সম্পত্তি দান ও হেবা: রেজিস্ট্রেশন ফি ও বাতিলের নিয়ম
নিজের নামে থাকা জমি, বাড়ি বা অন্য সম্পত্তি সন্তান, স্বামী-স্ত্রী কিংবা নিকটাত্মীয়ের নামে লিখে দিতে চান? বাংলাদেশে এ ধরনের সম্পত্তি হস্তান্তরের প্রচলিত পদ্ধতি হলো দান ও হেবা। তবে শুধু দলিল তৈরি করলেই সব ক্ষেত্রে সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে বিরোধের ঝুঁকি শেষ হয় না। দাতার বৈধ মালিকানা, গ্রহীতার সম্মতি, দলিল নিবন্ধন এবং হেবার ক্ষেত্রে দখল হস্তান্তরের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে সম্পত্তি দানের সাধারণ বিধান রয়েছে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর ১২২ ও ১২৩ ধারায়। মুসলিম ব্যক্তিগত আইনেও হেবা স্বীকৃত। স্থাবর সম্পত্তি, যেমন জমি বা বাড়ি দান কিংবা হেবা করার ক্ষেত্রে নিবন্ধিত দলিল প্রয়োজন।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর প্রণীত সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে নতুন ১২২ক ও ১২২খ ধারা যুক্ত হয়েছে। এতে নির্দিষ্ট আত্মীয়ের মধ্যে সম্পত্তি দানের পরও দাতার জীবদ্দশায় তা ভোগের অধিকার সংরক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
সম্পত্তি দান কী, কীভাবে করবেন?
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১২২ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় এবং বিনিময়মূল্য ছাড়া নিজের বিদ্যমান স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি অন্য কাউকে হস্তান্তর করলে এবং গ্রহীতা বা তাঁর পক্ষে কেউ তা গ্রহণ করলে তাকে দান বলা হয়।
যিনি সম্পত্তি দেন, তিনি দাতা। আর যিনি সম্পত্তি গ্রহণ করেন, তিনি দানগ্রহীতা।
দান বৈধ হওয়ার জন্য কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হয়:
- দান হতে হবে স্বেচ্ছায় এবং কোনো বিনিময়মূল্য ছাড়া।
- দাতাকে সম্পত্তির বৈধ মালিক হতে হবে।
- দাতার সম্পত্তি দান করার আইনগত সক্ষমতা থাকতে হবে।
- দানগ্রহীতা বা তাঁর পক্ষে বৈধ প্রতিনিধি দান গ্রহণ করবেন।
- দাতার জীবদ্দশায় এবং দান করার সক্ষমতা থাকা অবস্থায় গ্রহণ সম্পন্ন হতে হবে।
জমি বা বাড়ির মতো স্থাবর সম্পত্তি দান করতে হলে নিবন্ধিত দলিল করতে হয়। সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১২৩ ধারা অনুযায়ী, দাতার স্বাক্ষরযুক্ত দলিল অন্তত দুইজন সাক্ষীর মাধ্যমে সত্যায়িত হতে হবে।
অন্যদিকে অস্থাবর সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে নিবন্ধিত দলিল অথবা আইন অনুযায়ী দখল হস্তান্তরের মাধ্যমে দান সম্পন্ন করা যেতে পারে।
হেবা কী? দান ও হেবার মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
হেবা হলো মুসলিম ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী সম্পত্তি দানের একটি পদ্ধতি। সাধারণ দানের মতো হেবার ক্ষেত্রেও কোনো বিনিময়মূল্য ছাড়াই সম্পত্তি হস্তান্তর করা হয়। তবে হেবা বৈধ হওয়ার জন্য তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
১. ঘোষণা: দাতাকে স্পষ্টভাবে সম্পত্তি হেবা করার ইচ্ছা প্রকাশ করতে হবে।
২. গ্রহণ: যাঁকে হেবা করা হচ্ছে, তাঁকে অথবা তাঁর পক্ষে বৈধ প্রতিনিধিকে হেবা গ্রহণ করতে হবে।
৩. দখল হস্তান্তর: সম্পত্তির প্রকৃতি ও পরিস্থিতি অনুযায়ী বাস্তব অথবা আইনস্বীকৃত পদ্ধতিতে দখল গ্রহীতার কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
বাংলাদেশে স্থাবর সম্পত্তির হেবা ঘোষণার নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১২৩ ধারায় মুসলিম আইনের হেবাকে স্থাবর সম্পত্তির দান হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। পাশাপাশি নিবন্ধন আইন, ১৯০৮-এর ১৭ ধারায় হেবা ঘোষণার নিবন্ধনের বিধান রয়েছে।
তবে শুধু হেবা দলিল নিবন্ধন করলেই সব ক্ষেত্রে হেবা সম্পূর্ণ হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ঘোষণা, গ্রহণ এবং দখল হস্তান্তরের বিষয়গুলোও প্রমাণযোগ্য হওয়া জরুরি।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একটি রায়েও বলা হয়েছে, নিবন্ধিত হেবা দলিল থাকলেই দখল হস্তান্তর হয়েছে বলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয় না। তাই হেবার ক্ষেত্রে দখল বুঝিয়ে দেওয়ার প্রমাণ সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
দান বা হেবায় কি পুরো সম্পত্তি দেওয়া যায়?
