জমির দলিল হারিয়ে গেলে কী করবেন; নকল তোলার সহজ নিয়ম
নিজস্ব প্রতিবেদক: জমির মূল দলিল হারিয়ে গেলে অনেকেই চিন্তায় পড়ে যান। জমির মালিকানা নিয়ে সমস্যা হবে কি না, আবার নতুন করে দলিল করতে হবে কি না, কিংবা কোথা থেকে দলিলের কপি পাওয়া যাবে, তা নিয়ে তৈরি হয় নানা প্রশ্ন। তবে নিবন্ধিত জমির দলিল হারিয়ে গেলেও তার নকল সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশে জমি রেজিস্ট্রির পর সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলের একটি অনুলিপি সংরক্ষণ করা হয়। ফলে মূল দলিল হারিয়ে গেলে সেই অফিসের রেকর্ড থেকে সার্টিফায়েড কপি বা প্রত্যয়িত নকলের জন্য আবেদন করা যায়। এ জন্য কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করতে হবে।
১. দলিল হারানোর বিষয়ে থানায় জিডি করুন
প্রথমে দলিলটি কীভাবে হারিয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করুন। হারিয়ে গেলে বা চুরি হওয়ার আশঙ্কা থাকলে নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে পারেন।
জিডির কপি নিজের কাছে সংরক্ষণ করুন। ভবিষ্যতে দলিল হারানোর ঘটনা প্রমাণ বা কোনো অপব্যবহারের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে এটি সহায়ক হতে পারে।
তবে মনে রাখতে হবে, জিডি করলেই দলিলের নকল পাওয়া যায় না। নকল সংগ্রহের জন্য সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আলাদাভাবে আবেদন করতে হবে।
২. যে অফিসে দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছিল, সেখানে যোগাযোগ করুন
জমির দলিল যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রি করা হয়েছিল, সাধারণত সেখান থেকেই সার্টিফায়েড কপির আবেদন করতে হয়।
আবেদনের আগে দলিল সম্পর্কে যত বেশি তথ্য সংগ্রহ করা যায়, তত ভালো। যেমন:
-
দলিল নম্বর ও রেজিস্ট্রির সাল
-
দলিলের ক্রেতা ও বিক্রেতার নাম
-
জমির মৌজার নাম
-
খতিয়ান ও দাগ নম্বর
-
জমির পরিমাণ ও অবস্থান
-
দলিল রেজিস্ট্রির আনুমানিক তারিখ
দলিল নম্বর জানা না থাকলেও আবেদন করার সুযোগ থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অফিসের সূচিবহি বা রেকর্ড তল্লাশির মাধ্যমে দলিল শনাক্ত করতে হবে।
৩. দলিলের সার্টিফায়েড কপির জন্য আবেদন করুন
দলিল শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে নির্ধারিত পদ্ধতিতে নকল বা সার্টিফায়েড কপির আবেদন করতে হবে।
আবেদনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র জমা দিতে হবে এবং নির্ধারিত সরকারি ফি পরিশোধ করতে হবে। আবেদন গ্রহণের পর অফিসের সংরক্ষিত রেকর্ডের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দলিলের প্রত্যয়িত অনুলিপি প্রস্তুত করা হয়।
রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর ৫৭ ধারায় নির্ধারিত শর্ত ও ফি সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট রেজিস্টার ও সূচিবহি পরিদর্শন এবং সেখানকার তথ্যের নকল পাওয়ার বিধান রয়েছে।
৪. দলিলের নম্বর জানা না থাকলে কী করবেন?
অনেকের কাছে দলিলের নম্বর বা রেজিস্ট্রির সাল সংরক্ষিত থাকে না। এমন পরিস্থিতিতেও চেষ্টা বন্ধ করার প্রয়োজন নেই।
যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলটি রেজিস্ট্রি হয়েছিল, সেখানে গিয়ে দলিলের পক্ষগুলোর নাম, মৌজা, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ এবং আনুমানিক রেজিস্ট্রির সময় জানিয়ে তল্লাশির আবেদন করা যায়।
অফিসের সূচিবহি ও সংরক্ষিত রেকর্ড যাচাই করে দলিল শনাক্ত করার চেষ্টা করা হবে। তবে তথ্য যত নির্ভুল হবে, অনুসন্ধান তত সহজ হবে।
৫. নকল দলিল হাতে পাওয়ার পর কী করবেন?
সার্টিফায়েড কপি পাওয়ার পর সেটি ভালোভাবে যাচাই করে সংরক্ষণ করুন। বিশেষ করে দলিলের নম্বর, ক্রেতা-বিক্রেতার নাম, জমির পরিমাণ, মৌজা, দাগ ও খতিয়ানের তথ্য মিলিয়ে দেখুন।
এরপর জমির অন্যান্য কাগজপত্রের সঙ্গেও তথ্য যাচাই করা উচিত। যেমন:
-
আগের মালিকদের দলিল বা মালিকানার ধারাবাহিক কাগজপত্র
-
নামজারি বা খারিজের খতিয়ান
-
ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা
-
জমির দখল ও সীমানাসংক্রান্ত তথ্য
-
উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি হলে ওয়ারিশসংক্রান্ত কাগজপত্র
প্রয়োজন হলে ভূমি আইনজীবীর মাধ্যমে দলিল ও মালিকানার কাগজপত্র যাচাই করিয়ে নিতে পারেন।
৬. দলিল হারালে কি জমির মালিকানা চলে যায়?
না, শুধু মূল দলিল হারিয়ে যাওয়ার কারণে জমির মালিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্য কারও কাছে চলে যায় না। তবে জমির মালিকানা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দলিলসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি, মালিকানার ধারাবাহিকতা এবং পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়।
সার্টিফায়েড কপি নিবন্ধন অফিসের সংরক্ষিত রেকর্ড থেকে পাওয়া প্রত্যয়িত অনুলিপি। এটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার করা যায়। তবে নামজারি খতিয়ান বা ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা মূল দলিলের বিকল্প নয়।
দলিল হারালে যেসব ভুল করবেন না
দলিল হারানোর পর নতুন করে কোনো দলিল তৈরি বা রেজিস্ট্রি করার চেষ্টা করবেন না। একই জমি নিয়ে একাধিক কাগজ তৈরি করলে ভবিষ্যতে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
এ ছাড়া শুধু জিডি করে বসে থাকবেন না। দ্রুত সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যোগাযোগ করে সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহের উদ্যোগ নিন। কেউ হারানো দলিল ব্যবহার করে জমি বিক্রি বা জালিয়াতির চেষ্টা করছে বলে সন্দেহ হলে আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিন।
সবশেষে, জমির মূল দলিল হারিয়ে গেলে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হলো সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সংরক্ষিত রেকর্ড থেকে সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করা। দলিলের নম্বর, সাল ও জমির পরিচিতি-সংক্রান্ত তথ্য আগে থেকে সংরক্ষণে রাখলে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি সামলানো অনেক সহজ হবে।
সোহাগ/
