ওয়ারিশদের বাদ দিয়ে জমির নামজারি? যৌথ খতিয়ান ও বণ্টননামার নিয়ম জানুন
নিজস্ব প্রতিবেদক: উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির নামজারি করতে গিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন আসে, সব ওয়ারিশের নাম কি একসঙ্গে দিতে হবে? কোনো ওয়ারিশকে বাদ দিয়ে অন্যদের নামে নামজারি করা যায় কি? আবার জমি ভাগ না করেই কি যৌথ নামজারি করা সম্ভব?
বাংলাদেশে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির নামজারির ক্ষেত্রে এসব বিষয় জানা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, জমির আনুষ্ঠানিক বণ্টন না হলে যৌথ নামজারি এবং প্রত্যেক ওয়ারিশের অংশ অনুযায়ী পৃথক খতিয়ান তৈরির নিয়ম এক নয়। আবেদন করার আগে ওয়ারিশদের পরিচয়, জমির কাগজপত্র এবং মালিকানার তথ্য সঠিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সব ওয়ারিশের নাম বাদ দেওয়া যাবে কি?
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমিতে আইন অনুযায়ী যাঁরা ওয়ারিশ, তাঁদের প্রাপ্য অংশ বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কোনো ওয়ারিশের অধিকার উপেক্ষা করে পুরো জমি অন্যদের নামে নামজারি করার চেষ্টা করলে বিরোধ ও আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তবে কোনো আবেদন ভুল তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে কি না, কোনো ওয়ারিশের অংশ নিয়ে বিরোধ রয়েছে কি না এবং জমির মালিকানা কীভাবে অর্জিত হয়েছে, তা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়।
তাই নামজারির আবেদন করার আগে মৃত ব্যক্তির সব বৈধ ওয়ারিশের তালিকা তৈরি করা এবং তাঁদের পরিচয় ও প্রাপ্য অংশ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া উচিত।
জমি ভাগ না করেও কি যৌথ নামজারি করা যায়?
হ্যাঁ, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির আনুষ্ঠানিক বণ্টন না হলেও প্রযোজ্য নিয়ম অনুসরণ করে সব ওয়ারিশের নামে যৌথ নামজারির আবেদন করা যায়।
যৌথ নামজারির ক্ষেত্রে জমির সব ওয়ারিশকে সহ-অংশীদার হিসেবে রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ জন্য প্রত্যেকের অংশ আলাদা করে নির্দিষ্ট জমিখণ্ড হিসেবে ভাগ করে নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
অর্থাৎ, ওয়ারিশদের মধ্যে জমির আনুষ্ঠানিক বণ্টন না হওয়ার কারণে শুধু সেই কারণেই যৌথ নামজারির আবেদন বাতিল হওয়ার কথা নয়। তবে আবেদনকারীদের ওয়ারিশ পরিচয়, জমির রেকর্ড এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করা হবে।
পৃথক খতিয়ান করতে নিবন্ধিত বণ্টননামা লাগবে?
ওয়ারিশরা যদি জমি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে প্রত্যেকের জন্য পৃথক খতিয়ান তৈরি করতে চান, তাহলে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী বণ্টননামা প্রস্তুত ও নিবন্ধনের প্রয়োজন হতে পারে।
যৌথ নামজারি এবং পৃথক খতিয়ান তৈরির মধ্যে মূল পার্থক্য এখানেই। যৌথ নামজারিতে সব ওয়ারিশের নাম একসঙ্গে রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়। অন্যদিকে, পৃথক খতিয়ান তৈরির ক্ষেত্রে প্রত্যেকের নির্ধারিত অংশ অনুযায়ী জমির রেকর্ড আলাদা করা হয়।
বণ্টননামায় জমির পরিমাণ, দাগ নম্বর, সীমানা এবং প্রত্যেক ওয়ারিশের ভাগ স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা গুরুত্বপূর্ণ। জমি ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ থাকলে নামজারির পাশাপাশি বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হতে পারে।
ওয়ারিশ সনদ কোথা থেকে সংগ্রহ করবেন?
