নামজারি আবেদন বাতিল হলে কী করবেন, জেনে নিন করণীয়
নিজস্ব প্রতিবেদক: জমির নামজারির আবেদন করেছেন, কিন্তু সেটি বাতিল বা নামঞ্জুর হয়েছে? এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই বুঝতে পারেন না, এখন নতুন করে আবেদন করতে হবে, নাকি আগের আবেদন দিয়েই সমাধান সম্ভব। আবার কেউ কেউ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতি পূরণ না করেই বারবার আবেদন করেন। এতে সময় ও অর্থ দুটিই নষ্ট হতে পারে।
তবে নামজারি আবেদন নামঞ্জুর হলেই সব পথ বন্ধ হয়ে যায় না। আবেদনে কী সমস্যা ছিল, তার ওপর নির্ভর করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে আগের আবেদন পুনরায় চালু করা, ভুল সংশোধন করা কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল বা পুনর্বিবেচনার আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, নামজারি আবেদন বাতিলের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা জরুরি। তাই প্রথম কাজ হলো নামঞ্জুরের আদেশ ভালোভাবে পড়ে সমস্যাটি চিহ্নিত করা।
১. প্রথমে নামজারি আবেদন বাতিলের কারণ জানুন
নামজারি আবেদন বাতিল বা নামঞ্জুর হলে সংশ্লিষ্ট আদেশের কপি সংগ্রহ করুন। সেখানে কেন আবেদনটি গ্রহণ করা হয়নি, তা উল্লেখ থাকার কথা।
সাধারণত যেসব কারণে নামজারি আবেদন নামঞ্জুর হতে পারে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে:
-
জমির দলিল বা মালিকানার কাগজপত্রে ঘাটতি।
-
দলিল, খতিয়ান ও আবেদনের তথ্যে অসংগতি।
-
জমির দাগ নম্বর বা পরিমাণে গরমিল।
-
উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে ওয়ারিশসংক্রান্ত তথ্যের ঘাটতি।
-
প্রয়োজনীয় বায়া দলিল বা মালিকানা হস্তান্তরের ধারাবাহিকতা না থাকা।
-
জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের অস্পষ্টতা।
তবে প্রতিটি কারণেই আবেদন বাতিল করা যাবে, এমন নয়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট নির্দেশনায় কিছু ক্ষেত্রে আবেদনকারীকে সংশোধন বা ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
২. কাগজপত্রের ঘাটতি থাকলে আগের আবেদন পুনরায় চালু করা যায়
নামজারি আবেদন বাতিল হওয়ার একটি সাধারণ কারণ হলো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা না দেওয়া। এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় ১৭ জুলাই ২০২২ তারিখে ই-নামজারি নিষ্পত্তি নিয়ে একটি পরিপত্র জারি করে।
পরিপত্র অনুযায়ী, নামজারি মামলার প্রথম আদেশে কোনো দলিল বা তথ্যের ঘাটতি থাকলে সেটি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে আবেদনকারীকে জমা দেওয়ার অনুরোধ জানাতে হবে। সাধারণত সাত কার্যদিবস অথবা পরিস্থিতি বিবেচনায় যুক্তিসংগত সময় দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজ জমা না দিলে দ্বিতীয় আদেশে আবেদন নামঞ্জুর করা যেতে পারে। তবে পরবর্তী সময়ে চাওয়া তথ্য বা দলিলপত্র জমা দেওয়া হলে আগের আবেদন পুনরায় চালু করার ব্যবস্থা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নতুন করে আবেদন করার প্রয়োজন নেই।
অর্থাৎ, কেবল কাগজপত্রের ঘাটতির কারণে আবেদন নামঞ্জুর হলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়ে আগের আবেদন পুনরায় চালুর বিষয়ে আবেদন করা যেতে পারে।
৩. কোন কোন কারণে আবেদন বাতিল করা যাবে না?
