কোনো ওয়ারিশ বিদেশে থাকলে জমির বণ্টন ও রেজিস্ট্রেশন করবেন যেভাবে
নিজস্ব প্রতিবেদক: পরিবারের জমি ভাগাভাগি বা ওয়ারিশি সম্পত্তির বণ্টন করতে গিয়ে একজন ওয়ারিশ বিদেশে থাকলে অনেকেই সমস্যায় পড়েন। তাঁর স্বাক্ষর কীভাবে নেওয়া হবে, তিনি দেশে না এলে বণ্টননামা দলিল রেজিস্ট্রি করা যাবে কি না, কিংবা অন্য কাউকে দিয়ে জমির কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে তৈরি হয় নানা প্রশ্ন।
তবে কোনো ওয়ারিশ বিদেশে থাকলেই জমির বণ্টন বা নামজারি বন্ধ হয়ে যায় না। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিদেশে থাকা ওয়ারিশও সম্পত্তি বণ্টনে অংশ নিতে পারেন। তিনি চাইলে নিজে দেশে এসে দলিলে স্বাক্ষর করতে পারেন, আবার নির্দিষ্ট কাউকে আমমোক্তারনামা বা পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে দায়িত্বও দিতে পারেন।
এ ক্ষেত্রে প্রথমেই বুঝতে হবে, সব ওয়ারিশের নামে যৌথ নামজারি করা এবং প্রত্যেকের অংশ আলাদা করে পৃথক খতিয়ান তৈরি করা এক বিষয় নয়। দুই প্রক্রিয়ার নিয়মও আলাদা।
প্রথমে নির্ধারণ করুন, যৌথ নামজারি নাকি আলাদা বণ্টন চান
কোনো ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর তাঁর জমি আইন অনুযায়ী ওয়ারিশদের মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে যায়। প্রত্যেক ওয়ারিশের প্রাপ্য অংশ নির্ধারিত হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী।
সব ওয়ারিশ যদি আপাতত একই খতিয়ানে নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে চান, তাহলে উত্তরাধিকার সনদসহ যৌথ নামজারির আবেদন করা যায়। এ ক্ষেত্রে জমি আলাদা করে ভাগ করার বণ্টননামা দলিল প্রয়োজন হয় না।
অন্যদিকে, প্রত্যেক ওয়ারিশ যদি নির্দিষ্ট দাগ বা জমির নির্দিষ্ট অংশ আলাদাভাবে নিজের নামে নিতে চান, তাহলে সব ওয়ারিশের সম্মতিতে আপস বণ্টন করতে হবে। এরপর বণ্টননামা দলিল তৈরি ও রেজিস্ট্রি করে পৃথক নামজারির আবেদন করতে হবে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, উত্তরাধিকারীদের যৌথ নামজারির আবেদন বণ্টননামা দলিল না থাকার কারণে বাতিল করা উচিত নয়। তবে আলাদা আলাদা খতিয়ান করতে হলে নিবন্ধিত বণ্টননামার ভিত্তিতে নামজারি করতে হবে।
বিদেশে থাকা ওয়ারিশ কীভাবে বণ্টননামায় অংশ নেবেন?
বিদেশে থাকা ওয়ারিশের জন্য মূলত দুটি পথ রয়েছে।
১. নিজে দেশে এসে দলিলে স্বাক্ষর করা
বিদেশে থাকা ওয়ারিশ দেশে আসতে পারলে অন্য ওয়ারিশদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জমির ভাগ নির্ধারণ করতে পারেন। সবাই সম্মত হলে বণ্টননামা দলিল তৈরি করে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রির ব্যবস্থা করা যায়।
২. আমমোক্তারনামার মাধ্যমে প্রতিনিধি নিয়োগ
ওয়ারিশ দেশে আসতে না পারলে তিনি বাংলাদেশে অবস্থানরত কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে আমমোক্তার বা প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন। এ জন্য বিদেশে বসেই নির্দিষ্ট ক্ষমতা উল্লেখ করে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি তৈরি ও প্রয়োজনীয় সত্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। শুধু সাধারণভাবে জমি দেখাশোনা বা পরিচালনার ক্ষমতা দেওয়া যথেষ্ট নাও হতে পারে। প্রতিনিধি যেন বণ্টননামায় স্বাক্ষর, দলিল সম্পাদন, রেজিস্ট্রেশন এবং প্রয়োজনীয় ভূমি অফিসের কাজ করতে পারেন, সে ক্ষমতা দলিলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা উচিত।
বিদেশ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি তৈরি করবেন যেভাবে
বিদেশে থাকা ওয়ারিশ বাংলাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ করতে চাইলে সাধারণত সংশ্লিষ্ট দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলার অফিসের মাধ্যমে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সত্যায়নের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
সাধারণভাবে করণীয় ধাপগুলো হলো:
