গ্রাম সরকার চালুর খসড়া প্রকাশ, প্রতি ওয়ার্ডে থাকবেন ১৭ সদস্য
নিজস্ব প্রতিবেদক: গ্রামীণ এলাকার উন্নয়ন, স্থানীয় সমস্যা সমাধান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আবারও ‘গ্রাম সরকার’ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘গ্রাম সরকার আইন, ২০২৬’-এর একটি খসড়া তৈরি করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ডে ১৭ সদস্যের একটি করে গ্রাম সরকার গঠন করা হবে।
তবে এখনই এই ব্যবস্থা চালু হচ্ছে না। স্থানীয় সরকার বিভাগের ওয়েবসাইটে খসড়া আইনটি প্রকাশ করে নাগরিকদের মতামত চাওয়া হয়েছে। বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত খসড়ার বিষয়ে মতামত দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। মতামত পর্যালোচনার পর আইনটির খসড়া চূড়ান্ত করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানোর কথা রয়েছে।
প্রতি ওয়ার্ডে যেভাবে গঠিত হবে গ্রাম সরকার
প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন প্রধান, একজন উপদেষ্টা এবং ১৫ জন সদস্য নিয়ে মোট ১৭ সদস্যের গ্রাম সরকার গঠন করা হবে।
সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য গ্রাম সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। আর সংরক্ষিত আসনের নারী ইউপি সদস্য হবেন উপদেষ্টা।
১৫ সদস্যের মধ্যে থাকবেন দুজন গণ্যমান্য ব্যক্তি বা সমাজসেবক, দুজন কৃষক, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর একজন পুরুষ ও একজন নারী সদস্য। এ ছাড়া নিকাহ রেজিস্ট্রার, সমবায় সমিতির সদস্য, পল্লিচিকিৎসক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, শ্রমিক ও যুব প্রতিনিধি থাকবেন। সংশ্লিষ্ট এলাকায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ থাকলে তাঁদের একজন প্রতিনিধিকেও অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।
খসড়ায় বলা হয়েছে, ওয়ার্ডের ভোটার তালিকায় নাম থাকা ভোটারদের অন্তত ১০ শতাংশের উপস্থিতিতে পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে হ্যাঁ-না ভোটের মাধ্যমে সদস্য নির্বাচন করা হবে। গ্রাম সরকারের মেয়াদ হবে প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার দিন থেকে পাঁচ বছর।
গ্রাম সরকারের দায়িত্ব কী কী?
প্রস্তাবিত আইনে গ্রাম সরকারের কাজের পরিধি বেশ বিস্তৃত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি, রাস্তাঘাট ও কালভার্ট নির্মাণের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি ও আর্থিক বিষয় পর্যালোচনা।
এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন, সন্ত্রাস, চুরি, মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখার কথা বলা হয়েছে।
গ্রাম সরকারের প্রস্তাবিত অন্যান্য দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে:
-
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা কার্যক্রমে সহায়তা করা।
-
শিশুদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়া।
-
পরিবার পরিকল্পনা, পুষ্টি ও টিকাদান কর্মসূচিতে সহায়তা করা।
-
নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে কাজ করা।
-
কৃষি উপকরণের সংকট সম্পর্কে ইউনিয়ন পরিষদ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো।
-
স্থানীয় বিরোধ মীমাংসায় উদ্যোগ নেওয়া।
-
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও সরকারি সহায়তা বিতরণে সহযোগিতা করা।
-
পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করা।
খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, গ্রাম সরকার ইউনিয়ন পরিষদের সহায়ক সংগঠন হিসেবে কাজ করবে। স্থানীয় উন্নয়ন ও বিভিন্ন কার্যক্রমের বিষয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
সদস্যদের সম্মানী নিয়ে কী বলা হয়েছে?
প্রস্তাবিত খসড়ায় গ্রাম সরকারের সদস্যদের জন্য নির্দিষ্ট সম্মানী বা ভাতার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বিধান উল্লেখ নেই। ফলে সদস্যরা দায়িত্ব পালনের জন্য আর্থিক সুবিধা পাবেন কি না, সেটি এখনো পরিষ্কার নয়।
এ বিষয়ে চূড়ান্ত আইন বা পরবর্তী সরকারি সিদ্ধান্তে কী বলা হয়, তা দেখার বিষয়। কারণ সারা দেশে প্রতিটি ওয়ার্ডে ১৭ সদস্যের কাঠামো বাস্তবায়ন করা হলে বিপুলসংখ্যক মানুষ এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হবেন।
দণ্ডিত ব্যক্তিদের সদস্য হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন
খসড়া আইনের সদস্য হওয়ার অযোগ্যতা-সংক্রান্ত ৯ নম্বর ধারায় নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে অন্তত এক বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তির বিষয়ে বিধান রাখা হয়েছে। কারাদণ্ড ভোগের পর পাঁচ বছর পার না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সদস্য হওয়ার যোগ্য হবেন না।
অর্থাৎ, এই ধারার ভাষা অনুযায়ী এক বছরের কম কারাদণ্ডের ক্ষেত্রে একই অযোগ্যতার শর্ত সরাসরি প্রযোজ্য নয়। বিষয়টি নিয়ে আইন ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন রয়েছে। তাঁদের মতে, গ্রাম সরকার স্থানীয় বিরোধ মীমাংসা ও সামাজিক সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখলে সদস্যদের যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
পরীক্ষামূলকভাবে চালুর পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের
বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, সারা দেশে একসঙ্গে গ্রাম সরকার চালুর আগে কয়েকটি এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এতে বাস্তবে কী ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে, দায়িত্ব পালনে কতটা কার্যকারিতা পাওয়া যাচ্ছে এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ কেমন হচ্ছে, তা যাচাই করা সম্ভব হবে।
তবে সরকার পরীক্ষামূলকভাবে চালু করবে, নাকি দেশব্যাপী বাস্তবায়নের দিকে যাবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
কবে চালু হতে পারে গ্রাম সরকার?
‘গ্রাম সরকার আইন, ২০২৬’ এখনো খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ নাগরিকদের মতামত চেয়েছে। মতামত পর্যালোচনা, খসড়া চূড়ান্তকরণ এবং পরবর্তী আইনগত ও সরকারি অনুমোদনের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে বলা যাবে না।
তাই গ্রাম সরকার কবে থেকে কাজ শুরু করবে, সদস্য নির্বাচন কীভাবে হবে এবং তাঁদের সম্মানী নির্ধারিত হবে কি না, এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সরকারি ঘোষণা ও আইন প্রণয়নের পরবর্তী ধাপের অপেক্ষা করতে হবে।
সোহাগ/