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির নামজারির ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদ গুরুত্বপূর্ণ নথি। সাধারণত সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এই সনদ সংগ্রহ করা যায়।
সনদে মৃত ব্যক্তির বৈধ ওয়ারিশদের নাম ও প্রয়োজনীয় পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। নামের বানান, পরিচয় বা অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র ও জমির নথিতে অমিল থাকলে আবেদন যাচাইয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
প্রয়োজন অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির মৃত্যুসনদসহ অন্যান্য নথিও জমা দিতে হতে পারে।
নামজারির আবেদনে যেসব কাগজপত্র লাগতে পারে
জমির মালিকানা কীভাবে অর্জিত হয়েছে এবং আবেদনটি যৌথ নামজারি, নাকি পৃথক খতিয়ানের জন্য করা হচ্ছে, তার ওপর প্রয়োজনীয় নথি নির্ভর করে। সাধারণভাবে নিচের কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা ভালো।
১. আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য।
২. জমির আগের খতিয়ানের কপি।
৩. জমির দাগ নম্বর, পরিমাণ ও অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য।
৪. ক্রয়সূত্রে মালিকানা হলে প্রযোজ্য নিবন্ধিত দলিলের কপি।
৫. উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদ।
৬. প্রয়োজন অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির মৃত্যুসনদ।
৭. পৃথক খতিয়ানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিবন্ধিত বণ্টননামা।
৮. সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত ফি পরিশোধের তথ্য।
৯. সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের চাওয়া অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি।
আবেদন জমা দেওয়ার আগে দলিল, খতিয়ান, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ এবং ওয়ারিশদের তথ্য মিলিয়ে নেওয়া উচিত। কাগজপত্রে অসংগতি থাকলে আবেদন নিষ্পত্তিতে দেরি হতে পারে।
অনলাইনে নামজারির আবেদন করবেন যেভাবে
জমির নামজারির আবেদন করতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি পোর্টাল ব্যবহার করা যায়। সাধারণভাবে আবেদনপ্রক্রিয়াটি এভাবে এগোয়।
প্রথম ধাপ: সরকারি ভূমি সেবা পোর্টাল "land.gov.bd" (https://land.gov.bd/) ভিজিট করুন এবং ই-নামজারি সেবা নির্বাচন করুন।
দ্বিতীয় ধাপ: নির্দেশনা অনুযায়ী আবেদন শুরু করে জমির অবস্থান, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর ও মালিকানা অর্জনের ধরনসংক্রান্ত তথ্য পূরণ করুন।
তৃতীয় ধাপ: জমি ক্রয়সূত্রে, নাকি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন, তা উল্লেখ করুন। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে সব বৈধ ওয়ারিশের তথ্য নির্ভুলভাবে দিন।
চতুর্থ ধাপ: প্রয়োজনীয় দলিল, খতিয়ান, ওয়ারিশ সনদ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি নির্দেশনা অনুযায়ী সংযুক্ত করুন।
পঞ্চম ধাপ: আবেদন জমা দিয়ে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রযোজ্য ফি পরিশোধ করুন। আবেদন নম্বর ও ট্র্যাকিং তথ্য সংরক্ষণ করুন।
ষষ্ঠ ধাপ: আবেদনের অগ্রগতি অনুসরণ করুন। সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস অতিরিক্ত তথ্য বা কাগজপত্র চাইলে নির্ধারিত নিয়মে তা জমা দিন।
আবেদনের আগে সরকারি পোর্টালে প্রকাশিত সর্বশেষ নির্দেশনা, ফি ও প্রয়োজনীয় নথির তালিকা যাচাই করে নেওয়া ভালো। জমির ধরন, কাগজপত্রের যথার্থতা এবং কোনো আপত্তি রয়েছে কি না, তার ওপর আবেদন নিষ্পত্তির সময় নির্ভর করতে পারে।
নামজারি করলেই কি জমির মালিকানা নিশ্চিত হয়?
নামজারি জমির সরকারি রেকর্ড হালনাগাদ এবং ভূমি উন্নয়ন করসংক্রান্ত কাজে গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু নামজারি হলেই জমির চূড়ান্ত মালিকানা নিয়ে সব বিরোধের অবসান হয় না।
জমির মালিকানা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নিবন্ধিত দলিল, উত্তরাধিকারসংক্রান্ত নথি, পূর্ববর্তী রেকর্ড এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণও বিবেচনায় আসতে পারে। তাই জমি কেনা বা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংরক্ষণ করা জরুরি।
বিশেষ করে ওয়ারিশদের মধ্যে জমির ভাগ নিয়ে মতবিরোধ থাকলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে আইনজীবীর সহায়তায় নিজের অধিকার ও করণীয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যেতে পারে।
মনে রাখবেন: উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমিতে যৌথ নামজারি এবং পৃথক খতিয়ান তৈরির নিয়ম আলাদা। আবেদন করার আগে সব বৈধ ওয়ারিশের তথ্য যাচাই এবং প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত রাখলে পরবর্তী জটিলতা এড়ানো সহজ হতে পারে।
আশা/
