তাহসিফের মৃত্যুতে নতুন তথ্য, দীপের জিজ্ঞাসাবাদে কী জানা গেল
নিজস্ব প্রতিবেদক: বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে নতুন তথ্য সামনে আসছে। নিখোঁজ হওয়ার আগে তাহসিফের সঙ্গে থাকা বন্ধু পরিচয় দেওয়া শাহরিয়ার রেজা দীপকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। জিজ্ঞাসাবাদে তুরাগ নদের পাড়ে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে নিজের একটি বক্তব্য দিয়েছেন দীপ। পাশাপাশি তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নম্বরপ্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র।
তবে তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হয়নি। দীপের বক্তব্য, উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেল এবং সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছে তদন্তকারী সংস্থা।
তুরাগ নদের পাড়ে কী ঘটেছিল, দীপের বক্তব্য
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, ঘটনার সময় তারা তুরাগ নদের পাড়ে কথা বলছিলেন। এ সময় কয়েকজন ব্যক্তি তাদের ধাওয়া করেন। তখন তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন এবং দীপ সেখান থেকে পালিয়ে যান।
তবে দীপের এই বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ওই সময় সেখানে কারা ছিলেন, কেন তাদের ধাওয়া করা হয়েছিল এবং তাহসিফ কী পরিস্থিতিতে নদীতে পড়েছিলেন, তা তদন্ত করে দেখছে পিবিআই।
পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন, দীপকে হেফাজতে নেওয়ার পর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে সেগুলো এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না।
তুরাগ নদের কাছে নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল উদ্ধার
তদন্তের মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল। তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি এলাকায় মোটরসাইকেলটি পাওয়া যায়।
পিবিআই সদর দপ্তরের পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ এক বার্তায় জানান, তুরাগ নদ থেকে আনুমানিক ৫০ গজ দূরে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে। এটি তাহসিফের কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। নম্বরপ্লেট না থাকায় এর মালিকানা নিশ্চিত করতে কাজ চলছে।
এদিকে সিসিটিভি ফুটেজে তাহসিফকে ঘটনার দিন নম্বরপ্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল নিয়ে বের হতে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলটির সঙ্গে সেটির কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দারোয়ানের বক্তব্যে নতুন প্রশ্ন
তাহসিফের ভবনের দারোয়ানের দেওয়া বক্তব্যও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। তার দাবি, ঘটনার দিন রাতে দীপের সঙ্গে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। পরে রাত আড়াইটার দিকে দীপ একাই বাসায় ফিরে আসেন।
দারোয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, ফিরে আসার সময় দীপের আচরণ কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল। তিনি চোখাচোখি করে কথা বলছিলেন না এবং মিটিমিটি হাসছিলেন বলে দাবি করেন দারোয়ান।
তবে এটি দারোয়ানের ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ ও বক্তব্য। ঘটনার সঙ্গে এর কোনো অপরাধমূলক সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
সিসিটিভি ফুটেজে তাহসিফের সঙ্গে দীপকে দেখা যায়
এর আগে সামনে আসা সিসিটিভি ফুটেজে ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি গ্যারেজের সামনে তাহসিফকে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে ও হাত মেলাতে দেখা যায়।
তাহসিফের পরিবারের সদস্যরা ওই ব্যক্তিকে শাহরিয়ার রেজা দীপ হিসেবে শনাক্ত করেছেন। ফুটেজে দেখা যায়, হাত মেলানোর পর দুজন আলাদা মোটরসাইকেলে সেখান থেকে চলে যান।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, দীপের ফোন পেয়েই সেদিন বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। পরে দীপ জানিয়েছিলেন, তাহসিফের মোটরসাইকেলে সমস্যা হওয়ায় তারা ওয়ার্কশপে গিয়েছিলেন। মোটরসাইকেল ঠিক করার পর খাবার খেয়ে তারা আলাদা হয়ে যান বলে দাবি করেছিলেন দীপ।
তবে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা ঘটনা, পরিবারের বক্তব্য এবং দীপের দেওয়া তথ্যের মধ্যে কোনো অসংগতি রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখছে পিবিআই।
রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মাকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন তাহসিফ
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিমের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দীপের ফোন পাওয়ার পর বাসা থেকে বের হন তার ছেলে। রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মায়ের মোবাইলে একটি বার্তা পাঠিয়ে তাহসিফ জানান, তিনি বাড়ি ফিরছেন।
কিন্তু এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরিবারের সদস্যরা তাকে খুঁজতে থাকেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে তাহসিফের মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তার বাবার আশঙ্কা, ছেলেকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
যেভাবে উদ্ধার হয় তাহসিফের মরদেহ
২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসতে থাকার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে টঙ্গী নদী পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে মরদেহটি উদ্ধার করেন।
হাতঘড়ি ও পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে মরদেহটি কে এম তাহসিফ সাউরির বলে শনাক্ত করা হয়।
পরদিন ২৯ অক্টোবর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
তাহসিফের মৃত্যুর রহস্য এখনো অমীমাংসিত
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় এখন তদন্তকারীদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। তিনি কীভাবে তুরাগ নদে পড়েছিলেন, দীপের বক্তব্যের সঙ্গে অন্যান্য তথ্যের মিল কতটুকু, উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলটি কার এবং মৃত্যুর আগে ঠিক কী ঘটেছিল, সেগুলোর উত্তর খুঁজছে পিবিআই।
এ ঘটনায় দীপের ভূমিকা কী, তা তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হবে। আপাতত তার বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ, দারোয়ানের তথ্য এবং উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেল যাচাই করে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানার চেষ্টা চলছে।
সিদ্দিকা/
