১২ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ: সাফল্য কতটা, ব্যর্থতা কতটা
নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে শপথ নেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। প্রায় আঠারো মাস দায়িত্ব পালনের পর এখন তাঁর সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে এই সরকারের বিদায় নেওয়ার কথা রয়েছে। ফলে তাদের কার্যক্রমের মূল্যায়ন এখন সময়োপযোগী প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
সরকারের ঘোষিত তিন লক্ষ্য
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সরকার তিনটি প্রধান এজেন্ডার কথা বলে আসছে—
১. সংবিধানসহ রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় সংস্কার,
২. জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ বিচার,
৩. নির্ধারিত রূপরেখা অনুযায়ী একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন।
সরকারের দাবি, এই তিন ক্ষেত্রেই তারা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, অগ্রগতি থাকলেও নানা সীমাবদ্ধতা ও বিতর্ক এই সাফল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
সংস্কার: অগ্রগতি না পথভ্রষ্টতা?
অন্তর্বর্তী সরকার শুরুতেই রাষ্ট্রসংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে ১১টি কমিশন গঠন করে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে অন্তত ৩০টি বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
সরকার মনে করছে, বহুদলীয় ঐকমত্য গড়ে তোলাই তাদের বড় অর্জন। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের মতে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এত স্বল্প সময়ে এত ব্যাপক সংস্কার উদ্যোগ আগে দেখা যায়নি।
তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, সংস্কার প্রক্রিয়া “পিক অ্যান্ড চুজ” ও “এডহক” পদ্ধতির শিকার হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু খাতে কমিশনই গঠন হয়নি, আবার কিছু ক্ষেত্রে সরকারের ভেতরের প্রভাবশালী অংশের কারণে সুপারিশ বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়েছে। ফলে সংস্কারের ধারাবাহিকতা ও গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
বিচার: ন্যায়বিচার নাকি প্রতিশোধ?
সরকারের আরেকটি বড় প্রতিশ্রুতি ছিল ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার’। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এক মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। আরও শতাধিক মামলার বিচার প্রক্রিয়া চলছে।
সরকারের দাবি, গুম-খুনের বিচার শুরু হওয়া এবং সেনা কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনা বড় সাফল্য। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, ঢালাও মামলা, সাংবাদিক-শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষকে আসামি করা এবং প্রশ্নবিদ্ধ আটক—এসবের কারণে ‘বিচার নাকি প্রতিশোধ’—এই প্রশ্ন উঠেছে। তারা মনে করেন, আরও স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে বিতর্ক এড়ানো যেত।
আইন-শৃঙ্খলা ও মব সংস্কৃতি
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো ‘মব সন্ত্রাস’। দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, এমনকি প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলার ঘটনা গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৪ মাসে অন্তত ৪০টি বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ এসেছে। অজ্ঞাতনামা লাশ ও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাও বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরকার বলছে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ছিল কঠিন চ্যালেঞ্জ। তবে পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারত—সরকারি পদক্ষেপে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা গেছে। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বেশিরভাগ ঘটনাই রাজনৈতিক, ধর্মীয় নয়—এমন দাবিও সরকারের।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কাছে সরকার নতি স্বীকার করেছে, যার ফলে সামাজিক নিরাপত্তা দুর্বল হয়েছে।
নারীর অধিকার ও সামাজিক পরিস্থিতি
নারীর সমতা ও অধিকার নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নারী সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন ঘিরে বিতর্ক, বিভিন্ন স্থানে নারী হেনস্তা এবং সহিংসতার ঘটনায় সরকারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
অধ্যাপক ইউনূস নিজেই এক অনুষ্ঠানে নারীর ওপর হামলাকে ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর স্বপ্নের পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে কি না—তা নিয়ে সন্দেহ রয়ে গেছে।
অর্থনীতি: কিছুটা স্বস্তি, কিছুটা চাপ
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সরকার তুলনামূলক ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। সরকারের দাবি, দায়িত্ব নেওয়ার সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ১৪ বিলিয়ন ডলার, যা বেড়ে ২৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে। দুর্বল ব্যাংক একীভূত করা এবং আর্থিক খাতে সংস্কার উদ্যোগ নেওয়াও ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
তবে মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে। ২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৮.৭৭ শতাংশ। খাদ্যমূল্য, বিশেষ করে চালের দাম কমেনি—এ নিয়ে অর্থনীতিবিদদের সমালোচনা রয়েছে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, তিনটি ক্ষেত্রে—অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক—এর মধ্যে সরকার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় তুলনামূলক ভালো করেছে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নির্বাচন আয়োজনের পথে এগোনোও সাফল্য। তবে সামাজিক ক্ষেত্রে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যম
সরকারের দাবি, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার হয়েছে। তবে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল এবং সংবাদপত্রে হামলার ঘটনায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সরকার বলছে, প্রাথমিক কিছু ভুল সিদ্ধান্ত ছাড়া গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হয়নি; বরং উন্নতি হয়েছে। কিন্তু সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীরা একে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত হিসেবে দেখছেন।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
অধ্যাপক ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার এক অস্থির ও সংকটময় সময়ে দায়িত্ব নিয়েছিল। সংস্কার ও নির্বাচনের পথে অগ্রসর হওয়া এবং অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা আনাকে তাদের সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মব সংস্কৃতি, সংখ্যালঘু ও নারীর নিরাপত্তা এবং বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়ে গেছে।
আগামী নির্বাচনের ফল এবং গণভোটের রায়ই নির্ধারণ করবে—এই সরকারের উদ্যোগগুলো কতটা স্থায়ী প্রভাব ফেলবে। তবে ইতোমধ্যে স্পষ্ট, এই আঠারো মাস বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে থাকবে।
সোহাগ/
আপনার জন্য নির্বাচিত নিউজ
- মার্কশিটসহ এসএসসি পরীক্ষার ফল দেখুন এক ক্লিকে
- প্রতিদিনের ব্যবহারে Honda SP 125 কেন এত জনপ্রিয়
- ১০ থেকে ১৬ আগস্ট: এক সপ্তাহে আসছে ৫ নতুন স্মার্টফোন
- প্রকাশ হল এসএসসি পরীক্ষার ফল; একক্লিকে ফল দেখুন এখানে
- SSC Result 2026: ফল দেখুন এখানে
- Xiaomi launches Redmi 17, থাকছে ৭,৫০০mAh ব্যাটারি ও ১২০Hz ডিসপ্লে
- ২ লাখ টাকার মধ্যে বাংলাদেশে ১০টি জনপ্রিয় বাইক, দাম ও মাইলেজ
- Yamaha MT-15 V2 2026: নতুন ৬ রঙে আরও আকর্ষণীয় স্পোর্টস বাইক
- ৭৫০০mAh ব্যাটারি নিয়ে বাজারে এলো Redmi 17 5G ও 4G
- ২ লাখ টাকার মধ্যে বাংলাদেশে ৫টি ১২৫ সিসির বাইক, মাইলেজ ও দাম
- আজকের স্বর্ণের বাজারদর: ১০ আগস্ট ২০২৬
- ২০২৬ সালে ২ হাজার টাকার মধ্যে সেরা ৫টি ৪জি বাটুন ফোন
- আজকের সকল দেশের টাকার রেট: ০৯ আগস্ট ২০২৬
- আজ এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট; যেভাবে জানবেন ফল
- এসএসসি পরীক্ষা ২০২৬; এক ক্লিকে ফল দেখুন এখানে
