সরকারি পত্র তৈরির নতুন টুল, এক জায়গায় ১৪ ধরনের ফরম্যাট
নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকারি দাপ্তরিক চিঠিপত্র তৈরি করতে গিয়ে ফরম্যাট ঠিক রাখা, ফাইল নম্বর নির্ধারণ কিংবা পত্রের ভাষা সাজানো নিয়ে অনেকেরই সময় ব্যয় হয়। এসব কাজ সহজ করার লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে বাংলা ভাষার একটি ‘সরকারি পত্র জেনারেটর’। এতে এক প্ল্যাটফর্মেই ১৪ ধরনের দাপ্তরিক নথি তৈরির পাশাপাশি এআই দিয়ে বক্তব্য লেখা, পত্রের প্রিভিউ দেখা এবং পিডিএফ ডাউনলোডের সুবিধা রাখা হয়েছে।
টুলটির বর্ণনা অনুযায়ী, বাংলাদেশের সচিবালয় নির্দেশমালা, ২০২৪-এর ক্রোড়পত্র অনুসরণ করে বিভিন্ন দাপ্তরিক পত্রের কাঠামো সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ব্যবহারকারী প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করলেই নির্দিষ্ট ফরম্যাটে পত্র তৈরি করতে পারবেন। তবে এটি সরকারি কোনো কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত সফটওয়্যার কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এক জায়গায় ১৪ ধরনের সরকারি পত্র তৈরির সুবিধা
সরকারি পত্র জেনারেটরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এতে বিভিন্ন ধরনের দাপ্তরিক নথির জন্য আলাদা ফরম্যাট রয়েছে। ব্যবহারকারী প্রয়োজন অনুযায়ী নথির ধরন নির্বাচন করে তথ্য পূরণ করতে পারবেন।
টুলটিতে যেসব ফরম্যাটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো হলো:
১. সরকারি পত্র২. অফিস স্মারক৩. অফিস আদেশ৪. পরিপত্র৫. আধা-সরকারি পত্র৬. অনানুষ্ঠানিক নোট৭. প্রজ্ঞাপন৮. বিজ্ঞপ্তি৯. সভার নোটিশ১০. সারসংক্ষেপ১১. প্রাপ্তিস্বীকার পত্র১২. পৃষ্ঠাঙ্কন১৩. ফ্যাক্স বার্তা১৪. সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক প্রয়োজনে নির্ধারিত কাঠামোর অন্যান্য নথি তৈরির ব্যবস্থা।
প্রতিটি ফরম্যাটের সঙ্গে ব্যবহার ও লেখার নিয়ম সম্পর্কে প্রাথমিক নির্দেশনা রয়েছে। ফলে কোন কাজে কোন ধরনের পত্র ব্যবহার করতে হবে, তা বুঝতেও সহায়তা পেতে পারেন ব্যবহারকারীরা।
এআই দিয়ে তৈরি করা যাবে দাপ্তরিক বক্তব্য
টুলটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য সুবিধা হলো এআই ব্যবহার করে পত্রের মূল বক্তব্য তৈরি করা। এ ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীকে প্রথমে পত্রের উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংক্ষেপে লিখতে হবে। এরপর ভাষারীতি এবং লেখার দৈর্ঘ্য নির্বাচন করে বক্তব্য তৈরির সুযোগ রয়েছে।
এখানে চলিত ও সাধু ভাষারীতি বেছে নেওয়ার পাশাপাশি সংক্ষিপ্ত, মাঝারি ও বিস্তারিত লেখার বিকল্প রাখা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী পত্রের বিষয় বা সাবজেক্ট লাইন তৈরির সুবিধাও রয়েছে।
যেমন, কোনো দপ্তরের কাছে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন চাওয়া, অনিষ্পন্ন কাজের তালিকা পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের জন্য চিঠি তৈরি করতে এআই সহায়তা করতে পারে।
তবে এআইয়ের তৈরি বক্তব্য সরাসরি পাঠানোর আগে তথ্য, তারিখ, সংখ্যা, প্রাপকের পরিচয় ও প্রশাসনিক নির্দেশনা যাচাই করা জরুরি। কারণ এআইয়ের লেখায় ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য থাকতে পারে।
স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি করা যাবে ফাইল নম্বর
দাপ্তরিক পত্রে সঠিক ফাইল নম্বর উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে জেনারেটরটিতে ফাইল নম্বর তৈরির আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এখানে মন্ত্রণালয় বা বিভাগের কোড, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কোড, জিও কোড, অধস্তন প্রতিষ্ঠানের কোড, শাখার কোড, বিষয়ভিত্তিক কোড, ক্রমিক সংখ্যা এবং নথি খোলার বছর দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এসব তথ্য পূরণ করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফাইল নম্বর তৈরি করা যায়। চাইলে ব্যবহারকারী নিজেও নম্বর লিখতে পারবেন। পাশাপাশি ইংরেজি তারিখের সঙ্গে বাংলা তারিখ যুক্ত করার ব্যবস্থাও রয়েছে।
তবে জেনারেটরে তৈরি নম্বর সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রকৃত নথি নম্বরের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে। শুধু নম্বর তৈরি হলেই সেটি সরকারি নথি ব্যবস্থায় নিবন্ধিত বা অনুমোদিত হয়ে যায় না।
এ৪ প্রিভিউ, পিডিএফ ডাউনলোড ও লেখা কপি
