ওয়ারিশি জমি নামজারি করতে কোন কোন কাগজপত্র লাগবে
ওয়ারিশি জমি নামজারি করতে কোন কোন কাগজপত্র সংগ্রহ করবেন? জেনে নিন প্রয়োজনীয় তালিকা
বাংলাদেশে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির মালিকানা নিজের নামে সরকারি রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করতে নামজারি করা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর তাঁর রেখে যাওয়া জমির বৈধ ওয়ারিশদের মধ্যে মালিকানা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় নামজারি বা খারিজের প্রয়োজন হয়। তবে আবেদন করার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ না করলে বিভিন্ন জটিলতায় পড়তে পারেন।
অনেকেই জানেন না, ওয়ারিশি জমি নামজারি করতে ঠিক কোন কোন কাগজপত্র প্রয়োজন। বিশেষ করে ওয়ারিশ সনদ, মৃত ব্যক্তির জমির খতিয়ান, দলিল এবং ভূমি উন্নয়ন করের রসিদসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নথি আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা ভালো।
ওয়ারিশি জমি নামজারি করতে যেসব কাগজপত্র লাগবে
উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির নামজারির আবেদন করার আগে সাধারণত নিচের কাগজপত্রগুলো সংগ্রহ করতে হবে।
১. ওয়ারিশ সনদপত্র
ওয়ারিশি জমি নামজারির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাগজ হলো ওয়ারিশ সনদ। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র অথবা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কাছ থেকে এই সনদ সংগ্রহ করতে হয়।
সনদে মৃত ব্যক্তির নাম এবং তাঁর সব বৈধ ওয়ারিশের নাম ও সম্পর্ক সঠিকভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। কোনো ওয়ারিশের নাম বাদ পড়লে পরবর্তী সময়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
২. মৃত ব্যক্তির মৃত্যু সনদ
যাঁর কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পাওয়া গেছে, তাঁর মৃত্যু সনদ সংগ্রহ করে রাখা উচিত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী নামজারির আবেদনের সঙ্গে এটি জমা দিতে হতে পারে।
৩. জমির সর্বশেষ খতিয়ান
মৃত ব্যক্তির নামে থাকা জমির সর্বশেষ খতিয়ানের কপি প্রয়োজন হবে। জমিটি কোন মৌজায় অবস্থিত, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর এবং জমির পরিমাণ কত, এসব তথ্য খতিয়ান থেকে যাচাই করা যায়।
প্রয়োজন অনুযায়ী সিএস, এসএ, আরএস, বিএস বা সর্বশেষ নামজারি খতিয়ানের কপি সংগ্রহ করে রাখুন।
৪. জমির মূল দলিল বা দলিলের কপি
মৃত ব্যক্তি কীভাবে জমিটির মালিক হয়েছিলেন, তা প্রমাণের জন্য মূল দলিল অথবা দলিলের সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করা প্রয়োজন হতে পারে। আগের মালিকদের মাধ্যমে জমির মালিকানা এসে থাকলে সংশ্লিষ্ট বায়া বা পূর্ববর্তী দলিলও প্রয়োজন অনুযায়ী প্রস্তুত রাখতে হবে।
৫. ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা
জমির সর্বশেষ ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধের রসিদ সংগ্রহ করুন। হালনাগাদ দাখিলা থাকলে জমির করসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা সহজ হয়।
৬. ওয়ারিশদের জাতীয় পরিচয়পত্র
নামজারির আবেদনে সংশ্লিষ্ট ওয়ারিশদের পরিচয় যাচাইয়ের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি প্রয়োজন হতে পারে। প্রত্যেক ওয়ারিশের নাম ও পরিচয়পত্রের তথ্য যেন ওয়ারিশ সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
৭. আবেদনকারীর ছবি ও যোগাযোগের তথ্য
আবেদনকারীর প্রয়োজনীয় ছবি, মোবাইল নম্বর এবং ঠিকানার তথ্য প্রস্তুত রাখুন। অনলাইনে আবেদন করার সময় এসব তথ্য প্রয়োজন হতে পারে।
৮. নিবন্ধিত বণ্টননামা দলিল (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
ওয়ারিশরা নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ করে প্রত্যেকের অংশ অনুযায়ী আলাদা খতিয়ান করতে চাইলে নিবন্ধিত বণ্টননামা দলিল প্রয়োজন হবে।
তবে সব ওয়ারিশ একসঙ্গে যৌথভাবে নামজারি করতে চাইলে শুধু বণ্টননামা না থাকার কারণে আবেদন করতে বাধা নেই। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক ওয়ারিশের প্রাপ্য অংশ উল্লেখ করে যৌথ নামজারি করা যায়।
বণ্টননামা ছাড়াই কি ওয়ারিশি জমি নামজারি করা যায়?
