ফ্যামিলি কার্ড পাবেন কারা? যোগ্যতা, ভাতা ও আবেদন নিয়ে বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশজুড়ে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য পরিবারভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় পরিবারের নারী প্রধানের নামে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে। তবে কার্ড পেলেই সবাই ভাতা পাবেন না। পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা যাচাই করে নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী যোগ্যদের ভাতা দেওয়া হবে।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের আনুমানিক ৪ কোটি ৪৫ লাখ পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেইসে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সোমবার (১৩ অক্টোবর) তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহ ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন তিনি।
ফ্যামিলি কার্ড পাবেন কারা?
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরিবারের নারী প্রধানের নামে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে। তবে ভাতা পাওয়ার ক্ষেত্রে পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনা করা হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হালনাগাদ প্রক্সি মিন্স টেস্ট (পিএমটি) পদ্ধতিতে পরিবারগুলোকে পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হলো—
১. অতিদরিদ্র
২. দরিদ্র
৩. ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত
৪. মধ্যবিত্ত
৫. উচ্চবিত্ত
মন্ত্রী জানান, পিএমটি স্কোর ৮৬০ বা তার কম পাওয়া পরিবারের নারী প্রধানকে ভাতা পাওয়ার যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির তুলনামূলক কম স্কোর পাওয়া পরিবারগুলো ভাতার আওতায় আসবে।
অর্থাৎ, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ এবং ভাতা পাওয়ার যোগ্যতা এক বিষয় নয়। কার্ড দেওয়া হবে পরিবারের নারী প্রধানের নামে, আর ভাতা নির্ধারিত হবে পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থার ভিত্তিতে।
বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ, শেষ হবে ডিসেম্বরে
ফ্যামিলি কার্ডের ডেটাবেইস তৈরির জন্য দেশব্যাপী তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে তথ্য সংগ্রহকারীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের সদস্য, সম্পদ ও আর্থসামাজিক অবস্থা সম্পর্কে তথ্য নিচ্ছেন।
এই কাজে ৬৬ হাজার ৮১৫ জন তথ্য সংগ্রহকারী এবং ৬ হাজার ৬৮১ জন সুপারভাইজার নিয়োজিত রয়েছেন। বিশেষায়িত ট্যাবলেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সংগৃহীত তথ্য সরাসরি অনলাইন ডেটাবেইসে যুক্ত করা হবে।
সরকারের লক্ষ্য, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আনুমানিক ৪ কোটি ৪৫ লাখ পরিবারের তথ্য ডেটাবেইসে অন্তর্ভুক্ত করা। প্রতি পাঁচজন সদস্যকে একটি পরিবার ধরে এই হিসাব নির্ধারণ করা হয়েছে।
কীভাবে নির্ধারণ হবে ভাতা পাওয়ার যোগ্যতা?
ভাতা পাওয়ার জন্য পরিবারের শুধু আয় নয়, সামগ্রিক আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনা করা হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হবে প্রক্সি মিন্স টেস্ট বা পিএমটি পদ্ধতি।
এই পদ্ধতিতে সরাসরি আয়ের হিসাবের পাশাপাশি পরিবারের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ এবং অন্যান্য আর্থসামাজিক সূচক বিশ্লেষণ করে দারিদ্র্য বা সচ্ছলতার মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এরপর প্রাপ্ত স্কোরের ভিত্তিতে উপকারভোগী নির্বাচন করা হবে।
তথ্য সংগ্রহ শেষ হলে ডেটাবেইস থেকে নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী যোগ্য পরিবার বাছাই করা হবে। তাই তথ্য সংগ্রহের সময় পরিবারের সঠিক ও নির্ভুল তথ্য দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
চলতি অর্থবছরে ৪০ লাখ পরিবারকে ভাতা দেওয়ার লক্ষ্য
সমাজকল্যাণমন্ত্রী জানান, চলতি অর্থবছরে নতুন করে ৪০ লাখ পরিবারের নারী প্রধানকে ফ্যামিলি কার্ড ও ভাতা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তী তিন অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে যোগ্য নারী প্রধানদের এই কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্য মোট ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ১২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভাতা হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
ফ্যামিলি কার্ডে থাকবে কিউআর কোড ও এনএফসি
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, উপকারভোগীদের ফ্যামিলি কার্ডে ডুয়েল চিপ, কিউআর কোড এবং নিয়ার ফিল্ড কমিউনিকেশন (এনএফসি) প্রযুক্তি থাকবে। কার্ডটি সরকারের টাকাপের পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে।
এর মাধ্যমে উপকারভোগীরা ব্যাংকের এটিএম বুথ, বিপণিবিতানের পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের (এমএফএস) মাধ্যমে ভাতার টাকা তুলতে পারবেন বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।
আগে কোথায় চালু হয়েছে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি?
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, পাইলট প্রকল্পের আওতায় দেশের আট বিভাগের ৪৪টি জেলার ৫৫টি উপজেলা এবং সিটি করপোরেশনের ৫৭টি ইউনিটে মোট ১ লাখ ১২ হাজার ৯৪টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল।
পিএমটি স্কোরের ভিত্তিতে নির্বাচিত ৭১ হাজার ৮৩১ জন যোগ্য উপকারভোগীকে ফ্যামিলি কার্ড ও ভাতা দেওয়া হয়েছে বলে জানান সমাজকল্যাণমন্ত্রী।
পাইলট প্রকল্পে বরাদ্দ করা ৮৬ কোটি ৬০ লাখ টাকার মধ্যে ব্যয় হয়েছে ৬৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৫৭ কোটি ২০ লাখ টাকা ভাতা হিসেবে দেওয়া হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড পেতে এখন কী করবেন?
বর্তমানে দেশব্যাপী পরিবারের তথ্য সংগ্রহ ও ডেটাবেইস তৈরির কার্যক্রম চলছে। এই পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহকারীরা বাড়িতে গেলে পরিবারের সদস্য, সম্পদ ও আর্থসামাজিক অবস্থার সঠিক তথ্য দিন।
তবে সংবাদ সম্মেলনে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য আলাদা আবেদনপদ্ধতি, অনলাইন আবেদন লিংক কিংবা নির্দিষ্ট আবেদন ফি সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি। তাই কোনো অননুমোদিত ওয়েবসাইটে ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া বা কার্ড করে দেওয়ার নামে কাউকে টাকা দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
সরকারের ঘোষিত তথ্য অনুযায়ী, তথ্য সংগ্রহ শেষে পিএমটি পদ্ধতিতে যোগ্য উপকারভোগী নির্বাচন করা হবে। ফলে কার্ড ও ভাতা পাওয়ার চূড়ান্ত যোগ্যতা নির্ভর করবে নির্ধারিত সরকারি মানদণ্ডের ওপর।
সোহাগ/
