ই-নামজারি করার আগে যে ৯টি বিষয় জেনে রাখা জরুরি
নিজস্ব প্রতিবেদক: জমি কেনার পর কিংবা উত্তরাধিকার সূত্রে জমির মালিকানা পাওয়ার পর নিজের নামে খতিয়ান হালনাগাদ করতে চান? এ জন্য এখন আর আগের মতো শুধু ভূমি অফিসে গিয়ে আবেদন করতে হয় না। ঘরে বসেই অনলাইনে ই-নামজারির আবেদন করা যায়। তবে আবেদন করার আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা না থাকলে ভুল তথ্য, অসম্পূর্ণ কাগজপত্র কিংবা ফি পরিশোধের জটিলতায় আবেদন আটকে যেতে পারে।
বিশেষ করে দলিলের তথ্য, জমির দাগ নম্বর, খতিয়ান, মালিকানার ধারাবাহিকতা এবং সরকারি ফি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। তাই ই-নামজারি আবেদন করার আগে নিচের বিষয়গুলো জেনে নিন।
১. ই-নামজারি কী এবং কেন প্রয়োজন?
ই-নামজারি হলো অনলাইনে জমির মালিকানা পরিবর্তনের পর সরকারি ভূমি রেকর্ড বা খতিয়ান হালনাগাদ করার আবেদন ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা।
সাধারণত জমি কেনাবেচা, উত্তরাধিকার, দান, হেবা বা আইনসম্মতভাবে মালিকানা হস্তান্তরের পর নতুন মালিকের নামে জমির রেকর্ড হালনাগাদ করার প্রয়োজন হয়।
তবে মনে রাখতে হবে, শুধু নামজারি করলেই জমির মালিকানা নিয়ে সব ধরনের বিরোধের সমাধান হয়ে যায় না। জমির মালিকানার বৈধতা নির্ভর করে দলিল, উত্তরাধিকার, রেকর্ড এবং প্রযোজ্য আইনগত বিষয়ের ওপর।
২. আবেদন করার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখুন
ই-নামজারির আবেদন করার আগে জমির ধরন ও মালিকানা পাওয়ার উৎস অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করুন।
ক্রয়সূত্রে জমি হলে সাধারণত প্রয়োজন হতে পারে:
-
রেজিস্ট্রি দলিলের কপি।
-
সর্বশেষ খতিয়ানের কপি।
-
পূর্ববর্তী মালিকানা হস্তান্তরের বায়া বা ধারাবাহিক দলিল, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে।
-
হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা।
-
আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য।
-
জমির মৌজা, জে.এল. নম্বর, দাগ নম্বর ও পরিমাণের বিবরণ।
উত্তরাধিকার সূত্রে জমি হলে প্রয়োজন হতে পারে:
-
ওয়ারিশ সনদ।
-
মৃত মালিকের মৃত্যুসনদ, প্রয়োজন অনুযায়ী।
-
সর্বশেষ খতিয়ানের কপি।
-
পূর্ববর্তী মালিকানার দলিল বা প্রাসঙ্গিক রেকর্ড।
-
ওয়ারিশদের পরিচয় ও অংশের বিবরণ।
-
ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা।
আদালতের রায়, ডিক্রি বা অন্য কোনো আইনগত আদেশের ভিত্তিতে আবেদন করলে সংশ্লিষ্ট আদেশের প্রয়োজনীয় কপিও লাগতে পারে।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সরকারি ই-নামজারি নির্দেশিকা দেখে নেওয়া ভালো।
৩. দলিল ও খতিয়ানের তথ্য মিলিয়ে নিন
নামজারির আবেদনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো জমির সঠিক পরিচিতি।
আবেদন করার সময় নিচের তথ্যগুলো মূল কাগজপত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নিন:
-
দলিল নম্বর ও রেজিস্ট্রির তারিখ।
-
দলিলের সাব-রেজিস্ট্রি অফিস।
-
মৌজার নাম ও জে.এল. নম্বর।
-
খতিয়ান নম্বর।
-
দাগ নম্বর।
-
জমির মোট পরিমাণ ও আপনার প্রাপ্য অংশ।
-
দাতা, গ্রহীতা বা ওয়ারিশদের নাম।
দলিল ও খতিয়ানের তথ্যে অমিল থাকলে তা আগে বুঝে নেওয়া জরুরি। ভুল তথ্য দিয়ে আবেদন করলে পরবর্তী সময়ে শুনানি বা যাচাইয়ের সময় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
৪. ই-নামজারির সরকারি ফি কত?
ই-নামজারি আবেদন করার সময় নির্ধারিত সরকারি ফি অনলাইনে পরিশোধ করতে হয়।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ফি তালিকা অনুযায়ী:
| ফি-এর বিবরণ | নির্ধারিত টাকা |
|---|---|
| আবেদনের কোর্ট ফি | ২০ টাকা |
| নোটিশ জারি ফি | ৫০ টাকা |
| আবেদন ও নোটিশের মোট ফি | ৭০ টাকা |
| নামজারি অনুমোদনের পর ডিসিআর ফি | ১,১০০ টাকা |
অর্থাৎ আবেদন জমা দেওয়ার সময় ৭০ টাকা এবং নামজারি অনুমোদনের পর ডিসিআর বাবদ ১,১০০ টাকা দিতে হয়। সরকারি ফি পরিবর্তিত হলে নতুন নির্ধারিত হার কার্যকর হবে।
ফি পরিশোধের সময় সরকারি পোর্টালের নির্দেশনা অনুসরণ করুন এবং পেমেন্টের রসিদ সংরক্ষণ করুন।
৫. কোথায় গিয়ে অনলাইনে আবেদন করবেন?
