সয়াবিন তেল নাকি সরিষার তেল, কোনটি বেশি উপকারী
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের রান্নাঘরে সয়াবিন ও সরিষার তেল সবচেয়ে পরিচিত ভোজ্য তেলের মধ্যে অন্যতম। কেউ প্রতিদিনের রান্নায় সয়াবিন তেল ব্যবহার করেন, আবার অনেকের পছন্দ সরিষার তেল। তবে স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনায় কোনটি বেশি উপকারী? হৃদ্যন্ত্রের সুস্থতা, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ কিংবা শরীরের প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিডের কথা ভাবলে কোন তেল বেছে নেওয়া ভালো?
পুষ্টিবিজ্ঞানীদের পরামর্শ অনুযায়ী, একটিকে সবার জন্য সেরা বলা ঠিক নয়। কারণ সয়াবিন ও সরিষার তেলের পুষ্টিগঠন আলাদা। কোনটি বেশি উপযোগী হবে, তা নির্ভর করে তেলের মান, পরিমাণ এবং খাদ্যাভ্যাসের ওপর।
সয়াবিন তেলের পুষ্টিগুণ কী?
সয়াবিন তেলে অসম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ বেশি। এতে ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিডের পাশাপাশি কিছু ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডও রয়েছে। শরীর নিজে এসব প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরি করতে পারে না, তাই খাবারের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সয়াবিন তেলের মতো অসম্পৃক্ত চর্বিসমৃদ্ধ উদ্ভিজ্জ তেল খাদ্যতালিকায় স্যাচুরেটেড ফ্যাটের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা ভালো। বিশেষ করে ঘি, মাখন বা অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাবারের পরিবর্তে এ ধরনের তেল ব্যবহার করলে হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকার হতে পারে।
তবে সয়াবিন তেল বেশি খেলেই শরীর ভালো থাকবে, এমন ধারণা সঠিক নয়। সব ধরনের তেলেই ক্যালরি বেশি থাকে। তাই পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
সরিষার তেল কি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো?
সরিষার তেলেও অসম্পৃক্ত চর্বি রয়েছে। এতে মনোআনস্যাচুরেটেড ও পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়। এ ছাড়া সরিষার তেলে রয়েছে বিশেষ ধরনের ফ্যাটি অ্যাসিড, যার নাম ইরুসিক অ্যাসিড।
সরিষার তেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এতে ইরুসিক অ্যাসিডের পরিমাণ সরিষার জাত ও উৎপাদনপদ্ধতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। প্রাণীর ওপর কিছু গবেষণায় বেশি মাত্রার ইরুসিক অ্যাসিডের সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব দেখা গেছে। তবে মানুষের ক্ষেত্রে এর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে গবেষণা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
তাই সরিষার তেলকে নিঃশর্তভাবে হৃদ্যন্ত্রের জন্য সবচেয়ে ভালো বলা যায় না। নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্যোপযোগী তেল বেছে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
সয়াবিন ও সরিষার তেলের মধ্যে প্রধান পার্থক্য
দুই তেলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো:
সয়াবিন তেল
-
পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ বেশি।
-
ওমেগা-৬ এবং কিছু ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে।
-
স্যাচুরেটেড ফ্যাটের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
-
স্বাদ ও গন্ধ তুলনামূলক নিরপেক্ষ।
সরিষার তেল
-
মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য।
-
এতে ইরুসিক অ্যাসিড থাকতে পারে, যার মাত্রা তেলের ধরনভেদে আলাদা হয়।
-
রান্নায় বিশেষ ঝাঁজ ও সুগন্ধ যোগ করে।
-
এর স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে আরও মানবভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন।
হৃদ্যন্ত্রের জন্য কোন তেল বেশি উপকারী?
হৃদ্স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাট কমিয়ে অসম্পৃক্ত ফ্যাট গ্রহণ করা। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন সয়াবিন তেলসহ বিভিন্ন তরল উদ্ভিজ্জ তেলকে স্যাচুরেটেড ফ্যাটসমৃদ্ধ চর্বির বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের পরামর্শ দেয়।
এই বিবেচনায় সয়াবিন তেলের পক্ষে তুলনামূলকভাবে ভালো বৈজ্ঞানিক সমর্থন রয়েছে। অন্যদিকে সরিষার তেলে অসম্পৃক্ত ফ্যাট থাকলেও ইরুসিক অ্যাসিডের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
তবে কোনো তেলই একা হৃদ্রোগ প্রতিরোধ করতে পারে না। সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, ওজন এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
রান্নায় তেল ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো মনে রাখবেন
সয়াবিন হোক বা সরিষা, দুই ধরনের তেল ব্যবহারের ক্ষেত্রেই কয়েকটি নিয়ম মেনে চলা ভালো।
১. প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল ব্যবহার করবেন না।২. একই তেল বারবার গরম করে রান্নায় ব্যবহার করা এড়িয়ে চলুন।৩. তেল থেকে ধোঁয়া উঠতে শুরু করলে সেটি ব্যবহার করা উচিত নয়।৪. তেল দীর্ঘদিন খোলা অবস্থায় বা অতিরিক্ত আলো-তাপে রাখবেন না।৫. ভাজাপোড়া খাবার নিয়মিত ও অতিরিক্ত খাওয়ার অভ্যাস কমান।
তাহলে কোন তেল বেছে নেবেন?
সয়াবিন ও সরিষার তেলের মধ্যে একটিকে সবার জন্য চূড়ান্তভাবে বেশি উপকারী বলা যায় না। তবে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিবর্তে অসম্পৃক্ত ফ্যাট গ্রহণের বৈজ্ঞানিক সুপারিশ বিবেচনায় সয়াবিন তেলের পক্ষে ভালো প্রমাণ রয়েছে। সরিষার তেলও খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে, তবে এর ইরুসিক অ্যাসিডের মাত্রা ও তেলের মান বিবেচনা করা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যে তেলই ব্যবহার করুন না কেন, পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করুন এবং মানসম্মত, খাদ্যোপযোগী তেল কিনুন। শুধু তেলের ধরন বদলালেই সুস্থ থাকা নিশ্চিত হয় না, সুষম খাবার ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও সমান জরুরি।
আশা/
