পাঁচ ধরনের জ্বরের লক্ষণ কী? ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও টাইফয়েডের পার্থক্য জানুন
নিজস্ব প্রতিবেদক: জ্বর হলেই সেটিকে সাধারণ ভাইরাসজনিত জ্বর ভেবে অবহেলা করা ঠিক নয়। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া ও টাইফয়েডের মতো রোগেও জ্বর দেখা দেয়। এসব রোগের কিছু উপসর্গ একই রকম হলেও জ্বরের ধরন, ব্যথার স্থান, অন্যান্য লক্ষণ এবং রোগের জটিলতায় পার্থক্য রয়েছে।
বাংলাদেশে বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। পাশাপাশি দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে ছড়ানো টাইফয়েড এবং অন্যান্য সংক্রমণ থেকেও সাবধান থাকতে হবে। তবে শুধু জ্বরের ধরন বা উপসর্গ দেখে নিশ্চিতভাবে রোগ শনাক্ত করা যায় না। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করাতে হয়।
১. ডেঙ্গু জ্বর: চোখের পেছনে ব্যথা ও তীব্র শরীরব্যথা
ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হলে সাধারণত হঠাৎ উচ্চ জ্বর শুরু হয়। এর সঙ্গে তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, পেশি ও জয়েন্টে ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং ত্বকে র্যাশ দেখা দিতে পারে।
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে কিছু সতর্কসংকেত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন—
-
তীব্র পেটব্যথা
-
বারবার বমি হওয়া
-
নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া
-
অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা অস্থিরতা
-
শ্বাসকষ্ট
বিশেষ সতর্কতা: জ্বর কমে গেলেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি শেষ হয়ে যায় না। জ্বর কমার সময় বা পরবর্তী পর্যায়েও গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। এসব সতর্কসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
২. ম্যালেরিয়া: কাঁপুনি দিয়ে জ্বর ও অতিরিক্ত ঘাম
ম্যালেরিয়া পরজীবীর সংক্রমণে হয়। এ রোগে জ্বরের সঙ্গে প্রচণ্ড কাঁপুনি, ঠান্ডা লাগা, মাথাব্যথা এবং জ্বরের পর অতিরিক্ত ঘাম হতে পারে। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিরতিতে জ্বর আসা-যাওয়ার ধরন দেখা যায়। তবে সবার ক্ষেত্রে এমনটি হয় না।
বাংলাদেশের ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকায় অবস্থান করা বা সেখান থেকে ফিরে আসার পর জ্বর হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। ম্যালেরিয়া দ্রুত গুরুতর হয়ে উঠতে পারে, তাই সন্দেহ হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো জরুরি।
৩. চিকুনগুনিয়া: জয়েন্টে তীব্র ব্যথা প্রধান লক্ষণ
চিকুনগুনিয়ায় সাধারণত হঠাৎ জ্বরের সঙ্গে তীব্র জয়েন্টে ব্যথা দেখা দেয়। বিশেষ করে কবজি, আঙুল, গোড়ালি ও হাত-পায়ের বিভিন্ন গাঁটে ব্যথা বা ফোলাভাব হতে পারে।
এ ছাড়া মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা, ক্লান্তি ও ত্বকে র্যাশ দেখা দিতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে জ্বর কয়েক দিনের মধ্যে কমলেও জয়েন্টের ব্যথা কয়েক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে।
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া—দুটিই মশার মাধ্যমে ছড়ায় এবং প্রাথমিক উপসর্গে মিল থাকতে পারে। তাই শুধু ব্যথার ধরন দেখে রোগ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
৪. টাইফয়েড: দীর্ঘস্থায়ী জ্বর ও পেটের সমস্যা
টাইফয়েড সালমোনেলা টাইফি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে হয়। সাধারণত দূষিত পানি বা খাবারের মাধ্যমে এ ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করে।
টাইফয়েডের সম্ভাব্য লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
-
কয়েক দিনের মধ্যে ক্রমশ বাড়তে থাকা জ্বর
-
মাথাব্যথা ও শারীরিক দুর্বলতা
-
পেটব্যথা ও ক্ষুধামন্দা
-
কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া
চিকিৎসা না হলে টাইফয়েড থেকে গুরুতর জটিলতা হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী জ্বর বা পেটের সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা উচিত নয়।
৫. সাধারণ ভাইরাসজনিত জ্বর: সর্দি-কাশি ও গলাব্যথা
সাধারণ ভাইরাসজনিত জ্বরে জ্বরের পাশাপাশি সর্দি, কাশি, গলাব্যথা, শরীরব্যথা ও ক্লান্তি থাকতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক দিনের মধ্যে উপসর্গ কমে আসে।
তবে সব ভাইরাসজনিত জ্বর একই রকম নয়। ইনফ্লুয়েঞ্জা বা অন্যান্য ভাইরাসের সংক্রমণেও বেশি জ্বর ও শরীরব্যথা হতে পারে। জ্বর দীর্ঘস্থায়ী হলে, ক্রমশ বাড়লে কিংবা গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
পাঁচ ধরনের জ্বরের পার্থক্য এক নজরে
|
জ্বরের ধরন |
সাধারণ লক্ষণ |
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা |
|---|---|---|
|
ডেঙ্গু |
উচ্চ জ্বর, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীরব্যথা |
পেটব্যথা, রক্তপাত, বারবার বমি |
|
ম্যালেরিয়া |
কাঁপুনি, জ্বর, ঘাম, মাথাব্যথা |
দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন |
|
চিকুনগুনিয়া |
জ্বর, তীব্র জয়েন্টে ব্যথা |
ব্যথা দীর্ঘদিন থাকতে পারে |
|
টাইফয়েড |
দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, পেটব্যথা, দুর্বলতা |
জটিলতা এড়াতে পরীক্ষা ও চিকিৎসা জরুরি |
|
সাধারণ ভাইরাসজনিত জ্বর |
সর্দি, কাশি, গলাব্যথা, শরীরব্যথা |
দীর্ঘস্থায়ী বা গুরুতর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ |
জ্বর হলে কী করবেন?
জ্বর হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন, নিরাপদ পানি ও অন্যান্য তরল পান করুন এবং শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করুন। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে জ্বর কমানোর ওষুধ গ্রহণ করুন।
ডেঙ্গুর সম্ভাবনা থাকলে চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনজাতীয় ওষুধ খাবেন না। এসব ওষুধ রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ডেঙ্গু সন্দেহ হলে কোন পরীক্ষা কখন করাতে হবে, তা চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন।
শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির জ্বর হলে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। শ্বাসকষ্ট, অচেতনতা বা বিভ্রান্তি, তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি কিংবা রক্তপাত দেখা দিলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নিন।
মনে রাখবেন: জ্বরের লক্ষণ থেকে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া গেলেও ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া ও টাইফয়েড নিশ্চিত করতে চিকিৎসকের মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
সোহাগ/
