গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন ৩৭ হাজার টাকা করার প্রস্তাব
নিজস্ব প্রতিবেদক:দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য নতুন মজুরি কাঠামোর প্রস্তাব দিয়েছে ৩৫টি শ্রমিক সংগঠন। প্রস্তাবে সর্বনিম্ন গ্রেডের শ্রমিকদের মাসিক মজুরি ভাতাসহ ৩৭ হাজার ১২৫ টাকা এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের শ্রমিকদের ৫৮ হাজার ৫০০ টাকা করার দাবি জানানো হয়েছে।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর চারটি জোটের পক্ষ থেকে ২০২৬ থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত তিন বছরের জন্য নতুন মজুরি কাঠামো প্রণয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ জন্য দ্রুত নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন এবং বোর্ডে প্রকৃত শ্রমিক প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তির দাবিও জানিয়েছে তারা।
গত ২৬ অক্টোবর রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। প্রস্তাবিত কাঠামোয় মূল বেতনের পাশাপাশি বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, খাদ্য ও শিক্ষা সহায়ক ভাতা রাখার কথা বলা হয়েছে।
তবে মনে রাখতে হবে, এগুলো শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রস্তাবিত বেতন। এখনো চূড়ান্ত সরকারি মজুরি হিসেবে কার্যকর হয়নি।
কোন গ্রেডে কত টাকা বেতনের প্রস্তাব?
শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রস্তাবে পোশাকশ্রমিকদের চারটি গ্রেডে ভাগ করা হয়েছে। দায়িত্ব, দক্ষতা ও কাজের ধরন অনুযায়ী প্রতিটি গ্রেডের জন্য আলাদা মূল বেতন এবং ভাতাসহ মোট মজুরি নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে।
প্রস্তাবিত মজুরি কাঠামো হলো:
| গ্রেড | প্রস্তাবিত মূল বেতন | ভাতাসহ মোট মজুরি |
|---|---|---|
| গ্রেড-১ | ৩৫,০০০ টাকা | ৫৮,৫০০ টাকা |
| গ্রেড-২ | ৩০,০০০ টাকা | ৫১,০০০ টাকা |
| গ্রেড-৩ | ২৫,০০০ টাকা | ৪৩,৫০০ টাকা |
| গ্রেড-৪ | ২০,৭৫০ টাকা | ৩৭,১২৫ টাকা |
এই হিসাবে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের মোট মাসিক মজুরির পার্থক্য হবে ২১ হাজার ৩৭৫ টাকা।
সর্বনিম্ন গ্রেডের শ্রমিক কোন কোন ভাতা পাবেন?
প্রস্তাবিত কাঠামোয় সর্বনিম্ন গ্রেডের শ্রমিকদের মূল বেতন ২০ হাজার ৭৫০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। এর সঙ্গে কয়েক ধরনের ভাতা যোগ করে মোট মাসিক মজুরি ৩৭ হাজার ১২৫ টাকা নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে।
ভাতার প্রস্তাবিত হিসাব হলো:
| বেতনের খাত | প্রস্তাবিত পরিমাণ |
|---|---|
| মূল বেতন | ২০,৭৫০ টাকা |
| বাড়িভাড়া | ১০,৩৭৫ টাকা |
| চিকিৎসা ভাতা | ২,০০০ টাকা |
| যাতায়াত ভাতা | ১,৫০০ টাকা |
| খাদ্য ভাতা | ১,৫০০ টাকা |
| শিক্ষা সহায়ক ভাতা | ১,০০০ টাকা |
| মোট মাসিক মজুরি | ৩৭,১২৫ টাকা |
এখানে বাড়িভাড়া মূল বেতনের ৫০ শতাংশ হিসাবে নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। অন্যান্য ভাতা নির্দিষ্ট অঙ্কে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
কোন গ্রেডে কারা থাকবেন?
