নিজের নামে কতটুকু জমি আছে, খতিয়ান দেখে জানবেন যেভাবে
নিজস্ব প্রতিবেদক: নিজের নামে ঠিক কতটুকু জমি রয়েছে, তা অনেকেই জানেন না। কারও নামে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি রয়েছে, আবার কেউ বহু বছর আগে জমি কিনলেও সব দাগ বা খতিয়ানের হিসাব এক জায়গায় রাখেননি। ফলে জমির প্রকৃত পরিমাণ জানতে গিয়ে পড়তে হয় বিভ্রান্তিতে। তবে জমির খতিয়ান, দাগ নম্বর ও মালিকানার অংশ যাচাই করে নিজের নামে রেকর্ড থাকা জমির পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনলাইন সেবার মাধ্যমে খতিয়ান অনুসন্ধান করা যায়। এ জন্য প্রয়োজন জমির অবস্থানসংক্রান্ত কিছু তথ্য। বিশেষ করে বিভাগ, জেলা, উপজেলা, মৌজা এবং জরিপের ধরন জানা থাকলে অনুসন্ধান সহজ হয়।
অনলাইনে খতিয়ান দেখে জমির পরিমাণ জানবেন যেভাবে
নিজের নামে জমির রেকর্ড খুঁজতে প্রথমে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সরকারি ওয়েবসাইটে যেতে হবে। এ জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে অনলাইন খতিয়ান অনুসন্ধান সেবা।
এরপর ধাপে ধাপে নিচের কাজগুলো করতে হবে।
১. জমির অবস্থান নির্বাচন করুন
ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে জমি যে বিভাগ, জেলা ও উপজেলায় অবস্থিত, সেগুলো নির্বাচন করুন। এরপর সংশ্লিষ্ট মৌজা নির্বাচন করতে হবে। মৌজার নামের পাশাপাশি জে.এল. নম্বর জানা থাকলে সঠিক মৌজা শনাক্ত করা সহজ হয়।
২. জরিপের ধরন নির্বাচন করুন
জমির রেকর্ড কোন জরিপের অধীনে তৈরি হয়েছে, সেটি নির্বাচন করতে হবে। এলাকায় প্রচলিত রেকর্ড অনুযায়ী সিএস, এসএ, আরএস, বিএস বা অন্য প্রযোজ্য জরিপের খতিয়ান খুঁজতে হতে পারে।
৩. খতিয়ান, দাগ নম্বর বা মালিকের নাম দিয়ে অনুসন্ধান করুন
খতিয়ান নম্বর জানা থাকলে সেটি দিয়ে খোঁজা যায়। নম্বর জানা না থাকলে মালিকের নাম বা দাগ নম্বর ব্যবহার করে অনুসন্ধানের সুযোগ থাকতে পারে। তবে একই নামে একাধিক ব্যক্তি থাকতে পারেন। তাই শুধু নামের ওপর নির্ভর না করে পিতার নাম, মৌজা ও অন্যান্য পরিচয় মিলিয়ে দেখা জরুরি।
৪. খতিয়ানের তথ্য যাচাই করুন
অনুসন্ধানে খতিয়ান পাওয়া গেলে সেখানে মালিকের নাম, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ এবং মালিকানার অংশসংক্রান্ত তথ্য দেখুন। একাধিক খতিয়ান বা দাগে জমি থাকলে প্রতিটির তথ্য আলাদাভাবে লিখে রাখুন।
খতিয়ানে নিজের নামে কতটুকু জমি আছে, হিসাব করবেন যেভাবে
খতিয়ানে কোনো দাগের সম্পূর্ণ জমির মালিক একজন নাও হতে পারেন। একাধিক ব্যক্তি যৌথভাবে মালিক হলে প্রত্যেকের অংশ অনুযায়ী জমির পরিমাণ হিসাব করতে হয়।
ধরা যাক, একটি দাগে মোট জমি ৬০ শতক। খতিয়ানে তিনজন মালিকের প্রত্যেকের অংশ এক-তৃতীয়াংশ করে উল্লেখ রয়েছে। তাহলে প্রত্যেকের প্রাপ্য জমির পরিমাণ হবে ২০ শতক।
আবার, কোনো ব্যক্তির অংশ যদি ১/৪ হয়, তাহলে ৬০ শতকের মধ্যে তাঁর অংশ হবে ১৫ শতক।
অর্থাৎ হিসাবের নিয়ম হলো:
নিজের জমির পরিমাণ = দাগের মোট জমি × মালিকানার অংশ
একই ব্যক্তির নামে একাধিক দাগ ও খতিয়ানে জমি থাকলে প্রতিটি দাগে তাঁর প্রাপ্য অংশের পরিমাণ যোগ করে মোট হিসাব করতে হবে। তবে একই জমি যেন একাধিকবার যোগ না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
শুধু নাম দিয়ে কি দেশের সব জমি খুঁজে পাওয়া যাবে?