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ১৭ জুলাই ২০২২ সালের পরিপত্রে নামজারি আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী:
-
আবেদনসংক্রান্ত হার্ড কপি জমা না দেওয়ার কারণে আবেদন নামঞ্জুর করা যাবে না।
-
দলিলের নামের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের নামের পার্থক্য থাকলেই আবেদন বাতিল করা যাবে না। প্রয়োজনে নামের পার্থক্যের সমর্থনে অতিরিক্ত প্রমাণ চাওয়া যেতে পারে।
-
সঠিক মোবাইল নম্বর না থাকা বা নম্বরে ভুল থাকার কারণে আবেদন বাতিল করা যাবে না।
-
জমি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকলেই আবেদন বাতিল করা যাবে না। সংশ্লিষ্ট জমি হস্তান্তর বা নামজারিতে আদালতের সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা বা নির্দেশনা আছে কি না, তা বিবেচনা করতে হবে।
-
ভূমি উন্নয়ন কর কম পরিশোধিত হলে বকেয়া পরিশোধের সুযোগ দিতে হবে।
-
সর্বশেষ রেকর্ড ও দলিলে জমির শ্রেণির উল্লেখে পার্থক্য থাকলেই আবেদন বাতিল করা যাবে না। রেকর্ড ও বাস্তবতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তবে এসব নির্দেশনার অর্থ এই নয় যে সব আবেদন অনুমোদন করতে হবে। আবেদনকারীর মালিকানার প্রমাণ, জমির রেকর্ড এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় যাচাই করে সিদ্ধান্ত দিতে হবে।
৪. আদেশে ভুল থাকলে আপিল করার সুযোগ রয়েছে
কাগজপত্রের ঘাটতি পূরণ করার পরও যদি মনে হয় সহকারী কমিশনার (ভূমি) ভুল তথ্য বা আইনগত ব্যাখ্যার ভিত্তিতে আবেদন নামঞ্জুর করেছেন, তাহলে আপিলের বিষয়টি বিবেচনা করা যায়।
সাধারণভাবে সহকারী কমিশনার (ভূমি) পর্যায়ের নামজারি আদেশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) বরাবর আপিলের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে কোন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে হবে এবং কত দিনের মধ্যে করতে হবে, তা আদেশের ধরন ও প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী নিশ্চিত করতে হবে।
আপিলের ক্ষেত্রে সাধারণত প্রয়োজন হতে পারে:
১. নামজারি নামঞ্জুরের আদেশের সার্টিফায়েড কপি।
২. জমির মূল দলিল বা সার্টিফায়েড কপি।
৩. প্রযোজ্য খতিয়ান ও নামজারি সংক্রান্ত কাগজপত্র।
৪. ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা।
৫. আবেদনকারীর পরিচয় ও মালিকানার সমর্থনে প্রয়োজনীয় নথি।
৬. কোন কারণে আগের আদেশ ভুল হয়েছে, তার লিখিত ব্যাখ্যা।
আপিল করার আগে অভিজ্ঞ ভূমি আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া ভালো। বিশেষ করে সময়সীমা পার হয়ে গেলে বিলম্বের কারণ ও আইনগত সুযোগ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে।
৫. পুনর্বিবেচনা বা রিভিউ কখন করবেন?
কোনো নামজারি আদেশে তথ্যগত বা নথিগত ভুল থাকলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পুনর্বিবেচনার আবেদন করা যায়।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৫০ ধারার আওতায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) নামজারি, জমাখারিজ বা জমা একত্রীকরণের আদেশ উপযুক্ত প্রমাণের ভিত্তিতে পুনর্বিবেচনা করতে পারেন।
যেমন, নামজারি খতিয়ানে জমির পরিমাণ ভুল এসেছে, দখল অনুযায়ী তথ্য অন্তর্ভুক্ত হয়নি অথবা অন্য কোনো নামজারি মামলার কারণে রেকর্ড সংশোধন প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বিবিধ বা মিস কেসের মাধ্যমে প্রতিকার চাওয়া যেতে পারে।
এ ধরনের আবেদনে কী ভুল হয়েছে, কোন আদেশ সংশোধন করতে চান এবং কীভাবে আপনার মালিকানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে লিখতে হবে। সংশ্লিষ্ট দলিল ও প্রমাণও সংযুক্ত করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, রিভিউ, আপিল ও মিস কেস এক ধরনের আবেদন নয়। কোনটি প্রযোজ্য হবে, তা নির্ভর করবে সমস্যার ধরন ও আগের আদেশের ওপর।
৬. নামজারি আবেদন পুনরায় চালু করতে কোথায় যোগাযোগ করবেন?
