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রি করে ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায়ের বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, ওবায়দুল কাদের ও মাহবুব উল আলম হানিফের মামলার রায়ে সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্তের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাওয়ার পর সম্পত্তিগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং বিক্রির ব্যবস্থা করার জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারকে চিঠি দেওয়া হবে। বিক্রির অর্থ জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণের অনুরোধও জানানো হবে।
তবে সম্পত্তি শনাক্ত, সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, বিক্রি এবং ক্ষতিপূরণের অর্থ বণ্টনের পুরো প্রক্রিয়া এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। ফলে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ভুক্তভোগী পরিবারগুলো কবে ক্ষতিপূরণ পাবে, তা নির্ভর করছে পরবর্তী প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপের ওপর।
সোহাগ/
