শক্তিশালী এল নিনোর পর আসছে লা নিনা? কী বলছে পূর্বাভাস
নিজস্ব প্রতিবেদক: বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তন নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী হয়ে উঠছে এল নিনো। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও ঝড়ের ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এই এল নিনোর প্রভাব কমতে শুরু করলে পরবর্তী সময়ে লা নিনা তৈরি হবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা করছেন আবহাওয়াবিদরা।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসন (এনওএএ) এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) সাম্প্রতিক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের শেষ দিকে এল নিনোর শক্তি আরও বাড়তে পারে। ২০২৭ সালের প্রথম কয়েক মাসেও এর প্রভাব অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে, নাকি লা নিনার দিকে যাবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ডব্লিউএমওর ৮ অক্টোবর ২০২৬-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের পানির তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে। ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে এল নিনো সর্বোচ্চ শক্তিতে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে এনওএএর ৮ অক্টোবর প্রকাশিত পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত শক্তিশালী থেকে অতি শক্তিশালী এল নিনো থাকার সম্ভাবনা ৮৩ শতাংশের বেশি।
এল নিনোর কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন, খরা এবং বন্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে কোন অঞ্চলে কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা স্থানীয় ও মৌসুমি আবহাওয়ার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
এল নিনো ও লা নিনা প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা এবং বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত দুটি বিপরীত জলবায়ু পরিস্থিতি। এই পুরো ব্যবস্থাকে বলা হয় এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন বা এনসো (ENSO)।
স্প্যানিশ ভাষায় এল নিনো অর্থ ছোট ছেলে এবং লা নিনা অর্থ ছোট মেয়ে।
এল নিনো: এ সময় নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়। একই সঙ্গে বাণিজ্য বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধরনে পরিবর্তন আসে।
লা নিনা: এটি এল নিনোর বিপরীত পরিস্থিতি। এ সময় নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় ঠান্ডা হয়ে যায়। বাণিজ্য বায়ু শক্তিশালী হয় এবং উষ্ণ পানি পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে সরে যায়।
এল নিনোর প্রভাব কমে গেলেই যে লা নিনা তৈরি হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। অনেক সময় এল নিনোর পর প্রশান্ত মহাসাগর নিরপেক্ষ অবস্থায় ফিরে আসে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে লা নিনা দেখা দিতে পারে।
এনওএএর অক্টোবর ২০২৬-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এল নিনো থাকার সম্ভাবনা ৯৮ শতাংশ। মার্চ থেকে মে পর্যন্তও এর সম্ভাবনা ৮৫ শতাংশ দেখানো হয়েছে। এরপর ধীরে ধীরে এল নিনোর সম্ভাবনা কমে নিরপেক্ষ অবস্থার সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
এ পূর্বাভাসে ২০২৭ সালের মে থেকে জুলাই সময়ে লা নিনা তৈরির সম্ভাবনা ১৩ শতাংশ দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ, আপাতত লা নিনা আসার চেয়ে নিরপেক্ষ আবহাওয়ায় ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
লা নিনা তৈরি হলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে, আবার কোথাও খরা বা শুষ্ক আবহাওয়া দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা এবং আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রভাব পড়তে পারে। তবে লা নিনার প্রভাব সব দেশে এক রকম হয় না। স্থানীয় আবহাওয়ার পরিস্থিতি, মৌসুমি বায়ু এবং অন্যান্য জলবায়ু ব্যবস্থাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এল নিনো বা লা নিনার প্রভাব নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু এই দুটি জলবায়ু পরিস্থিতির ভিত্তিতে দেশে বৃষ্টি, বন্যা বা খরার নির্দিষ্ট পূর্বাভাস দেওয়া যায় না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিজ্ঞানীরা প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা, বায়ুপ্রবাহ এবং বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। কারণ এল নিনো দুর্বল হওয়ার পর কোন পরিস্থিতি তৈরি হবে, তা বুঝতে এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব ২০২৭ সালের শুরু পর্যন্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর নিরপেক্ষ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। লা নিনা আসার সম্ভাবনাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া পূর্বাভাসে লা নিনার আগমন নিশ্চিত নয়।
সোহাগ/
