মাথাপিছু সরকারি ঋণ দেড় লাখ টাকার কাছাকাছি
নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০২৬-২৭ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণ ২৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়াতে পারে। একই সময়ে বিদেশি ঋণ পরিশোধ, ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ এবং সুদ ব্যয়ের চাপও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের সরকারি ঋণ বাড়ার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছর শেষে মাথাপিছু সরকারি ঋণের পরিমাণ দেড় লাখ টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। অর্থ বিভাগের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জুন শেষে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়াতে পারে ২৬ লাখ ৩৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা। দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৫০ লাখ ধরে হিসাব করলে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ হবে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
এদিকে, দেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণও বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে বাংলাদেশের মোট বিদেশি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বিদেশি ঋণ ও অনুদানের অর্থছাড় কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। একই সময়ে আগের ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে নতুন অর্থছাড়ের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে।
বিদেশি উৎসের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাত থেকেও সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বাড়ছে। ফলে ঋণের অর্থ কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, ভবিষ্যতে তা থেকে কতটা অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যাবে এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কতটা তৈরি হচ্ছে, সেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মাথাপিছু সরকারি ঋণ কীভাবে দেড় লাখ টাকায় পৌঁছাতে পারে?
অর্থ বিভাগের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি ২৬ লাখ ৩৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা হতে পারে। এই অঙ্ককে আনুমানিক ১৭ কোটি ৫০ লাখ জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে মাথাপিছু ঋণ দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৬০ লাখ ধরলে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ হবে প্রায় ১ লাখ ৪৯ হাজার ৬০০ টাকা। অর্থাৎ, জনসংখ্যার হিসাব অনুযায়ী অঙ্কে সামান্য পার্থক্য হলেও অর্থবছর শেষে মাথাপিছু সরকারি ঋণ দেড় লাখ টাকার কাছাকাছি থাকতে পারে।
এর আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে জানিয়েছিলেন, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশের মাথাপিছু সরকারি ঋণ ছিল ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা। অর্থ বিভাগের প্রাক্কলন বাস্তবায়িত হলে ২০২৭ সালের জুন শেষে এই গড় অঙ্ক আরও প্রায় ২১ হাজার টাকা বাড়তে পারে।
তবে মাথাপিছু ঋণ বলতে প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত ঋণ বোঝায় না। সরকারের মোট ঋণকে দেশের জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে এই গড় হিসাব করা হয়। ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের দায় মূলত সরকারের, যা বাজেটের রাজস্বসহ বিভিন্ন উৎস থেকে মেটানো হয়।
দুই বছরে সরকারি ঋণ বাড়তে পারে ২৩ শতাংশ
অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি ছিল প্রায় ২১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। ওই সময়ে ঋণের পরিমাণ ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ ছিল প্রায় ১১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশি ঋণ প্রায় ৯ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা।
অর্থ বিভাগের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছর শেষে মোট সরকারি ঋণ বেড়ে ২৬ লাখ ৩৩ হাজার ১০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। সে হিসাবে দুই বছরে ঋণের স্থিতি বাড়তে পারে প্রায় ২৩ শতাংশ।
এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে পরবর্তী অর্থবছরগুলোতেও ঋণের পরিমাণ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৭-২৮ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণ ২৯ লাখ ৫৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছর শেষে ৩৩ লাখ ৭৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
অর্থাৎ, আগামী কয়েক বছরে সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিদেশি ঋণ বেড়ে ১১৪.৯৮ বিলিয়ন ডলার
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের মোট বিদেশি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার। গত মার্চ শেষে এই পরিমাণ ছিল ১১০ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার। তিন মাসে বিদেশি ঋণ বেড়েছে ৪ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলার।
এই বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে সরকারি খাতের ঋণ থেকে। মার্চ শেষে সরকারি খাতের বিদেশি ঋণ ছিল ৯০ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলারে। অন্যদিকে, বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণ ১৯ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
