পে স্কেল বাস্তবায়ন হচ্ছে, বাড়তি টাকার জোগান দেবে কে
নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গে নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন এবং বকেয়া অর্থ পরিশোধ করা হতে পারে। এতে সরকারের নিয়মিত ব্যয়ের ওপর তৈরি হবে বাড়তি চাপ।
রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়া, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয় এবং বিদেশি ঋণের তুলনায় ঋণ পরিশোধের চাপের কারণে সরকারের অর্থের চাহিদা বেড়েছে। ফলে ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের ঘাটতি মেটাতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর, বিশেষ করে ব্যাংকব্যবস্থার ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।
তবে সরকারের ব্যাংকঋণ নিয়ে আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। ট্রেজারি বিল ও বন্ডের নিলামে সরকার যে পরিমাণ অর্থ তোলে, সেটিই সরকারের নিট ঋণ নয়। নিলামে তোলা অর্থের বড় একটি অংশ আগের ঋণ পরিশোধ কিংবা পুরোনো ঋণ নবায়নে, অর্থাৎ রোলওভারে চলে যায়। তাই নিলামে তোলা মোট অর্থের পরিমাণ দেখেই সরকারের প্রকৃত ঋণের চাপ বোঝা যায় না।
তারপরও নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের সময় ব্যাংকনির্ভরতা বাড়া এবং এর ফলে ভবিষ্যতে সুদ পরিশোধের ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা।
অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের নিলামের মাধ্যমে সরকার ৫৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। কিন্তু ওই মাসে সরকারের নিট ব্যাংকঋণ ছিল প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
অর্থাৎ নিলামে তোলা ৫৬ হাজার কোটি টাকার পুরোটাই নতুন ব্যয় মেটাতে ব্যবহার হয়নি। এর বড় অংশ গেছে আগের ঋণ পরিশোধ ও পুরোনো ঋণ নবায়নে।
তাই সরকারের প্রকৃত ঋণের চাপ বুঝতে হলে শুধু নিলামে কত টাকা তোলা হয়েছে তা দেখলে হবে না, পাশাপাশি দেখতে হবে নিট ঋণের পরিমাণও।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। অথচ গত অর্থবছরের একই সময়ে সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে নিট ৯ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা পরিশোধ করেছিল।
অর্থাৎ আগের অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের শুরুতেই সরকারের ব্যাংকঋণের চিত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে।
সরকারের ব্যাংকঋণের সর্বশেষ তথ্যেও পরিবর্তনের আরেকটি দিক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নতুন ঋণের বড় অংশ এখন আসছে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে।
আগস্ট শেষে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সরকারের ঋণ ১৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৮ হাজার ২৬ কোটি টাকা। বিপরীতে একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ ৩ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা কমে ৯০ হাজার ৩২৩ কোটি টাকায় নেমে আসে।
আরও সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সরকারের ঋণ বেড়েছে ২৬ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা। এতে এসব ব্যাংকে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ১৮ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা।
অন্যদিকে অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ ৭৮৮ কোটি টাকা কমেছে।
অর্থাৎ সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের নতুন ঋণের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে বাণিজ্যিক ব্যাংক।
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের নিয়মিত বেতন-ভাতার পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে। চলতি মাসের বেতনের সঙ্গে বকেয়া অর্থও পরিশোধের পরিকল্পনা থাকলে এই চাপ আরও বাড়তে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয়। আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়ায় সরকারের নিজস্ব আয় দিয়ে সব ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশি ঋণের ছাড়ের তুলনায় ঋণ পরিশোধ বেশি হওয়ায় বৈদেশিক উৎস থেকেও কাঙ্ক্ষিত অর্থ আসছে না। ফলে সরকারের আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান মেটাতে অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ১০৭ কোটি টাকা।
এর আগের প্রান্তিকে নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ পরিকল্পনা অনুযায়ী নিট ঋণ নেওয়ার গতি কিছুটা কমতে পারে।
তবে একই সময়ে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের ব্যয়ের চাপ বাড়ছে। ফলে নিট ঋণের লক্ষ্যমাত্রা কমলেও ব্যাংকব্যবস্থা থেকে অর্থ সংগ্রহের প্রয়োজন থাকছে।
এখানেই সরকারের অর্থ ব্যবস্থাপনার বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে রাজস্ব আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে আয়-ব্যয়ের ব্যবধান সামাল দিতে ঋণনির্ভরতা অব্যাহত রাখার চাপ তৈরি হচ্ছে।
সরকার ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিলেও বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বর্তমানে তুলনামূলক কম। বিনিয়োগের গতি দুর্বল থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন ঋণের চাহিদাও কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬২ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে ব্যাংকগুলোর হাতে তুলনামূলক বেশি তারল্য রয়েছে।
এ অবস্থায় সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিলেও তাৎক্ষণিকভাবে বেসরকারি খাতে ঋণের জোগানে বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একজন ব্যাংকার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকায় সরকারের ঋণ নেওয়ার কারণে তাৎক্ষণিক বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম। ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা অতিরিক্ত তারল্য থেকেই সরকারের ঋণের বড় অংশের জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।’
সরকারের জন্য প্রশ্নটি শুধু এখন টাকা পাওয়া নিয়ে নয়। এই ঋণের সুদ ও আসল ভবিষ্যতে কীভাবে পরিশোধ করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের ঋণের স্থিতি যত বাড়বে, সুদ পরিশোধের ব্যয়ও তত বাড়বে। বিশেষ করে রাজস্ব আয় যদি ঋণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে না বাড়ে, তাহলে বাজেটে সুদ পরিশোধের অংশ আরও বড় হয়ে উঠতে পারে।
এর প্রভাব পড়তে পারে সরকারের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতেও। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ করা অর্থের ওপর বাড়তে পারে চাপ।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ বাড়ার অর্থ হলো সরকারি কোষাগারে তারল্যের চাপ রয়েছে। রাজস্ব আয় বাড়ানো না গেলে এবং ব্যয়ের লাগাম টানা না গেলে ঋণনির্ভরতা কমানো কঠিন হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান অবশ্য মনে করেন, সরকারের ঋণ নেওয়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। এ নিয়ে এখনই উদ্বেগের পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তবে তিনি রিজার্ভ মানির দ্রুত প্রবৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ করে মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের দিকেও নজর রাখার কথা বলেছেন।
বর্তমান বাস্তবতায় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়া আপাতত সামাল দেওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসই সমাধান নয়। কারণ ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ একসময় সুদসহ পরিশোধ করতে হবে।
পে স্কেল বাস্তবায়ন, বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং অন্যান্য সরকারি ব্যয়ের চাপ সামলাতে সরকারকে একদিকে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে হবে, অন্যদিকে বাড়াতে হবে রাজস্ব আয়।
বিশেষ করে করের আওতা বাড়ানো, কর ফাঁকি কমানো এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। তা না হলে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো কঠিন হবে। আজকের ঋণ তখন আগামী দিনের সুদব্যয়ের চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
ফলে পে স্কেল বাস্তবায়নের অর্থ সরকার আপাতত ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সংগ্রহ করতে পারলেও মূল প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, এই ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি হবে কীভাবে?
সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু বাড়তি অর্থের জোগান দেওয়া নয়, বরং এমনভাবে অর্থের সংস্থান করা, যাতে বর্তমান ব্যয়ের চাপ সামলাতে গিয়ে ভবিষ্যতের ঋণ ও সুদব্যয়ের বোঝা আরও ভারী না হয়।
সোহাগ/