১. জমির বিবরণ ও কী কী কাজের ক্ষমতা দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করে পাওয়ার অব অ্যাটর্নির খসড়া তৈরি করতে হবে।
২. ক্ষমতাদাতা ও ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিচয় এবং ঠিকানার তথ্য সঠিকভাবে উল্লেখ করতে হবে।
৩. সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলার অফিসের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী আবেদন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হবে।
৪. দূতাবাসের নিয়ম অনুযায়ী ক্ষমতাদাতাকে সশরীরে উপস্থিত হয়ে স্বাক্ষর করতে হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে নোটারি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সত্যায়নের বিকল্প পদ্ধতি থাকতে পারে। এটি দেশ ও দূতাবাসভেদে যাচাই করতে হবে।
৫. দূতাবাসের সত্যায়ন সম্পন্ন হলে মূল পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বাংলাদেশে পাঠাতে হবে।
৬. দেশে আসার পর সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রমাণীকরণ, প্রয়োজনীয় স্ট্যাম্প শুল্ক পরিশোধ এবং সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, বিদেশে তৈরি পাওয়ার অব অ্যাটর্নি শুধু দূতাবাসে সত্যায়ন করালেই সব ক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য হয়ে যায় না। দেশে ব্যবহারের আগে প্রযোজ্য আইন ও বিধিমালার পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা জরুরি।
পাওয়ার অব অ্যাটর্নিতে কোন বিষয়গুলো স্পষ্ট থাকা দরকার?
জমি বণ্টনের জন্য প্রতিনিধি নিয়োগের ক্ষেত্রে পাওয়ার অব অ্যাটর্নিতে অস্পষ্ট ভাষা ব্যবহার করা উচিত নয়। বিশেষ করে নিচের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা ভালো:
-
মৃত জমির মালিকের নাম এবং তাঁর সঙ্গে ক্ষমতাদাতার সম্পর্ক।
-
জমির জেলা, উপজেলা, মৌজা, খতিয়ান ও দাগ নম্বর।
-
ক্ষমতাদাতা ওয়ারিশের প্রাপ্য অংশের বিবরণ।
-
অন্য ওয়ারিশদের সঙ্গে আপস বণ্টন করার ক্ষমতা।
-
বণ্টননামা দলিল প্রস্তুত, সম্পাদন ও রেজিস্ট্রির ক্ষমতা।
-
প্রয়োজনীয় ভূমি অফিসে আবেদন ও কাগজপত্র দাখিলের ক্ষমতা।
-
নামজারি, খতিয়ান ও সংশ্লিষ্ট ভূমিসেবা কার্যক্রমে প্রতিনিধিত্বের ক্ষমতা।
বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে, প্রতিনিধি যেন ক্ষমতাদাতার অনুমতির বাইরে জমি বিক্রি, দান বা অন্য কোনো হস্তান্তর করতে না পারেন। বণ্টনের জন্য দেওয়া ক্ষমতা এবং জমি বিক্রির ক্ষমতা এক বিষয় নয়। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত বা বিশেষ পাওয়ার অব অ্যাটর্নি তৈরি করাই নিরাপদ।
জমি বণ্টন ও রেজিস্ট্রেশনে যেসব কাগজপত্র লাগতে পারে
বিদেশে থাকা ওয়ারিশসহ সব উত্তরাধিকারীর জমি বণ্টনের আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা উচিত। সাধারণত যেসব নথি প্রয়োজন হতে পারে:
১. মূল জমির মালিকের মৃত্যু সনদ।
২. ওয়ারিশ সনদ বা উত্তরাধিকার সনদ।
৩. মূল মালিকের নামে থাকা খতিয়ান বা পর্চা।
৪. জমির মূল দলিল এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আগের মালিকানার দলিল।
৫. সর্বশেষ ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা।
৬. সব ওয়ারিশের জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্টের কপি।
৭. বিদেশে থাকা ওয়ারিশের বৈধ পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, যদি প্রতিনিধি নিয়োগ করা হয়।
৮. বণ্টননামা দলিল তৈরির জন্য জমির তফসিল, দাগ ও হিস্যার বিবরণ।
৯. প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য ওয়ারিশের সম্মতিপত্র বা সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে জমির মালিকানা ধারাবাহিকতা যাচাইয়ের জন্য অতিরিক্ত দলিল বা নথিও চাইতে পারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বণ্টননামা দলিল রেজিস্ট্রি করবেন যেভাবে
সব ওয়ারিশের সম্মতিতে জমির ভাগ নির্ধারণ হওয়ার পর বণ্টননামা দলিল তৈরি করতে হবে। দলিলে প্রত্যেক ওয়ারিশের প্রাপ্য অংশ, কোন দাগে কে কতটুকু জমি পাবেন এবং জমির সুনির্দিষ্ট তফসিল উল্লেখ থাকা প্রয়োজন।