নামজারি আবেদন নামঞ্জুর হলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা সার্কেল ভূমি অফিসে যোগাযোগ করুন। যে সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবেদনটি নিষ্পত্তি করেছেন, তাঁর কার্যালয়ে আদেশের কপি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে যান।
কাগজপত্রের ঘাটতির কারণে আবেদন নামঞ্জুর হয়ে থাকলে পরিপত্রের নির্দেশনা অনুযায়ী আগের আবেদন পুনরায় চালুর জন্য লিখিতভাবে আবেদন করতে পারেন।
অনলাইনে নামজারি আবেদনের তথ্য ও সেবা পেতে সরকারি ই-নামজারি পোর্টাল ব্যবহার করুন:
ভূমিসংক্রান্ত সরকারি সেবা ও নির্দেশনার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটও দেখতে পারেন:
৭. নামজারি আবেদন বাতিল হলে যেসব কাগজ প্রস্তুত রাখবেন
সমস্যার ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ভিন্ন হতে পারে। তবে সাধারণভাবে নিচের নথিগুলো প্রস্তুত রাখা ভালো:
-
নামজারি আবেদনের নম্বর ও আবেদনপত্রের কপি।
-
নামঞ্জুরের আদেশের কপি।
-
জমির মূল দলিল বা সার্টিফায়েড কপি।
-
আগের মালিকানার বায়া দলিল।
-
প্রযোজ্য সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস খতিয়ান।
-
ওয়ারিশ সূত্রে জমি পেলে ওয়ারিশ সনদ।
-
প্রয়োজন অনুযায়ী বণ্টননামা বা অংশীদারদের কাগজপত্র।
-
সর্বশেষ ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা।
-
জাতীয় পরিচয়পত্র ও নামের পার্থক্য থাকলে সমর্থনকারী প্রমাণ।
সব কাগজ একসঙ্গে লাগবে এমন নয়। আপনার আবেদনে যে ঘাটতি বা ভুল উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হবে।
নামজারি আবেদন বাতিল হলে নতুন করে আবেদন করবেন, নাকি আপিল?
এটি নির্ভর করে নামঞ্জুরের কারণের ওপর।
কাগজপত্রের ঘাটতি থাকলে: প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়ে আগের আবেদন পুনরায় চালুর আবেদন করুন।
আবেদনে তথ্যগত ভুল থাকলে: ভুলের ধরন অনুযায়ী সংশোধনের ব্যবস্থা নিন এবং সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
আদেশে আইনগত বা তথ্যগত ভুল থাকলে: উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল বা রিভিউয়ের সুযোগ যাচাই করুন।
আগের নামজারি খতিয়ানে ভুল থাকলে: সংশোধনের জন্য বিবিধ বা মিস কেস প্রয়োজন হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নামজারি আবেদন নামঞ্জুর হওয়ার পর আদেশের কপি না পড়ে নতুন আবেদন বা আপিল করবেন না। আগে সমস্যাটি শনাক্ত করুন, তারপর সঠিক প্রক্রিয়ায় প্রতিকার চান। এতে অপ্রয়োজনীয় সময় ও অর্থ ব্যয় কমবে এবং জমির রেকর্ড হালনাগাদ করার কাজও সহজ হবে।
সোহাগ/