২০২৫ সালের জুন শেষে দেশের মোট বিদেশি ঋণ ছিল ১১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে মোট বিদেশি ঋণ বেড়েছে ১ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার।
তবে সরকারি খাতের বিদেশি ঋণ এবং সরকারের সরাসরি বিদেশি ঋণ এক নয়। সরকারি খাতের হিসাবে সরকারের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের ঋণও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তাই এ দুটি হিসাবকে এক করে দেখা ঠিক হবে না।
বিদেশি ঋণের বেশির ভাগই দীর্ঘমেয়াদি
ঋণের মেয়াদ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে বাংলাদেশের মোট বিদেশি ঋণের ৮৭ দশমিক ৫২ শতাংশ ছিল দীর্ঘমেয়াদি। এর পরিমাণ ১০০ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার।
ঋণদাতাদের মধ্যে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ ছিল ৪৮ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার। দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতাদের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ৩২ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া বাণিজ্যিক ঋণ ছিল ১০ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ প্রায় ৫ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার।
ঋণের পরিমাণের পাশাপাশি কোন সময়ে কত অর্থ পরিশোধ করতে হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দীর্ঘমেয়াদি ঋণের কিস্তি ও স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিশোধের সময়সূচি এক নয়। বৈদেশিক মুদ্রার জোগান এবং সরকারের রাজস্ব পরিস্থিতির সঙ্গে এসব পরিশোধের সমন্বয় রাখতে হয়।
নতুন বিদেশি অর্থছাড় কমেছে ৬১ শতাংশ
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে বাংলাদেশ উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে ২৯ কোটি ৪৫ লাখ ডলার পেয়েছে।
গত অর্থবছরের একই সময়ে বিদেশি সহায়তার অর্থছাড় ছিল প্রায় ৭৫ কোটি ডলার। সে হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে অর্থছাড় কমেছে প্রায় ৬১ শতাংশ।
এই সময়ে সবচেয়ে বেশি অর্থছাড় করেছে এডিবি, প্রায় ১২ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। বিশ্বব্যাংক দিয়েছে ৭ কোটি ৩৯ লাখ ডলার এবং জাপান দিয়েছে প্রায় ৪ কোটি ডলার।
অন্যদিকে, আগের ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে একই সময়ে ব্যয় হয়েছে ৬৯ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। এর মধ্যে আসল বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ৫১ কোটি ৬০ লাখ ডলার এবং সুদ বাবদ ব্যয় হয়েছে ১৮ কোটি ২৮ লাখ ডলারের বেশি।
অর্থাৎ, নতুন অর্থছাড়ের তুলনায় ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে প্রায় ২ দশমিক ৪ গুণ অর্থ ব্যয় হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, শুধু এই দুই প্রবাহের তুলনা করলে বিদেশি সহায়তার নিট প্রবাহ প্রায় ৪০ কোটি ডলার ঋণাত্মক হয়েছে।
তবে বিদেশি সহায়তার অর্থছাড় এবং ঋণ পরিশোধের এই হিসাব দিয়ে দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। কারণ, রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয়, আমদানি ব্যয়, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগসহ আরও অনেক বিষয় বৈদেশিক লেনদেনে প্রভাব ফেলে।
ব্যাংক খাত থেকেও ঋণ নিচ্ছে সরকার
বিদেশি ঋণের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ উৎস থেকেও সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ আগস্ট পর্যন্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে সরকারের ঋণের স্থিতি ছিল ৬ লাখ ৮ হাজার ২৫ কোটি টাকা। জুন শেষে এই পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৯১ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সরকারের ঋণ জুনের শেষের ৯৪ হাজার ৫১ কোটি টাকা থেকে কমে আগস্ট শেষে ৯০ হাজার ৩২২ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
সমন্বিত হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরসহ প্রথম তিন মাসে এ ঋণ প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। ফলে অর্থবছরের শুরুতেই ব্যাংকঋণ পরিস্থিতি বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সরকারের ব্যাংকঋণ বাড়লেই বেসরকারি খাতে ঋণ কমবে, এমন নয়। তবে ব্যাংকগুলোর তহবিলের বড় অংশ সরকারি ঋণে ব্যবহৃত হলে এবং তারল্য সীমিত থাকলে বেসরকারি ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য ঋণপ্রবাহে চাপ তৈরি হতে পারে।
বাজেটের প্রায় ১৪ শতাংশ সুদ পরিশোধে
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিতে হবে। পাশাপাশি আগের ঋণের সুদ পরিশোধের জন্যও বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরে সুদ পরিশোধের জন্য প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট বাজেটের প্রায় ১৪ শতাংশ। অর্থ বিভাগের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে সরকারের সুদ ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় বাড়লে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষাসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় পরিকল্পনা প্রভাবিত হতে পারে। তবে বাস্তবে কতটা চাপ তৈরি হবে, তা রাজস্ব আদায়, ঋণের শর্ত, সুদের হার এবং সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করবে।
ঋণ ব্যবস্থাপনায় কেন সতর্কতা জরুরি?