ই-নামজারির আবেদন করতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি ওয়েবসাইট ব্যবহার করতে হবে।
ওয়েবসাইট: https://mutation.land.gov.bd/
এখানে ই-নামজারি সংক্রান্ত নির্দেশিকা ও আবেদন করার সুবিধা রয়েছে।
আবেদন করার সময় প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করে কাগজপত্র আপলোড করতে হবে। এরপর নির্ধারিত আবেদন ও নোটিশ ফি পরিশোধ করে আবেদন চূড়ান্তভাবে দাখিল করতে হবে।
শুধু ফরম পূরণ করলেই আবেদন সম্পন্ন হয় না। আবেদন সাবমিট হয়েছে এবং পেমেন্ট সফল হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করুন।
৬. আবেদন জমা দেওয়ার পর কীভাবে অগ্রগতি জানবেন?
আবেদন চূড়ান্তভাবে জমা হলে একটি আবেদন নম্বর পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে এই নম্বর ব্যবহার করে আবেদনের অগ্রগতি জানা যায়।
সরকারি ই-নামজারি পোর্টালের নির্দেশনা অনুসরণ করে আবেদন ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে বর্তমান অবস্থা যাচাই করুন।
আবেদন জমা দেওয়ার পর সাধারণত সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে আবেদনটি যায়। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী তদন্ত, প্রতিবেদন, শুনানি এবং সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া চলে।
আবেদনের নম্বর, পেমেন্টের রসিদ এবং মোবাইল নম্বর সংরক্ষণ করে রাখুন। কোনো এসএমএস না এলে শুধু সেটির ওপর নির্ভর না করে অনলাইনে আবেদনের অবস্থা যাচাই করুন।
৭. নামজারি হতে কত দিন সময় লাগে?
ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ই-নামজারি প্রক্রিয়ার ধাপ অনুযায়ী সাধারণ ক্ষেত্রে আবেদন নিষ্পত্তির জন্য ২৮ কার্যদিবসের সময় উল্লেখ রয়েছে।
তবে সব আবেদন একই সময়ে নিষ্পত্তি হয় না। জমির কাগজপত্রে অসংগতি, তদন্ত প্রতিবেদন, শুনানি, আপত্তি কিংবা মালিকানা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে বেশি সময় লাগতে পারে।
তাই আবেদন করার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অগ্রগতি না পেলে আবেদন নম্বরসহ সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে যোগাযোগ করুন।
৮. আবেদন নামঞ্জুর হলে কী করবেন?
কোনো আবেদন নামঞ্জুর হলে প্রথমে আদেশে উল্লেখ করা কারণ ভালোভাবে পড়ুন। কী কারণে আবেদন গ্রহণ করা হয়নি, কোন কাগজপত্রের ঘাটতি রয়েছে এবং পরবর্তী করণীয় কী, তা বুঝে নিন।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতি থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী তা জমা দিন। সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে প্রযোজ্য আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রতিকার বা রিভিউয়ের সুযোগ আছে কি না, তা যাচাই করুন।
শুধু আবেদন নামঞ্জুর হয়েছে বলে নতুন করে আবেদন করার আগে আগের আদেশ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নির্দেশনা দেখে নেওয়া উচিত।
৯. দালাল ছাড়াই সরকারি পদ্ধতিতে আবেদন করুন
ই-নামজারি সেবার জন্য নির্ধারিত সরকারি ফি ছাড়া কাউকে অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আবেদন বা দ্রুত নিষ্পত্তির নামে কেউ বাড়তি টাকা চাইলে সতর্ক থাকুন।
নিজে আবেদন করতে অসুবিধা হলে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার বা অনুমোদিত সেবা কেন্দ্রের সহায়তা নিতে পারেন। তবে আবেদনকারীর তথ্য ও কাগজপত্র নিজে যাচাই করুন এবং প্রতিটি পেমেন্টের রসিদ সংগ্রহ করুন।
ভূমিসেবা বিষয়ে সহায়তার জন্য সরকারি হটলাইন ১৬১২২ নম্বরেও যোগাযোগ করা যায়।
ই-নামজারি করার আগে শেষবার যে বিষয়গুলো যাচাই করবেন
আবেদন সাবমিট করার আগে নিশ্চিত হয়ে নিন:
১. জমির দলিল ও খতিয়ানের তথ্য সঠিক আছে কি না।
২. দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ ও মালিকানার অংশ মিলেছে কি না।
৩. প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র আপলোড হয়েছে কি না।
৪. আবেদনকারীর নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সঠিক কি না।
৫. নির্ধারিত ৭০ টাকা আবেদন ও নোটিশ ফি পরিশোধ হয়েছে কি না।
৬. আবেদন নম্বর ও পেমেন্টের রসিদ সংরক্ষণ করেছেন কি না।
সবশেষে, ই-নামজারি আবেদন করার আগে কাগজপত্র ও জমির তথ্য ভালোভাবে যাচাই করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এতে আবেদন প্রক্রিয়ায় ভুল কমবে এবং অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি এড়ানো সহজ হবে।
সিদ্দিকা/
