জমির নামজারি করতে দলিলের পাশাপাশি আর কী কী কাগজ লাগে
নিজস্ব প্রতিবেদক: জমি কেনার পর নিজের নামে নামজারি করতে শুধু রেজিস্ট্রি দলিল থাকলেই সব ক্ষেত্রে চলে না। জমির মালিকানা কীভাবে অর্জিত হয়েছে, আগের খতিয়ানে কার নাম রয়েছে এবং জমিটি উত্তরাধিকার, ক্রয় নাকি অন্য কোনো সূত্রে পাওয়া হয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে অতিরিক্ত কাগজপত্র লাগতে পারে। তাই নামজারির আবেদন করার আগে প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত রাখা জরুরি।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি নির্দেশনা ও সরকারি ভূমি অফিসের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দলিলের পাশাপাশি জমির খতিয়ান, ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা, আবেদনকারীর পরিচয়পত্র এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদসহ অন্যান্য কাগজপত্র প্রয়োজন হতে পারে।
নামজারির জন্য দলিলের পাশাপাশি যেসব কাগজ লাগতে পারে
১. জমির খতিয়ান বা পর্চা
জমির সর্বশেষ প্রযোজ্য খতিয়ানের কপি প্রস্তুত রাখতে হবে। জমির ধরন ও রেকর্ডের অবস্থা অনুযায়ী সিএস, এসএ, আরএস, বিএস বা বিআরএস খতিয়ানের তথ্য প্রয়োজন হতে পারে। আগে নামজারি হয়ে থাকলে সর্বশেষ নামজারি খতিয়ানের কপিও লাগতে পারে।
২. ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা
জমির হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধের রসিদ সঙ্গে রাখা উচিত। এতে জমির পরিচিতি ও কর পরিশোধের তথ্য যাচাই করা সহজ হয়।
৩. জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি
আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি প্রয়োজন হতে পারে। দলিল, খতিয়ান ও পরিচয়পত্রে নামের বানান বা অন্যান্য তথ্যে অমিল থাকলে তার ব্যাখ্যা ও সমর্থনে অতিরিক্ত প্রমাণক চাওয়া হতে পারে।
৪. বায়া বা পূর্ববর্তী মালিকানার দলিল
শুধু বর্তমান দলিল নয়, মালিকানা কীভাবে আগের মালিক থেকে বর্তমান মালিকের কাছে এসেছে, তা যাচাইয়ের জন্য পূর্ববর্তী হস্তান্তরের দলিল বা বায়া দলিলের কপিও প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে জমির মালিকানার ধারাবাহিকতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এসব নথি গুরুত্বপূর্ণ।
৫. ওয়ারিশ সনদ ও মৃত্যুসনদ
উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পেলে ওয়ারিশ সনদ প্রয়োজন হতে পারে। সংশ্লিষ্ট মালিক মারা গিয়ে থাকলে তাঁর মৃত্যুসনদও প্রাসঙ্গিক হতে পারে। উত্তরাধিকারীদের অংশ ও মালিকানার তথ্য যাচাইয়ের জন্য অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া হতে পারে।
৬. জমির চৌহদ্দিসহ নকশা
জমির অবস্থান, দাগ নম্বর, পরিমাণ ও চারপাশের সীমানা শনাক্ত করার জন্য চৌহদ্দিসহ হাতে আঁকা নকশা বা কলমি নকশা প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে জমির পরিচিতি বা সীমানা নিয়ে অস্পষ্টতা থাকলে এটি কাজে আসে।
৭. আদালতের রায়, আদেশ বা ডিক্রি
আদালতের রায়, আদেশ বা ডিক্রির ভিত্তিতে জমির মালিকানা অর্জিত হলে সংশ্লিষ্ট কাগজের সার্টিফায়েড কপি প্রয়োজন হতে পারে। মামলার ধরন অনুযায়ী অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথিও লাগতে পারে।
৮. পাসপোর্ট সাইজের ছবি ও অন্যান্য তথ্য
কিছু সরকারি ভূমি অফিসের নাগরিক সনদে আবেদনকারীর সাম্প্রতিক পাসপোর্ট সাইজের ছবি চাওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। আবেদন করার সময় জমির মৌজা, খতিয়ান ও দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ এবং আবেদনকারীর যোগাযোগের তথ্যও সঠিকভাবে দিতে হবে।
জমি কেনা ও উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির কাগজ কি এক?
না। জমি কেনার ক্ষেত্রে নিবন্ধিত বিক্রয় দলিল, পূর্ববর্তী মালিকানার দলিল, খতিয়ান ও ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অন্যদিকে, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদসহ উত্তরাধিকার প্রমাণের নথি প্রয়োজন হতে পারে। আদালতের রায় বা অন্য কোনো বৈধ সূত্রে জমি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রমাণকও দিতে হতে পারে।
তাই অন্য কারও কাছ থেকে পাওয়া কাগজের তালিকা হুবহু অনুসরণ না করে নিজের জমির মালিকানার ধরন অনুযায়ী নথি প্রস্তুত করা ভালো।
অনলাইনে নামজারির আবেদন করবেন যেভাবে
বাংলাদেশে ই-নামজারির আবেদন ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি মিউটেশন পোর্টালের মাধ্যমে করা যায়। আবেদন করার সময় প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র স্ক্যান করে নির্ধারিত নিয়মে আপলোড করতে হয়। সরকারি নির্দেশনায় স্ক্যান করা নথি পিডিএফ (PDF) ফরম্যাটে আপলোড করার কথা বলা হয়েছে।
সরকারি পোর্টাল: https://mutation.land.gov.bd/
আবেদন করার আগে যে বিষয়গুলো যাচাই করবেন
নামজারির আবেদন করার আগে দলিল, খতিয়ান ও দাখিলায় জমির মৌজা, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ এবং মালিকের নাম মিলিয়ে দেখা উচিত। কোনো তথ্যে অমিল থাকলে সেটি গোপন না করে প্রয়োজনীয় প্রমাণক প্রস্তুত রাখুন। জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ বা নথিতে জটিলতা থাকলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয় থেকে নির্দেশনা নেওয়া যেতে পারে।
মনে রাখতে হবে, সব জমির জন্য একই ধরনের কাগজপত্র বাধ্যতামূলক নয়। জমির মালিকানা অর্জনের পদ্ধতি ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ড অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নথির তালিকা ভিন্ন হতে পারে। আবেদন করার আগে সরকারি ই-নামজারি নির্দেশিকা দেখে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।
সোহাগ/