জীবদ্দশায় নিজের বৈধ মালিকানাধীন সম্পত্তি দান বা হেবা করার ক্ষেত্রে সাধারণভাবে এক-তৃতীয়াংশের কোনো বাধ্যতামূলক সীমা নেই। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি নিজের মালিকানাধীন সম্পত্তির পুরোটা বা একটি অংশ দান করতে পারেন।
তবে দাতা যতটুকু সম্পত্তির বৈধ মালিক, ততটুকুই হস্তান্তর করতে পারবেন। যৌথ মালিকানাধীন জমির ক্ষেত্রে অন্য শরিকদের অংশ দান করার সুযোগ নেই।
এখানে দান বা হেবার সঙ্গে ওসিয়তের পার্থক্য বুঝতে হবে। মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে ওসিয়তের ক্ষেত্রে এক-তৃতীয়াংশসংক্রান্ত বিধান রয়েছে। কিন্তু জীবদ্দশায় সম্পন্ন বৈধ দান বা হেবার নিয়ম আলাদা।
তবে প্রতারণা, জালিয়াতি, জবরদস্তি বা অযাচিত প্রভাবের মাধ্যমে দলিল করা হলে তা আদালতে চ্যালেঞ্জ হতে পারে। উত্তরাধিকারীদের বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে করা কোনো লেনদেনের বৈধতাও সংশ্লিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
হেবা রেজিস্ট্রেশন ফি কত টাকা?
নিবন্ধন আইন, ১৯০৮-এর ৭৮ক ধারায় নির্দিষ্ট নিকটাত্মীয়দের মধ্যে স্থাবর সম্পত্তির হেবা ঘোষণার নিবন্ধন ফি ১০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সম্পত্তির মূল্য যতই হোক, আইন নির্ধারিত সম্পর্কের মধ্যে হেবা হলে এই নিবন্ধন ফি একই থাকে।
যেসব সম্পর্কের মধ্যে ১০০ টাকা নিবন্ধন ফি প্রযোজ্য:
- স্বামী ও স্ত্রী।
- বাবা-মা ও সন্তান।
- দাদা-দাদি বা নানা-নানি এবং নাতি-নাতনি।
- আপন ভাই ও আপন বোন।
তালিকার বাইরে অন্য কাউকে হেবা করলে এই নির্দিষ্ট ১০০ টাকা ফি প্রযোজ্য নয়। সে ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সরকারি ফি ও অন্যান্য খরচ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে খোঁজ নিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, সাধারণ দানপত্র এবং মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের হেবা ঘোষণার নিবন্ধন ফি এক বিষয় নয়। দলিলের ধরন এবং দাতা-গ্রহীতার সম্পর্ক অনুযায়ী ফি নির্ধারিত হয়।
২০২৬ সালের নতুন আইনে দাতার জন্য কী সুবিধা রাখা হয়েছে?
সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে মূল আইনে ১২২ক ও ১২২খ নামে দুটি নতুন ধারা যুক্ত হয়েছে। নতুন বিধানে নির্দিষ্ট সম্পর্কের মধ্যে সম্পত্তি দান করেও দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগের অধিকার সংরক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এই সুবিধা যেসব সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য:
- বাবা-মা সন্তানকে অথবা সন্তান বাবা-মাকে।
- দাদা-দাদি বা নানা-নানি নাতি-নাতনিকে অথবা নাতি-নাতনি তাঁদের দাদা-দাদি বা নানা-নানিকে।
- স্বামী ও স্ত্রী পরস্পরকে।
অর্থাৎ, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে সম্পত্তি অন্যের নামে দান করলেও দাতা নিজের জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করার অধিকার রাখতে পারবেন।
স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে এ ধরনের দান করতে হলে নিবন্ধিত দলিল করতে হবে এবং দলিলে দাতার জীবদ্দশায় ভোগের অধিকার সংরক্ষণের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।
নতুন আইনের ১২২ক ধারায় আরও বলা হয়েছে, দাতার জীবদ্দশায় দানগ্রহীতার মৃত্যু হলে সম্পত্তি আইন অনুযায়ী তাঁর উত্তরাধিকারীদের কাছে যাবে। তবে সম্পত্তির ওপর দাতার জীবদ্দশায় ভোগের অধিকার বহাল থাকবে।
এই নতুন পদ্ধতি সাধারণ দান বা মুসলিম আইনের প্রচলিত হেবার বিকল্প নয়। আইন এটিকে সম্পত্তি হস্তান্তরের পৃথক একটি পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
নতুন আইনে দান করা সম্পত্তি কি বাতিল করা যাবে?
