শুধু ‘স্যরি’ বললেই কি অভিমান কমে
নিজস্ব প্রতিবেদক: কাউকে কষ্ট দেওয়ার পর আমরা অনেকেই সহজভাবে বলে ফেলি, ‘স্যরি’ বা ‘দুঃখিত’। কিন্তু ক্ষমা চাওয়ার পরও দেখা যায়, অপর ব্যক্তির অভিমান কমছে না। বরং কখনো কখনো দূরত্ব আরও বেড়ে যায়। এর কারণ হতে পারে, শুধু দুঃখ প্রকাশ করলেই কষ্ট পাওয়া মানুষের অনুভূতি বা অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি দেওয়া হয় না।
মনোবিজ্ঞানের আলোচনায় ক্ষমা চাওয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজের ভুলের দায় স্বীকার করা। যিনি কষ্ট দিয়েছেন, তিনি হয়তো ঘটনাটিকে খুব বড় করে দেখছেন না। কিন্তু যিনি কষ্ট পেয়েছেন, তাঁর কাছে সেটি অনেক বেশি গুরুতর হতে পারে। এই দুই পক্ষের উপলব্ধির পার্থক্যকে মনোবিজ্ঞানী রয় বাউমিস্টার ‘ম্যাগনিটিউড গ্যাপ’ ধারণার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন।
শুধু দুঃখ প্রকাশ করলেই কেন কাজ হয় না?
কেউ কষ্ট পেলে তিনি শুধু একটি শব্দ শুনতে চান না। তিনি চান, অপর ব্যক্তি বুঝুক তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছে এবং কেন তিনি কষ্ট পেয়েছেন। তাই ‘আমি দুঃখিত’ বলার পাশাপাশি নিজের আচরণের দায় স্বীকার করাও জরুরি।
একটি গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের অনলাইন খেলায় অন্যায় আচরণের শিকার করা হয়। এরপর তাঁদের সামনে কয়েক ধরনের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরা হয়। কোথাও শুধু দুঃখ প্রকাশ করা হয়, কোথাও নিজের অন্যায় স্বীকার করা হয়, আবার কোথাও ভুল স্বীকারের পাশাপাশি দুঃখও প্রকাশ করা হয়। একটি ক্ষেত্রে কোনো প্রতিক্রিয়াই জানানো হয়নি।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, শুধু দুঃখ প্রকাশের তুলনায় নিজের ভুল স্পষ্টভাবে স্বীকার করা বেশি কার্যকর হতে পারে। কারণ এতে কষ্ট পাওয়া ব্যক্তি বুঝতে পারেন, তাঁর সঙ্গে যা ঘটেছে, সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ক্ষমা চাইতে গিয়ে যেসব কথা এড়িয়ে চলবেন
অনেক সময় ক্ষমা চাইতে গিয়ে এমন কিছু কথা বলা হয়, যা উল্টো পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে পারে। যেমন:
-
‘আপনি রাগ করেছেন বলে আমি দুঃখিত।’
-
‘আমার কথায় কষ্ট পেয়ে থাকলে দুঃখিত।’
-
‘আমি তো এমন কিছু বোঝাতে চাইনি।’
এ ধরনের কথায় নিজের আচরণের দায় নেওয়ার বদলে অন্য ব্যক্তির প্রতিক্রিয়াকে সামনে আনা হয়। এতে তাঁর মনে হতে পারে, আপনি আসলে নিজের ভুল স্বীকার করছেন না।
এর পরিবর্তে বলা যেতে পারে, ‘আমার কথায় আপনি কষ্ট পেয়েছেন, সেটা বুঝতে পারছি। এভাবে বলা আমার ঠিক হয়নি। আমি আপনার কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’
অন্যের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেবেন যেভাবে
একটি ঘটনা দুই ব্যক্তি ভিন্নভাবে দেখতে পারেন। যে বিষয়টি একজনের কাছে খুব কষ্টের, অন্যজনের কাছে সেটি হয়তো ততটা গুরুতর মনে নাও হতে পারে। কিন্তু তাই বলে কষ্ট পাওয়া ব্যক্তির অনুভূতিকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
এ ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে, ‘বিষয়টি আমি আপনার মতো করে বুঝতে পারিনি। কিন্তু আমার আচরণে আপনি যে কষ্ট পেয়েছেন, তা বুঝতে পারছি।’
এ ধরনের বক্তব্যে নিজের উপলব্ধির পার্থক্য তুলে ধরার পাশাপাশি অপর ব্যক্তির অনুভূতিকেও সম্মান জানানো হয়।
বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে শুধু ক্ষমা চাওয়া যথেষ্ট নয়
সব ভুলের প্রভাব এক রকম নয়। ছোটখাটো ভুলের ক্ষেত্রে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়া অনেক সময় যথেষ্ট হতে পারে। কিন্তু বড় ধরনের কষ্ট, ক্ষতি বা বিশ্বাসভঙ্গের ঘটনায় শুধু দুঃখ প্রকাশ করলেই সম্পর্ক আগের অবস্থায় ফিরে আসে না।
এ ক্ষেত্রে নিজের ভুলের দায় নেওয়ার পাশাপাশি সম্ভব হলে ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ভবিষ্যতে একই আচরণ যেন আর না ঘটে, সে বিষয়ে সচেতন থাকা।
কারণ, বিশ্বাস নষ্ট হতে এক মুহূর্ত লাগলেও তা ফিরে পেতে অনেক সময় প্রয়োজন হয়। কষ্ট পাওয়া ব্যক্তিকে ক্ষমা করার জন্য চাপ দেওয়াও ঠিক নয়। তাঁকে নিজের মতো করে সময় দেওয়াটা জরুরি।
আন্তরিক ক্ষমা চাওয়ার মূল কথা
সত্যিকারের ক্ষমা চাওয়ার অর্থ শুধু ‘স্যরি’ বলা নয়। এর অর্থ হলো নিজের ভুল বুঝতে পারা, সেই ভুলে অন্য ব্যক্তি কতটা কষ্ট পেয়েছেন তা স্বীকার করা এবং নিজের আচরণের দায়িত্ব নেওয়া।
তাই কাউকে কষ্ট দিলে শুধু দুঃখ প্রকাশ না করে স্পষ্টভাবে বলুন, আপনি কী ভুল করেছেন এবং ভবিষ্যতে তা এড়াতে কী করবেন। মনে রাখবেন, আন্তরিক ক্ষমা সম্পর্ক ঠিক করার একটি গুরুত্বপূর্ণ শুরু, তবে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে কথার পাশাপাশি আচরণেও পরিবর্তন দেখাতে হয়।
আশা/
