রেকর্ড আয় করেও কমল অ্যাপলের শেয়ারের দাম, নেপথ্যে কী
নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রত্যাশার চেয়েও বেশি আয় করেছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপল। ২০২৬ অর্থবছরের চতুর্থ প্রান্তিকে কোম্পানিটির আয় ও শেয়ারপ্রতি মুনাফা বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস ছাড়িয়ে গেছে। তবু পরবর্তী প্রান্তিকে মুনাফার হার কমে যাওয়ার আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে অ্যাপলের শেয়ারের দাম প্রায় ৪ শতাংশ কমেছে।
গত ২ নভেম্বর প্রকাশিত আর্থিক ফলাফলে অ্যাপল জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে তাদের মোট আয় হয়েছে ১১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আয় বেড়েছে ১২ শতাংশ। শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ১০ ডলার, যা বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি। তবে ভালো ফলাফলের পরও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে মেমোরি চিপের বাড়তি দাম।
অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জন টার্নাস জানিয়েছেন, বর্তমানে মেমোরি চিপের দাম বৃদ্ধির পরিস্থিতি নজিরবিহীন। ডিসেম্বর প্রান্তিকেও এসব যন্ত্রাংশের খরচ আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়বে আইফোন, ম্যাক ও আইপ্যাডের মতো পণ্য তৈরির ব্যয়ে।
অ্যাপলের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা কেভান পারেখ জানিয়েছেন, ডিসেম্বর প্রান্তিকে কোম্পানিটির মোট গ্রস মার্জিন ৪৫ থেকে ৪৬ শতাংশের মধ্যে থাকতে পারে। আগের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে এই হার ছিল ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ। বিশ্লেষকদের প্রত্যাশিত ৪৬ দশমিক ৩ শতাংশের চেয়েও এই পূর্বাভাস কম।
গ্রস মার্জিন হলো পণ্য বিক্রির আয় থেকে উৎপাদন ব্যয় বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট আয়ের অনুপাত। এই হার কমে যাওয়ার অর্থ হলো, বিক্রি থেকে পাওয়া আয়ের তুলনায় পণ্য তৈরির খরচের চাপ বাড়ছে।
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির প্রসারে বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টার নির্মাণ ও উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ হচ্ছে। এসব অবকাঠামো পরিচালনায় উন্নত মেমোরি চিপের চাহিদা বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে চিপের দাম ও সরবরাহে।
মাইক্রোসফট, মেটা ও অ্যালফাবেটের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এআই অবকাঠামোতে বড় বিনিয়োগ করছে। অন্যদিকে অ্যাপল আইফোন, ম্যাক ও আইপ্যাডের মতো ভোক্তাপণ্য তৈরি করে। ফলে মেমোরি চিপের দাম বাড়লে সরাসরি তাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়।
এ ছাড়া অ্যাপলের এআইভিত্তিক সিরি সেবা পরিচালনার জন্য সার্ভার খরচও বাড়ছে। ফলে শুধু হার্ডওয়্যার নয়, এআই সেবা পরিচালনার ব্যয়ও কোম্পানিটির মুনাফার ওপর চাপ তৈরি করছে।
মেমোরি চিপসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের সরবরাহ নিশ্চিত করতে অ্যাপল বড় অঙ্কের ক্রয় প্রতিশ্রুতি বাড়িয়েছে। কোম্পানির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা সাবিহ খান জানিয়েছেন, জুন প্রান্তিকের তুলনায় সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে উৎপাদনসংক্রান্ত ক্রয় প্রতিশ্রুতি ৩৩ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে।
তবে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগের পরও ডিসেম্বর প্রান্তিকে ম্যাক ও আইপ্যাডের সরবরাহে সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রত্যাশার চেয়ে বেশি চাহিদা এবং মেমোরি চিপের সরবরাহসংক্রান্ত চাপ এর কারণ।
সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে অ্যাপলের আইফোন বিক্রি থেকে আয় হয়েছে ৫৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসের চেয়ে এই আয় বেশি। কোম্পানির সার্ভিসেস বিভাগ থেকেও ৩১ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে, যা আগের সময়ের তুলনায় ব্যবসাটির শক্ত অবস্থান তুলে ধরে।
তবে চীনের বাজারে অ্যাপলের আয় ছিল ১৭ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার, যা বিশ্লেষকদের প্রত্যাশিত ১৮ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারের নিচে। ডিসেম্বর প্রান্তিকে সার্ভিসেস বিভাগের আয় বৃদ্ধির পূর্বাভাসও ৮ থেকে ৯ শতাংশে সীমিত রেখেছে কোম্পানিটি।
চাপের মধ্যেও ডিসেম্বর প্রান্তিকে মোট আয় ৭ থেকে ১০ শতাংশ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে অ্যাপল। কোম্পানির ধারণা, এটি তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ আয়ের প্রান্তিক হতে পারে।
তবে মেমোরি চিপের দাম বাড়তে থাকলে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে ম্যাক ও আইপ্যাডের সরবরাহে সীমাবদ্ধতা থাকলে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য বিক্রিও কঠিন হতে পারে।
সব মিলিয়ে অ্যাপলের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, বাড়তি উৎপাদন ব্যয় সামলে মুনাফার হার ধরে রাখা। পরবর্তী প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফলেই বোঝা যাবে, মেমোরি চিপের বাড়তি দাম ও এআই পরিচালন ব্যয়ের চাপ কোম্পানিটি কতটা সামাল দিতে পারে।
আশা/