হ্যাঁ, ওয়ারিশরা চাইলে বণ্টননামা দলিল ছাড়াই যৌথভাবে নামজারির আবেদন করতে পারেন।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি ওয়ারিশদের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে ভাগ না হলে তাঁদের সবার নামে একই খতিয়ানে যৌথ নামজারি করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক ওয়ারিশের প্রাপ্য হিস্যা উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে, ওয়ারিশরা যদি জমি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে আলাদা আলাদা খতিয়ান করতে চান, তাহলে আপস বণ্টননামা দলিল সম্পাদন ও নিবন্ধন করতে হবে।
অর্থাৎ, যৌথ নামজারির জন্য বণ্টননামা বাধ্যতামূলক নয়। তবে পৃথক খতিয়ান করার ক্ষেত্রে নিবন্ধিত বণ্টননামা প্রয়োজন।
ওয়ারিশি জমির নামজারির আবেদন করবেন যেভাবে
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করার পর অনলাইনে ই-নামজারি ব্যবস্থার মাধ্যমে আবেদন করা যায়।
এ জন্য প্রথমে ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত ভূমিসেবা পোর্টালে প্রবেশ করতে হবে। এরপর ই-নামজারি সেবা নির্বাচন করে আবেদনকারীর তথ্য, জমির বিবরণ এবং উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা পাওয়ার তথ্য দিতে হবে।
এরপর প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের স্ক্যান কপি আপলোড করে নির্ধারিত সরকারি ফি পরিশোধ করতে হবে। আবেদন জমা দেওয়ার পর আবেদন নম্বর সংরক্ষণ করুন। সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস কাগজপত্র যাচাই এবং প্রয়োজনীয় শুনানি বা তদন্ত শেষে নামজারির বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে।
নামজারির আবেদন করার আগে যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখবেন
১. ওয়ারিশ সনদে সব বৈধ ওয়ারিশের নাম রয়েছে কি না যাচাই করুন।
২. মৃত ব্যক্তির নাম, খতিয়ান নম্বর ও দাগ নম্বরের তথ্য মিলিয়ে নিন।
৩. জমির পরিমাণ ও মালিকানার তথ্য দলিলের সঙ্গে যাচাই করুন।
৪. কোনো ওয়ারিশকে বাদ দিয়ে আবেদন করবেন না।
৫. জমি নিয়ে মামলা বা বিরোধ থাকলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র প্রস্তুত রাখুন।
৬. প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র পরিষ্কারভাবে স্ক্যান করে সংরক্ষণ করুন।
ওয়ারিশি জমির নামজারি করতে কাগজপত্রের সঠিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিস বা উপজেলা ভূমি অফিস থেকে জমির ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নথির তালিকা যাচাই করে নেওয়া ভালো। এতে আবেদন প্রক্রিয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা কমতে পারে।
নামজারি নিজে থেকে উত্তরাধিকার নির্ধারণ করে না। বৈধ ওয়ারিশ এবং তাঁদের প্রাপ্য অংশ প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
সোহাগ/
