বাংলাদেশে যে ১০ ধরনের অর্থনীতিতে ঝুঁকি বেশি
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে ১০ ধরনের ঝুঁকি রয়েছে বলে জানিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটির সর্বশেষ প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়া এবং বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলে আরও বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কাকে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন বিধিনিষেধ, বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া এবং ডলারের বিপরীতে টাকার ওপর চাপ অব্যাহত থাকার বিষয়েও সতর্ক করেছে এডিবি। ব্যাংক খাতে নতুন সংকট, রাজস্ব সংস্কারে বিলম্ব, প্রত্যাশার তুলনায় কম উন্নয়ন ব্যয় এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগও অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এডিবির ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক সেপ্টেম্বর ২০২৬’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির এসব ঝুঁকি তুলে ধরা হয়েছে।
এডিবির মতে, এসব ঝুঁকি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির ধারায় চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপও আরও কিছু সময় অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস
এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশ হতে পারে। সংস্থাটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হিসেবে অনুমান করেছে। অর্থাৎ, চলতি অর্থবছরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কিছুটা গতি ফেরার প্রত্যাশা রয়েছে।
এডিবি বলছে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমলে মানুষের ভোগব্যয় ও বিনিয়োগ বাড়তে পারে। এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং অন্যান্য কাঠামোগত বাধা বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে ১০ ঝুঁকি
এডিবির প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য প্রধান ঝুঁকিগুলো হলো—
১. মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া
২. আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও বেড়ে যাওয়া
৩. বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলে নতুন করে বিঘ্ন সৃষ্টি
৪. আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ
৫. বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া
৬. ডলারের বিপরীতে টাকার ওপর চাপ অব্যাহত থাকা
৭. ব্যাংক খাতে নতুন সংকট তৈরি হওয়া
৮. রাজস্ব সংস্কার বাস্তবায়নে বিলম্ব
৯. প্রত্যাশার তুলনায় উন্নয়ন ব্যয় কম হওয়া
১০. জলবায়ুজনিত দুর্যোগের প্রভাব বাড়া
মূল্যস্ফীতি নিয়েও সতর্কতা
এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশে উঠতে পারে। এর আগের অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭ শতাংশে নামার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে সম্ভাব্য বিঘ্ন মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এল নিনোর প্রভাবে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়তে পারে
চলতি হিসাবের ভারসাম্য নিয়েও সতর্ক করেছে এডিবি। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের চলতি হিসাবের ঘাটতি জিডিপির শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশে উঠতে পারে।
রপ্তানির তুলনায় আমদানি বাড়লে এ ঘাটতি আরও বাড়ার চাপ তৈরি হতে পারে বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
সংস্কারের ওপর জোর এডিবির
এডিবি বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া শুরু হলেও তা এখনো ঝুঁকিমুক্ত নয়। সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ব্যবসার পরিবেশে সংস্কার দ্রুত এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
সংস্থাটির মতে, এসব ক্ষেত্রে কার্যকর সংস্কার হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যাগুলো মোকাবিলা করা গেলে অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে, এডিবির সেপ্টেম্বরের পূর্বাভাসে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কিছুটা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা থাকলেও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য, ব্যাংক খাত, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ ও জলবায়ুজনিত ঝুঁকিকে সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়েছে।
সোহাগ/
