কয়েক দশক আগের দলিল দিয়ে জমির মালিক খুঁজবেন যেভাবে
নিজস্ব প্রতিবেদক: অনেকের কাছে কয়েক দশক আগের জমির দলিল রয়েছে। কিন্তু সেই দলিলে যাঁর নাম মালিক হিসেবে লেখা আছে, তিনি বর্তমানে জমিটির মালিক কি না, তা নিয়ে তৈরি হয় নানা প্রশ্ন। বিশেষ করে পৈতৃক জমি, পুরোনো সম্পত্তি কেনাবেচা কিংবা জমি নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে বর্তমান মালিকের পরিচয় জানা জরুরি হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে পুরোনো দলিল থেকে জমির বর্তমান মালিকানা সম্পর্কে ধারণা পেতে হলে ধারাবাহিকভাবে জমি হস্তান্তরের তথ্য খুঁজে বের করতে হয়। এ জন্য পুরোনো দলিল, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড, খতিয়ান, নামজারি এবং ভূমি উন্নয়ন করের তথ্য একসঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রথমে পুরোনো দলিলের তথ্য ভালোভাবে দেখুন
জমির বর্তমান মালিক খুঁজতে প্রথমেই পুরোনো দলিলটি ভালোভাবে পরীক্ষা করতে হবে। দলিলে সাধারণত যেসব তথ্য পাওয়া যায়, সেগুলো হলো—
- দলিল নম্বর ও নিবন্ধনের সাল
- যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলটি নিবন্ধিত হয়েছে
- জমির মৌজার নাম
- খতিয়ান নম্বর ও দাগ নম্বর
- জমির পরিমাণ ও সীমানা
- বিক্রেতা বা দাতার নাম
- ক্রেতা বা গ্রহীতার নাম
এ তথ্যগুলো পরবর্তী সময়ে জমির রেকর্ড অনুসন্ধানে কাজে লাগবে। বিশেষ করে দলিল নম্বর, সাল ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নাম জানা থাকলে পুরোনো রেকর্ড খুঁজে পাওয়া সহজ হয়।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে খুঁজুন পরবর্তী দলিল
পুরোনো দলিলের পর জমিটি অন্য কারও কাছে বিক্রি বা হস্তান্তর করা হয়েছে কি না, তা জানতে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।
রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর ৫৭ ধারার বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত নিয়ম ও ফি অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট রেজিস্টার বই ও সূচিবহি পরিদর্শনের সুযোগ রয়েছে। এসব রেকর্ড থেকে নিবন্ধিত দলিলের তথ্য অনুসন্ধান এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করা যায়।
দলিল নম্বর ও সাল জানা না থাকলেও বিক্রেতা বা ক্রেতার নাম, মৌজার নাম এবং জমির অন্যান্য তথ্য দিয়ে সূচিবহিতে অনুসন্ধানের চেষ্টা করা যায়।
ধরা যাক, ১৯৮০ সালে রহিম উদ্দিন একটি জমি করিম উদ্দিনের কাছে বিক্রি করেছিলেন। পরে করিম উদ্দিন ১৯৯৫ সালে জমিটি আবদুল হকের কাছে বিক্রি করেন। এরপর আবদুল হক আবার অন্য কারও কাছে জমিটি হস্তান্তর করেন। এ ক্ষেত্রে ১৯৮০ সালের দলিলে করিম উদ্দিনের নাম থাকলেও তিনি বর্তমান মালিক নন। পরবর্তী দলিলগুলো যাচাই করেই মালিকানা হস্তান্তরের ধারাবাহিকতা বুঝতে হবে।
পুরোনো দলিল হারিয়ে গেলে কী করবেন?
