১ জানুয়ারি থেকে বন্ধ হবে অননুমোদিত মোবাইল
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে অবৈধভাবে আমদানি করা ও শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বাজারজাত করা মোবাইল ফোন শনাক্ত করতে জাতীয় যন্ত্রপাতি শনাক্তকরণ নিবন্ধন ব্যবস্থা (এনইআইআর) পুনরায় চালুর পরিকল্পনা করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে দুই ধাপে এ কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মূল্যায়ন অনুযায়ী, অবৈধ মোবাইল ফোনের কারণে সরকার বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। এই রাজস্ব ফাঁকি বন্ধের পাশাপাশি চোরাই ফোনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং টেলিযোগাযোগ খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠাও উদ্যোগটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
এনইআইআর হলো মোবাইল ফোনের পরিচয় শনাক্ত ও নিবন্ধনসংক্রান্ত একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা। প্রতিটি হ্যান্ডসেটের আইএমইআই (IMEI) নম্বর যাচাইয়ের মাধ্যমে ফোনটির পরিচয় ও বৈধতা সম্পর্কে তথ্য যাচাই করা যায়।
এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে অবৈধভাবে আমদানি করা, চোরাই পথে আনা কিংবা শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়ে বাজারজাত করা ফোন শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে। নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী, শনাক্ত হওয়া অননুমোদিত ফোনের নেটওয়ার্ক ব্যবহার বন্ধ করার ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে এনইআইআরের মূল কার্যক্রম চালু করা হবে। বর্তমানে মোবাইল অপারেটরদের নেটওয়ার্কে সচল থাকা হ্যান্ডসেটগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধনের আওতায় আনার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া অনুমোদিত আমদানিকারক ও দেশীয় উৎপাদকদের কাছে থাকা অবিক্রিত ফোনের আইএমইআই নম্বরের তথ্যও ব্যবস্থাটিতে যুক্ত করা হবে। এতে বৈধভাবে আমদানি বা উৎপাদিত ফোনের তথ্য যাচাই সহজ হবে।
তবে প্রথম ধাপেই সব ক্লোন বা নকল আইএমইআইযুক্ত ফোন বন্ধ করা সম্ভব হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্লোন হ্যান্ডসেট পুরোপুরি বন্ধ করার ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে।
এনইআইআর চালুর দ্বিতীয় ধাপে হ্যান্ডসেটের নিবন্ধন বাতিল বা ডি-রেজিস্ট্রেশন সুবিধা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে একটি ফোনের মালিকানা পরিবর্তন ও সংশ্লিষ্ট তথ্য হালনাগাদ করা সহজ হতে পারে।
এ পর্যায়ে ফোনের প্রকৃত বা সর্বশেষ মালিক শনাক্ত করা, চুরি যাওয়া ফোনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং ক্লোন হ্যান্ডসেটসংক্রান্ত সমস্যা মোকাবিলার লক্ষ্য রয়েছে। তবে দ্বিতীয় ধাপ চালুর নির্দিষ্ট তারিখ এখনো চূড়ান্ত নয়; এ জন্য সরকারের অনুমোদন নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোবাইল অপারেটরদের নেটওয়ার্কে বর্তমানে সচল থাকা হ্যান্ডসেটগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধিত হবে। ফলে শুধু নতুন ব্যবস্থা চালুর খবর শুনে নিজের ব্যবহৃত ফোন অবৈধ ধরে নেওয়ার কারণ নেই।
তবে ফোনের বৈধতা নিয়ে সন্দেহ থাকলে কেনার রসিদ, ওয়ারেন্টি কার্ড এবং আমদানি বা বিক্রিসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংরক্ষণ করা ভালো। নতুন বা ব্যবহৃত ফোন কেনার আগে বিক্রেতার কাছ থেকে ক্রয়রসিদ নেওয়া এবং ফোনের আইএমইআই নম্বর যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিটিআরসি ২০২১ সালের ১ জুলাই পরীক্ষামূলকভাবে এনইআইআর চালু করেছিল। তবে তখন অবৈধভাবে আমদানি করা ফোন বন্ধ করা এবং ক্লোন হ্যান্ডসেট প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পুরোপুরি কার্যকর হয়নি বলে কমিশনের কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর অবৈধ হ্যান্ডসেটের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ করতে এনবিআর ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর বিটিআরসিকে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানায়। ২০২৫ সালের জুনে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এ ব্যবস্থা পুনরায় চালুর পরিকল্পনায় প্রাথমিক অনুমোদন দেয়।
২০২৬ সালের ২ জুলাই এবং ২২ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের সভাগুলোতেও এনইআইআর পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর বিষয়ে আলোচনা হয়। সর্বশেষ পরিকল্পনায় ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে দুই ধাপে কার্যক্রম শুরুর প্রস্তাব করা হয়েছে। এ জন্য সরকারের পূর্বানুমোদন চেয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এনইআইআর চালুর উদ্যোগের পাশাপাশি ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শুধু দ্বিতীয় প্রজন্মের (২জি) নেটওয়ার্ক-সমর্থিত মোবাইল হ্যান্ডসেটের ব্যবহার বন্ধে পর্যায়ক্রমিক রূপরেখা অনুমোদনের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ পরিকল্পনার আওতায় এ ধরনের ফোনের অনুমোদন, উৎপাদন, আমদানি ও বাজারজাতকরণে বিধিনিষেধ আরোপের কথা রয়েছে।
তবে এনইআইআর চালুর চূড়ান্ত নিয়ম, ফোন বন্ধের প্রক্রিয়া এবং দ্বিতীয় ধাপের সময়সূচি সম্পর্কে বিটিআরসির আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা প্রকাশিত হলে সেসব তথ্য অনুসরণ করাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হবে।
২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এনইআইআর চালুর পরিকল্পনা থাকলেও প্রথম দিন থেকেই সব অননুমোদিত বা ক্লোন ফোন বন্ধ হয়ে যাবে—এমন সিদ্ধান্ত ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ব্যবহারকারীদের উচিত ফোনের ক্রয়সংক্রান্ত কাগজপত্র সংরক্ষণ করা এবং বিটিআরসির আনুষ্ঠানিক নির্দেশনার দিকে নজর রাখা।
সিদ্দিকা/