নতুন আইনের ১২২খ ধারায় দাতার জীবদ্দশায় ভোগের অধিকার সংরক্ষণ করে করা দান নিবন্ধনের পর সাধারণভাবে বাতিল বা পরিবর্তন করা যাবে না। তবে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।
দাতা ও গ্রহীতার সম্মতিতে: আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষা, পারিবারিক বা অন্য কোনো প্রকৃত প্রয়োজন দেখা দিলে দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের সম্মতিতে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে দান পরিবর্তন বা বাতিল করা যেতে পারে।
জেলা জজের অনুমতিতে: কোনো পক্ষ অপ্রাপ্তবয়স্ক, নিখোঁজ, মানসিকভাবে অক্ষম, আইনগতভাবে অক্ষম অথবা অন্য কোনো পর্যাপ্ত কারণে সম্মতি দিতে না পারলে অপর পক্ষ জেলা জজের কাছে আবেদন করতে পারবেন।
এ ক্ষেত্রে জেলা জজ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নোটিশ দেবেন, প্রয়োজনীয় তদন্ত করবেন এবং আবেদনটি সৎ উদ্দেশ্যে করা হয়েছে কি না তা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
অর্থাৎ, নতুন আইনের অধীনে করা এ ধরনের দান বাতিলের জন্য নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
সাধারণ দান বা হেবা কি বাতিল করা যায়?
সম্পত্তি দান বা হেবা সম্পন্ন হওয়ার পর দাতা ইচ্ছা করলেই একতরফাভাবে তা বাতিল করতে পারবেন, এমন সাধারণ নিয়ম নেই।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১২৬ ধারায় বলা হয়েছে, দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে এমন শর্ত থাকতে পারে, যার অধীনে নির্দিষ্ট কোনো ঘটনা ঘটলে দান স্থগিত বা বাতিল হবে। তবে সেই ঘটনা দাতার নিজের ইচ্ছাধীন হতে পারবে না।
অর্থাৎ, শুধু দাতার ইচ্ছায় যেকোনো সময় দান বাতিল করা যাবে, এমন শর্ত আইনসম্মত নয়।
এ ছাড়া প্রতারণা, জবরদস্তি বা অযাচিত প্রভাবের মতো কারণে কোনো দলিল চুক্তি বাতিলযোগ্য হওয়ার আইনি শর্ত পূরণ করলে আদালতে দান বাতিলের আবেদন করা যেতে পারে।
মুসলিম আইনে হেবা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রেও আলাদা বিধান ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। স্বামী-স্ত্রী বা নিকটাত্মীয়ের মধ্যে হেবা, দখল হস্তান্তর এবং গ্রহীতার মৃত্যুর মতো বিষয় প্রত্যাহারের সুযোগকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই সব হেবা একই নিয়মে বাতিল করা যায়, এমন ধারণা সঠিক নয়।
সম্পত্তি দান বা হেবা করার আগে যেসব বিষয় যাচাই করবেন
সম্পত্তি দান বা হেবা করার আগে কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। এতে ভবিষ্যতে মালিকানা নিয়ে বিরোধের ঝুঁকি কমানো যায়।
১. দাতা সম্পত্তির প্রকৃত ও বৈধ মালিক কি না, তা যাচাই করুন।
২. জমির মূল দলিল, খতিয়ান, দাগ নম্বর ও জমির পরিমাণ পরীক্ষা করুন।
৩. সম্পত্তি যৌথ মালিকানাধীন হলে দাতার প্রকৃত অংশ কতটুকু, তা নিশ্চিত করুন।
৪. দানগ্রহীতা সম্পত্তি গ্রহণ করছেন কি না, তা নিশ্চিত করুন।
৫. হেবার ক্ষেত্রে দখল হস্তান্তরের বাস্তব ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ সংরক্ষণ করুন।
৬. স্থাবর সম্পত্তির দান বা হেবা দলিল যথাযথভাবে নিবন্ধন করুন।
৭. দলিলে দাতার কোনো বিশেষ অধিকার বা শর্ত থাকলে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন।
৮. দলিল করার আগে প্রযোজ্য নিবন্ধন ফি ও অন্যান্য সরকারি খরচ সম্পর্কে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে জেনে নিন।
শেষ কথা: সম্পত্তি দান বা হেবা শুধু পারিবারিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত প্রক্রিয়া। তাই দলিল করার আগে মালিকানা, নিবন্ধন, গ্রহণ ও দখল হস্তান্তরের বিষয়গুলো নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ২০২৬ সালের নতুন বিধানে দাতার ভোগের অধিকার সংরক্ষণ করতে চাইলে দলিলের শর্তগুলো আইন অনুযায়ী তৈরি করা জরুরি। জটিল বা বিরোধপূর্ণ সম্পত্তির ক্ষেত্রে দলিল সম্পাদনের আগে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সিদ্দিকা/
