লাল লিপস্টিকের মতো ঠোঁট, সমুদ্রের তলদেশে হাঁটে যে মাছ!
নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রকৃতির বিচিত্র সৃষ্টি দেখে অবাক হওয়ার শেষ নেই। সমুদ্রের গভীরেও রয়েছে এমন সব প্রাণী, যাদের চেহারা ও চলাফেরা অন্যদের থেকে একেবারেই আলাদা। তেমনই এক অদ্ভুত মাছ রেড-লিপড ব্যাটফিশ। উজ্জ্বল লাল ঠোঁটের কারণে মনে হয়, যেন কেউ তাকে লিপস্টিক পরিয়ে দিয়েছে। তবে শুধু ঠোঁটের রং নয়, এই মাছের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো, এটি সমুদ্রের তলদেশে অনেকটা হাঁটার মতো করে চলাফেরা করে।
বৈজ্ঞানিকভাবে মাছটির নাম Ogcocephalus darwini। গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের আশপাশের সমুদ্র এবং পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের পেরু উপকূল পর্যন্ত এর দেখা মেলে। অদ্ভুত চেহারা ও বিশেষ চলাচলের ধরন একে সামুদ্রিক জীবজগতের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাণীতে পরিণত করেছে।
ঠোঁট এত লাল কেন?
রেড-লিপড ব্যাটফিশের সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্য এর উজ্জ্বল লাল ঠোঁট। শরীরের ওপরের অংশ সাধারণত হালকা বাদামি বা ধূসর রঙের হলেও নিচের অংশ তুলনামূলক সাদাটে। মুখের লাল রং শরীরের বাকি অংশের সঙ্গে স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করে।
এই অস্বাভাবিক রঙের কারণ নিয়ে নানা ধারণা রয়েছে। তবে ঠোঁটের লাল রং ঠিক কী কাজে লাগে, তা নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেই। তাই এটি সঙ্গী আকৃষ্ট করা বা একই প্রজাতির মাছকে শনাক্ত করার কাজে ব্যবহৃত হয়, এমন দাবি নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বলা যায় না।
মাছ হয়েও হাঁটে কীভাবে?
রেড-লিপড ব্যাটফিশের সবচেয়ে আশ্চর্য বৈশিষ্ট্য হলো এর চলাফেরা। সাধারণ মাছের মতো দ্রুত সাঁতার কাটার পরিবর্তে এটি সমুদ্রের তলদেশে নিজের বিশেষভাবে গঠিত পাখনা ব্যবহার করে হাঁটার মতো করে এগিয়ে যায়।
এর পেক্টোরাল ও পেলভিক পাখনাগুলো দেখতে অনেকটা পায়ের মতো। এই পাখনার সাহায্যে মাছটি বালুকাময় সমুদ্রতলে ভর দিয়ে চলতে পারে এবং কখনো এক জায়গায় ভর করে অবস্থানও করে।
তবে মাছটি একেবারে সাঁতার কাটতে পারে না, এমন নয়। এটি সাঁতারও কাটে, কিন্তু সমুদ্রের তলদেশে চলাফেরার জন্য পাখনার বিশেষ ব্যবহারই একে অন্য মাছের তুলনায় আলাদা করে তুলেছে।
শিকার ধরতে মাথায় থাকে বিশেষ টোপ
রেড-লিপড ব্যাটফিশের মাথার সামনের দিকে একটি বিশেষ অঙ্গ রয়েছে, যার নাম ইলিসিয়াম (Illicium)। এটি অ্যাংলারফিশ গোত্রের মাছের মতো শিকার আকর্ষণের কাজে ব্যবহৃত হয় বলে ধারণা করা হয়।
অঙ্গটি দেখতে অনেকটা মাছ ধরার ছিপের মতো। এর সাহায্যে কাছাকাছি থাকা ছোট শিকারকে আকৃষ্ট করার সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর মাছটি দ্রুত শিকার ধরে খেয়ে ফেলে।
এর খাবারের তালিকায় রয়েছে ছোট মাছ, চিংড়ি, ছোট ক্রাস্টেশিয়ান, মলাস্ক এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র সামুদ্রিক প্রাণী। অর্থাৎ অদ্ভুত চেহারার আড়ালে এটি একজন দক্ষ শিকারি।
কোথায় থাকে, কত বড় হয়?
রেড-লিপড ব্যাটফিশ সাধারণত সমুদ্রের বালুকাময় তলদেশ ও প্রবালপ্রাচীরের আশপাশে বসবাস করে। গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি প্রায় ৩ থেকে ৭৬ মিটার গভীরতায় এদের বেশি দেখা যায়। কিছু ক্ষেত্রে প্রায় ১২০ মিটার গভীরতাতেও পাওয়া গেছে।
শারীরিক বৈশিষ্ট্য এক নজরে:
-
বৈজ্ঞানিক নাম: Ogcocephalus darwini
-
পরিবার: Ogcocephalidae
-
আবাসস্থল: গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ থেকে পেরু উপকূলের পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর
-
গভীরতা: সাধারণত ৩ থেকে ৭৬ মিটার; কিছু রেকর্ডে ১২০ মিটার
-
দৈর্ঘ্য: প্রায় ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত
-
খাদ্য: ছোট মাছ, চিংড়ি, মলাস্ক ও ক্ষুদ্র সামুদ্রিক প্রাণী
-
চলাচল: পাখনাকে পায়ের মতো ব্যবহার করে সমুদ্রতলে হাঁটার মতো এগোয়
মানুষের জন্য কি বিপজ্জনক?
রেড-লিপড ব্যাটফিশ মানুষের জন্য ক্ষতিকর বলে পরিচিত নয়। এটি সাধারণত সমুদ্রের তলদেশে নিজের খাবার খুঁজে বেড়ায়। মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য নয়।
গ্যালাপাগোস কনজারভেশন ট্রাস্টের তথ্য অনুযায়ী, প্রজাতিটি বর্তমানে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে নেই বা ‘Least Concern’ শ্রেণিতে রয়েছে। তবে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং প্রবাল বিবর্ণতার মতো পরিবেশগত পরিবর্তন ভবিষ্যতে এর আবাসস্থল ও খাদ্যের প্রাপ্যতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রকৃতির এক বিস্ময়কর সৃষ্টি
উজ্জ্বল লাল ঠোঁট, অদ্ভুত শরীরের গঠন, পায়ের মতো পাখনা এবং মাথায় শিকার আকর্ষণের বিশেষ অঙ্গ, সব মিলিয়ে রেড-লিপড ব্যাটফিশ সত্যিই ব্যতিক্রমী এক সামুদ্রিক প্রাণী। সমুদ্রের তলদেশে হাঁটার মতো করে চলার দৃশ্য একে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
প্রকৃতির এই বিচিত্র সৃষ্টি মনে করিয়ে দেয়, প্রাণিজগতে বেঁচে থাকার কৌশল কত রকমের হতে পারে। যে মাছকে প্রথম দেখায় কার্টুনের কোনো চরিত্র মনে হয়, সেটিই আসলে সমুদ্রের বাস্তব এক বিস্ময়।
সিদ্দিকা/