অনেক সময় জমির মূল দলিল হারিয়ে যায় অথবা দলিলের লেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সংরক্ষিত রেকর্ড থেকে দলিলের সার্টিফায়েড কপি বা নকল সংগ্রহের আবেদন করা যায়।
এ জন্য দলিলের নম্বর, নিবন্ধনের সাল ও অফিসের নাম জানা থাকলে সুবিধা হয়। এগুলো না জানা থাকলে দাতা-গ্রহীতার নাম এবং জমির মৌজার তথ্য দিয়ে সূচিবহিতে অনুসন্ধান করা যেতে পারে।
সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহের পর নিজের কাছে থাকা দলিলের সঙ্গে তথ্যগুলো মিলিয়ে দেখা উচিত।
খতিয়ান ও নামজারি দিয়ে যাচাই করুন বর্তমান রেকর্ড
দলিলের ধারাবাহিকতা অনুসন্ধানের পাশাপাশি জমির সর্বশেষ খতিয়ান ও নামজারির তথ্য যাচাই করতে হবে।
এ জন্য জমির—
১. সর্বশেষ খতিয়ান নম্বর
২. দাগ নম্বর
৩. মৌজার নাম
৪. রেকর্ডীয় মালিকের নাম
৫. জমির পরিমাণ ও হিস্যা
মিলিয়ে দেখতে হবে।
অনলাইনে খতিয়ানের তথ্য দেখতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট https://land.gov.bd/ এবং ই-পর্চা বা ভূমি রেকর্ডসংক্রান্ত সেবা ব্যবহার করা যায়। তবে সব এলাকার সব জরিপের তথ্য অনলাইনে পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
খতিয়ানে আগের মালিকের নাম থাকলে পরবর্তী নামজারি হয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা জরুরি। আবার নামজারি না থাকলেই কোনো ব্যক্তির বৈধ মালিকানা নেই, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা বদলেছে কি না দেখুন
জমির পুরোনো মালিক মারা গেলে তাঁর ওয়ারিশদের মাধ্যমে জমির মালিকানা উত্তরাধিকার সূত্রে পরিবর্তিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে শুধু পুরোনো দলিলের নাম দেখে বর্তমান মালিক নির্ধারণ করা যাবে না।
যাচাই করতে হবে—
- পুরোনো মালিকের মৃত্যুর তথ্য
- বৈধ ওয়ারিশদের পরিচয়
- ওয়ারিশ সনদ
- উত্তরাধিকারীদের মধ্যে নিবন্ধিত বণ্টননামা থাকলে সেটি
- ওয়ারিশদের নামে করা নামজারি ও খতিয়ান
জমি একাধিক ওয়ারিশের মধ্যে ভাগ হয়ে থাকলে প্রত্যেকের প্রাপ্য হিস্যা এবং সংশ্লিষ্ট দাগের তথ্যও মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
জমি বিক্রি বা বন্ধক রাখা হয়েছে কি না যাচাই করুন
কোনো জমির সর্বশেষ মালিকানা যাচাইয়ের সময় শুধু বিক্রয় দলিল খুঁজলেই হবে না। জমিটি দান, হেবা, বিনিময় বা অন্য কোনো বৈধ প্রক্রিয়ায় হস্তান্তর হয়েছে কি না, সেটিও অনুসন্ধান করতে হবে।
এ ছাড়া জমির ওপর ব্যাংকঋণের বন্ধক, আদালতের নিষেধাজ্ঞা, মামলা বা অন্য কোনো দায় রয়েছে কি না, তা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে তল্লাশি করে দায়মুক্তি সনদ বা এনইসি (NEC) সংগ্রহের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া যেতে পারে।
জমির বর্তমান মালিক নিশ্চিত হওয়ার আগে যা মিলিয়ে নেবেন
পুরোনো দলিল থেকে বর্তমান মালিকানা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে যাচাই করা উচিত।
- মূল বা সার্টিফায়েড দলিলের তথ্য
- পরবর্তী সময়ে নিবন্ধিত সব প্রাসঙ্গিক হস্তান্তর দলিল
- সর্বশেষ খতিয়ান ও নামজারি
- জমির দাগ, মৌজা ও পরিমাণ
- উত্তরাধিকার ও বণ্টনের কাগজপত্র
- ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের তথ্য
- জমির বাস্তব দখল ও সীমানা
- মামলা, বন্ধক বা অন্য কোনো দায় রয়েছে কি না
মনে রাখতে হবে, শুধু খতিয়ান, নামজারি কিংবা ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ এককভাবে জমির চূড়ান্ত মালিকানা প্রমাণ করে না। আবার পুরোনো দলিলে কারও নাম থাকলেই তিনি বর্তমানে জমিটির মালিক, এমনটিও নয়।
সব কাগজপত্রের ধারাবাহিকতা যাচাই করে এবং প্রয়োজনে ভূমি আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে মালিকানা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়াই নিরাপদ।
সোহাগ/