সরকারি ঋণ অর্থনীতির জন্য সব সময় নেতিবাচক নয়। দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রকল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহন, কৃষি, শিক্ষা ও শিল্প উৎপাদনে ঋণের অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও রাজস্ব আয় বাড়তে পারে।
কিন্তু ঋণের অর্থ অপচয় হলে, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিলে কিংবা প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল না এলে ঋণ পরিশোধের দায় থেকেই যায়। তখন সুদ ও কিস্তি পরিশোধে সরকারের বাজেটের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রে ডলারের বিনিময় হারও গুরুত্বপূর্ণ। টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বাড়লে একই পরিমাণ বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে বেশি টাকা ব্যয় করতে হয়। ফলে ঋণের পরিমাণের পাশাপাশি সুদের হার, পরিশোধের সময়সীমা ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রাপ্যতাও বিবেচনায় রাখতে হয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণের ব্যবহারই গুরুত্বপূর্ণ
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, মাথাপিছু ঋণের হিসাব প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত দেনা বোঝায় না। তবে ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের দায় শেষ পর্যন্ত সরকারি বাজেটের ওপর পড়ে, আর বাজেটের অন্যতম প্রধান উৎস হলো কর ও অন্যান্য রাজস্ব আয়।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ঋণ নিয়ে সরকার কী করছে এবং সেই ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিই মূল বিবেচ্য বিষয়। ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা হলে তা ভবিষ্যতে অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে। অন্যদিকে, অপচয় ও দুর্বল প্রকল্প ব্যবস্থাপনার কারণে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া না গেলে ঋণের বোঝা বাড়লেও অর্থনৈতিক সুফল সীমিত থাকতে পারে।
বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রে বিনিময় হার, সুদের হার এবং পরিশোধের সময়সীমার গুরুত্বও তিনি তুলে ধরেছেন। ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন এই অর্থনীতিবিদ।
ঋণের চাপ সামলাতে সরকারের পরিকল্পনা
অর্থমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, সরকারি ঋণের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, সরকারি অর্থের দক্ষ ব্যবহার এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ লক্ষ্যে কর ও করবহির্ভূত রাজস্ব বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় ও কম অগ্রাধিকারের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, সরকারি সিকিউরিটিজ বাজারের উন্নয়ন এবং পরিকল্পিতভাবে ঋণ গ্রহণের উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে। অতিরিক্ত ও অপরিকল্পিত ঋণ গ্রহণ এড়াতে বার্ষিক ঋণ গ্রহণ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তা অনুসরণের বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী।
সব মিলিয়ে, আগামী অর্থবছরগুলোতে সরকারি ঋণের স্থিতি বাড়ার পূর্বাভাস থাকায় ঋণের অর্থের কার্যকর ব্যবহার, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং সময়মতো ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মাথাপিছু ঋণের অঙ্ক একা অর্থনীতির স্বাস্থ্য নির্ধারণ করে না। বরং ঋণের শর্ত, অর্থের ব্যবহার, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সরকারের রাজস্ব সক্ষমতা মিলিয়েই ঋণের প্রকৃত ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হয়।
সিদ্দিকা/