পত্র তৈরির পর সেটি দেখতে কেমন হবে, তা যাচাই করার জন্য এ৪ আকারের প্রিভিউ সুবিধা রয়েছে। এতে পত্রের বিষয়, সূত্র, মূল বক্তব্য, স্বাক্ষরকারীর পরিচয় এবং অনুলিপির মতো অংশগুলো পর্যালোচনা করা যায়।
পত্র প্রস্তুত হলে পিডিএফ ডাউনলোড ও লেখা কপি করার বিকল্প পাওয়া যায়। পিডিএফ ফাইল সংরক্ষণ করে রাখা সম্ভব। অন্যদিকে, লেখা কপি করে মাইক্রোসফট ওয়ার্ড বা অন্য সম্পাদনাযোগ্য সফটওয়্যারে নিয়ে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করা যায়।
তবে টুলটির কোড অনুযায়ী, পিডিএফ মূলত পৃষ্ঠার ছবি থেকে তৈরি হয়। ফলে পিডিএফের ভেতরের লেখা সাধারণ টেক্সটের মতো সরাসরি সম্পাদনা করা নাও যেতে পারে। তাই ভবিষ্যতে সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে এমন পত্রের সম্পাদনাযোগ্য কপিও সংরক্ষণ করা ভালো।
দপ্তরের তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যাকআপ
একই দপ্তরের নাম, শাখা, স্বাক্ষরকারীর পদবি ও যোগাযোগের তথ্য বারবার লেখার প্রয়োজন কমাতে কিছু তথ্য ব্রাউজারে সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।
টুলটির কোড অনুযায়ী, নির্বাচিত তথ্য ব্রাউজারের স্থানীয় স্টোরেজে রাখা হয়। ফলে একই ব্রাউজারে পরবর্তী সময়ে কাজ করলে সংরক্ষিত তথ্য আবার ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।
এ ছাড়া ব্যাকআপ ফাইল তৈরি এবং সেই ফাইল থেকে আগের তথ্য ফিরিয়ে আনার সুবিধাও রয়েছে। তবে ব্রাউজারের ডেটা মুছে গেলে বা অন্য কম্পিউটারে কাজ শুরু করলে আগের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যাবে না। তাই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ব্যাকআপ আলাদাভাবে রাখা প্রয়োজন।
মোবাইল ও কম্পিউটারেও ব্যবহারের উপযোগী
টুলটির নকশায় কম্পিউটারের পাশাপাশি ছোট পর্দার ডিভাইস ব্যবহারের বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়েছে। বড় পর্দায় ফর্ম পূরণের পাশাপাশি পত্রের প্রিভিউ দেখা যায়। ছোট পর্দায় ফর্ম ও প্রিভিউ আলাদাভাবে দেখার ব্যবস্থা রয়েছে।
এ ছাড়া হালকা ও গাঢ় থিম ব্যবহারের সুবিধা এবং বাংলা ফন্টের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। তবে সব মোবাইল ব্রাউজারে পিডিএফ ডাউনলোড, ব্যাকআপ ও এআইয়ের সুবিধা একইভাবে কাজ করবে কি না, তা ব্যবহারের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে।
ব্যবহারের আগে যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখা জরুরি
সুবিধা থাকলেও সরকারি কাজে এ ধরনের টুল ব্যবহারের আগে কয়েকটি বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রথমত, সচিবালয় নির্দেশমালা, ২০২৪-এর সঙ্গে প্রতিটি ফরম্যাট ও পত্রের কাঠামো মিলিয়ে দেখা দরকার। টুলে নির্দেশমালার উল্লেখ থাকলেই সব ফরম্যাটের নির্ভুলতা নিশ্চিত হয় না।
দ্বিতীয়ত, এআই দিয়ে তৈরি বক্তব্য যাচাই না করে পাঠানো উচিত নয়। বিশেষ করে স্মারক নম্বর, তারিখ, সময়সীমা, প্রাপকের পরিচয় ও প্রশাসনিক নির্দেশনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, সরকারি পত্রে ব্যক্তিগত বা সংবেদনশীল তথ্য থাকতে পারে। এআই ব্যবহারের সময় এসব তথ্য কোথায় পাঠানো হচ্ছে এবং কীভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে, তা জানা জরুরি। তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে গোপনীয় সরকারি নথি এ ধরনের টুলে ব্যবহার করা উচিত নয়।
সবশেষে, জেনারেটরে পত্র তৈরি করা আর সেটি সরকারি পত্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে জারি করা এক বিষয় নয়। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমোদন, স্বাক্ষর, নথিভুক্তকরণ ও প্রেরণের প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করতে হবে।
দাপ্তরিক কাজে কতটা সহায়ক হতে পারে?
নিয়মিত সরকারি পত্র, অফিস আদেশ, সভার নোটিশ কিংবা তথ্য চাওয়ার চিঠি তৈরি করতে হয় এমন দপ্তরের জন্য এ ধরনের টুল সময় সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে। নির্ধারিত ফরম্যাট থাকায় পত্রের কাঠামো সাজানোর কাজও সহজ হতে পারে।
তবে এই টুল ব্যবহারে সরকারি দপ্তরের কাজ কতটা দ্রুত হচ্ছে, কতজন এটি ব্যবহার করছেন কিংবা বাস্তবে কত সময় সাশ্রয় হচ্ছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে, সরকারি পত্র জেনারেটরটি দাপ্তরিক নথি তৈরির জন্য একটি সম্ভাবনাময় ডিজিটাল সহায়ক টুল। ১৪ ধরনের ফরম্যাট, এআই দিয়ে বক্তব্য তৈরি, স্বয়ংক্রিয় ফাইল নম্বর, এ৪ প্রিভিউ, পিডিএফ ডাউনলোড ও ব্যাকআপের মতো সুবিধা এতে যুক্ত রয়েছে। তবে সরকারি কাজে ব্যবহারের আগে ফরম্যাটের নির্ভুলতা, তথ্যের নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।