এরপর দলিলটি সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রির জন্য উপস্থাপন করতে হবে। বিদেশে থাকা ওয়ারিশ নিজে উপস্থিত হতে না পারলে তাঁর পক্ষে বৈধভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন।
তবে দলিল রেজিস্ট্রির আগে পাওয়ার অব অ্যাটর্নির বৈধতা, ক্ষমতার পরিধি, জমির মালিকানা ও ওয়ারিশদের হিস্যা যাচাই করা জরুরি। দলিলের কোনো তথ্য বা জমির পরিমাণে ভুল থাকলে পরবর্তী সময়ে বিরোধ তৈরি হতে পারে।
বণ্টননামা রেজিস্ট্রির পর আলাদা নামজারি
বণ্টননামা দলিল রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হলে প্রত্যেক ওয়ারিশ নিজের বরাদ্দ করা জমির অংশ অনুযায়ী পৃথক নামজারির আবেদন করতে পারেন।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি ব্যবস্থায় অনলাইনে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। আবেদনের সময় সাধারণত উত্তরাধিকার সনদ, বণ্টননামা দলিল, খতিয়ান, জমির তফসিল এবং প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্রের তথ্য দিতে হয়।
আবেদন জমা দেওয়ার পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত দেয়। আবেদন মঞ্জুর হলে পৃথক খতিয়ান তৈরি হতে পারে। এরপর সংশ্লিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করতে হবে।
বিদেশে থাকা ওয়ারিশকে বাদ দিয়ে কি জমি বণ্টন করা যাবে?
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো ওয়ারিশ বিদেশে থাকেন বলে তাঁর উত্তরাধিকারী অংশ বাতিল হয়ে যায় না। তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য ওয়ারিশদের নিজেদের মধ্যে পুরো জমি ভাগ করে নেওয়া আইনগত বিরোধের কারণ হতে পারে।
তাই সব ওয়ারিশের প্রাপ্য হিস্যা নির্ধারণ করে সম্মতির ভিত্তিতে বণ্টন করা উচিত। বিদেশে থাকা ওয়ারিশের সম্মতি ও প্রয়োজনীয় প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত না করে তাঁর অংশ অন্য কারও নামে লিখে দেওয়া বা বণ্টন দেখানো থেকে বিরত থাকতে হবে।
কোনো ওয়ারিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা না গেলে বা তিনি বণ্টনে সম্মতি না দিলে বিষয়টি আলাদা আইনগত প্রক্রিয়ায় সমাধানের প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে জমি-সংক্রান্ত আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
জমি বণ্টনের সময় যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন
-
শুধু মৌখিক আলোচনার ভিত্তিতে জমি ভাগ করে থেমে যাবেন না।
-
বিদেশে থাকা ওয়ারিশের নামে জাল স্বাক্ষর বা অনুমতিপত্র তৈরি করবেন না।
-
পাওয়ার অব অ্যাটর্নিতে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা স্পষ্ট না রেখে দলিল সম্পাদনে যাবেন না।
-
জমির দাগ, খতিয়ান ও পরিমাণ যাচাই না করে বণ্টননামা তৈরি করবেন না।
-
সব ওয়ারিশের প্রাপ্য হিস্যা নিশ্চিত না করে কারও অংশ অন্যের নামে দেবেন না।
-
জমি নিয়ে মামলা বা আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকলে তা উপেক্ষা করে রেজিস্ট্রির চেষ্টা করবেন না।
কোনো ওয়ারিশ বিদেশে থাকলেও তাঁর অংশের জমি বণ্টন ও রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ রয়েছে। সব ওয়ারিশের নামে যৌথ নামজারি করতে চাইলে উত্তরাধিকার সনদের ভিত্তিতে আবেদন করা যায়। আর জমি আলাদা করে ভাগ করে পৃথক খতিয়ান করতে চাইলে সব পক্ষের সম্মতিতে বণ্টননামা দলিল তৈরি ও রেজিস্ট্রি করতে হবে।
বিদেশে থাকা ওয়ারিশ দেশে আসতে না পারলে আইন অনুযায়ী বৈধ পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে প্রতিনিধি নিয়োগ করতে পারেন। তবে দলিল তৈরির আগে ক্ষমতার পরিধি, দূতাবাসের সত্যায়ন এবং দেশে প্রয়োজনীয় প্রমাণীকরণ ও নিবন্ধনের নিয়ম ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি। এতে ভবিষ্যতে জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ ও আইনি জটিলতার ঝুঁকি কমবে।
সোহাগ/