অনেকের ধারণা, অনলাইনে নিজের নাম লিখলেই দেশের বিভিন্ন জেলায় থাকা সব জমির তালিকা পাওয়া যাবে। বাস্তবে এভাবে সব জমির তথ্য একসঙ্গে পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
অনুসন্ধানের জন্য সাধারণত জমির অবস্থান, মৌজা এবং সংশ্লিষ্ট জরিপের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই নিজের বা পরিবারের জমি কোন কোন জেলা, উপজেলা ও মৌজায় রয়েছে, তার একটি তালিকা তৈরি করে আলাদাভাবে খোঁজ করা ভালো।
নামজারি খতিয়ানও যাচাই করুন
জমি কেনার পর বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়ার পর নামজারি হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট নামজারি খতিয়ানও যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ জরিপের খতিয়ান এবং পরবর্তী নামজারির খতিয়ানে তথ্যের ধরন ও সময় ভিন্ন হতে পারে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি পোর্টাল থেকে নামজারি-সংক্রান্ত তথ্য ও আবেদনের অবস্থা যাচাই করা যায়। নামজারি সম্পন্ন হলে সংশ্লিষ্ট খতিয়ানে জমির দাগ, পরিমাণ ও মালিকানার তথ্য মিলিয়ে দেখা উচিত।
খতিয়ান দেখলেই কি জমির চূড়ান্ত মালিকানা নিশ্চিত হয়?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে। খতিয়ানে কারও নাম থাকলেই সব ক্ষেত্রে তাঁর জমির চূড়ান্ত মালিকানা নিশ্চিত হয়ে যায় না। আবার শুধু নামজারি বা ভূমি উন্নয়ন করের রসিদও মালিকানার একমাত্র প্রমাণ নয়।
জমির প্রকৃত মালিকানা যাচাই করতে দলিলের ধারাবাহিকতা, উত্তরাধিকারসংক্রান্ত কাগজপত্র, সর্বশেষ চূড়ান্ত খতিয়ান, দাগ নম্বর, জমির দখল এবং কোনো মামলা বা বিরোধ আছে কি না, সেগুলোও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া চলমান জরিপের ওয়েবসাইটে প্রদর্শিত খতিয়ান সব সময় চূড়ান্ত নাও হতে পারে। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটেও এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। তাই খসড়া খতিয়ানের তথ্যকে চূড়ান্ত রেকর্ড ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
খতিয়ানে জমির পরিমাণে গরমিল থাকলে কী করবেন?
দলিল, খতিয়ান ও বাস্তব দখলের জমির পরিমাণে পার্থক্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র নিয়ে উপজেলা ভূমি অফিস বা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে যোগাযোগ করা উচিত। প্রয়োজনে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট অফিস থেকেও পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
সবশেষে, নিজের নামে কতটুকু জমি রয়েছে তা জানতে একাধিক মৌজার খতিয়ান, দাগ নম্বর এবং মালিকানার অংশ যাচাই করতে হবে। প্রতিটি দাগে নিজের প্রাপ্য জমির পরিমাণ হিসাব করে দলিল ও নামজারির তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে নিলেই জমির একটি তুলনামূলক পরিষ্কার হিসাব পাওয়া সম্ভব।
সোহাগ/