প্রস্তাবিত কাঠামোয় কাজের ধরন ও দক্ষতা অনুযায়ী শ্রমিকদের চারটি গ্রেডে ভাগ করার কথা বলা হয়েছে।
গ্রেড-৪: সহকারী অপারেটর, সহকারী কাটারম্যান, নিডলম্যান, সিজারম্যান ও সহকারী কোয়ালিটি ইন্সপেক্টরদের এ গ্রেডে রাখার প্রস্তাব রয়েছে। তাঁদের মোট মাসিক মজুরি ৩৭ হাজার ১২৫ টাকা করার দাবি জানানো হয়েছে।
গ্রেড-৩: দক্ষ শ্রমিকদের জন্য মূল বেতন ২৫ হাজার টাকা এবং ভাতাসহ মোট মজুরি ৪৩ হাজার ৫০০ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।
গ্রেড-২: উচ্চতর দক্ষতাসম্পন্ন শ্রমিকদের মূল বেতন ৩০ হাজার টাকা এবং মোট মাসিক মজুরি ৫১ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
গ্রেড-১: সিনিয়র অপারেটর, সিনিয়র কাটার ও সিনিয়র কোয়ালিটি ইন্সপেক্টরদের মতো অভিজ্ঞ শ্রমিকদের জন্য মূল বেতন ৩৫ হাজার টাকা এবং ভাতাসহ মোট মজুরি ৫৮ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে।
বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ১৫ শতাংশ করার দাবি
নতুন মজুরি কাঠামোর পাশাপাশি শ্রমিকদের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির বিষয়টিও প্রস্তাবে গুরুত্ব পেয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলো মূল বেতনের ওপর প্রতিবছর ১৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, চাকরিতে যোগদানের তারিখ থেকে প্রথম বছরেই ইনক্রিমেন্ট কার্যকর করার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। এতে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির একটি নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া শিক্ষানবিশ প্রথা ও শিক্ষানবিশদের জন্য আলাদা মজুরি বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে। উৎপাদন বা ফুরণভিত্তিক শ্রমিকদের কাজ দিতে না পারলে তাঁদের দ্বিতীয় গ্রেডের মূল বেতন দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।
কেন সর্বনিম্ন মজুরি ৩৭ হাজার ১২৫ টাকা করার দাবি?
শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও শিক্ষার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান মজুরি দিয়ে শ্রমিকদের পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।
সংগঠনগুলোর উপস্থাপিত হিসাব অনুযায়ী, চার সদস্যের একটি পরিবারের ন্যূনতম পুষ্টিকর খাবারের জন্য মাসে প্রায় ৩৫ হাজার ৫৮০ টাকা প্রয়োজন হতে পারে। বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত ও অন্যান্য খরচ যোগ করলে একটি পরিবারের মাসিক ব্যয় প্রায় ৬৩ হাজার ৬৬০ টাকা পর্যন্ত দাঁড়াতে পারে।
তাদের হিসাব অনুযায়ী, পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী যদি মোট ব্যয়ের ৬০ শতাংশ বহন করেন, তাহলে তাঁর প্রয়োজনীয় মাসিক আয় প্রায় ৩৮ হাজার টাকা।
এই হিসাবের ভিত্তিতেই সর্বনিম্ন মজুরি ৩৭ হাজার ১২৫ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে শ্রমিক সংগঠনগুলো। তবে এসব ব্যয়ের হিসাব সংগঠনগুলোর নিজস্ব উপস্থাপনা, সরকারি নির্ধারিত ব্যয়-পরিসংখ্যান নয়।
কবে নির্ধারিত হতে পারে নতুন মজুরি?
পোশাকশ্রমিকদের সর্বশেষ নিম্নতম মজুরি ২০২৩ সালের নভেম্বরে ঘোষণা করা হয়েছিল। তখন সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়, যা ওই বছরের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়।
এবার নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের জন্য দ্রুত নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি জানিয়েছে শ্রমিক সংগঠনগুলো। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের শুরুতে সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। পরে ১৫ অক্টোবর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বোর্ডে মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধির নাম চেয়ে চিঠি পাঠায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ এবং নতুন মজুরি চূড়ান্ত হওয়ার বিষয় দুটি আলাদা। শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রস্তাব, সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত এবং সরকারের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নতুন মজুরি নির্ধারিত হবে।
প্রস্তাব কার্যকর হলে শ্রমিকদের কী পরিবর্তন আসতে পারে?
শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে পোশাকশ্রমিকদের মূল বেতন ও ভাতার কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে সর্বনিম্ন গ্রেডের শ্রমিকদের মোট মাসিক মজুরি ৩৭ হাজার ১২৫ টাকা হলে তাঁদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
একই সঙ্গে বার্ষিক ১৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট চালু হলে চাকরির মেয়াদ বাড়ার সঙ্গে বেতন বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রস্তাবটি কার্যকর হবে কি না, তা নির্ভর করছে মজুরি বোর্ডের সুপারিশ ও সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।
সব মিলিয়ে, গার্মেন্টস শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি ৩৭ হাজার ১২৫ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৫৮ হাজার ৫০০ টাকা করার প্রস্তাব এখন আলোচনায় রয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত এই অঙ্কগুলোকে নতুন কার্যকর বেতন হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
সোহাগ/
